ফ্ল্যাট কিনলেই কমন অ্যামেনিটিতে একচেটিয়া অধিকার নয়, হাইকোর্টের বড় রায়
বেঙ্গালুরু: কোনও আবাসন প্রকল্পে ফ্ল্যাট কিনলেই সেই প্রকল্পের সমস্ত সাধারণ সুবিধার উপর একচেটিয়া অধিকার তৈরি হয় না। সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার্ড সেল ডিডে যদি নির্দিষ্ট সুবিধা অন্য প্রকল্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, তাহলে পরে সেই সুবিধার উপর একক অধিকার দাবি করা যাবে না। এমনই গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে কর্নাটক হাইকোর্ট (Karnataka High Court)। বড় আবাসন প্রকল্প বা একাধিক পর্যায়ে তৈরি হওয়া টাউনশিপে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে এই রায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বেঙ্গালুরুর আর্য হামসা আবাসন প্রকল্পের দুই ফ্ল্যাট মালিকের করা আবেদন খারিজ করে আদালত এই রায় দিয়েছে। তাঁদের আপত্তি ছিল পাশের আর্য হামসা গ্র্যান্ডে প্রকল্পের বাসিন্দারাও ক্লাবহাউস, রাস্তা, চলাচলের পথ এবং প্রবেশ ও বেরোনোর গেটের মতো সাধারণ সুবিধা ব্যবহার করছেন। কিন্তু আদালত জানায়, আবেদনকারীদের নিজেদের রেজিস্টার্ড সেল ডিডেই ওই সুবিধাগুলি ভাগ করে ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
শৈলেশ বি. চরতি ও অন্য এক জন বনাম মেসার্স আর্য গৃহা প্রাইভেট লিমিটেড ও অন্যান্য মামলায় কর্নাটক হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, কোনও ক্রেতা রেজিস্টার্ড নথিতে একটি ব্যবস্থায় সম্মতি দেওয়ার পর পরবর্তীতে সেই ব্যবস্থার বিরোধিতা করে সংশ্লিষ্ট সুবিধার উপর একচেটিয়া অধিকার দাবি করতে পারেন না।
আর্য হামসা প্রকল্পটি প্রথমে তৈরি করা হয়েছিল। পরে একই নির্মাতা সংলগ্ন জমিতে আর্য হামসা গ্র্যান্ডে নামে আরেকটি প্রকল্প তৈরি করেন। দুই প্রকল্পের আলাদা ডেভেলপমেন্ট এগ্রিমেন্ট এবং অনুমোদিত পরিকল্পনা থাকলেও কিছু পরিকাঠামো ও সাধারণ সুবিধা দুই প্রকল্পের বাসিন্দাদের মধ্যে ভাগ করে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
Also Read | জলের নিচে শত্রুদের শেষ করতে ভারত পেল তৃতীয় অ্যান্টি সাবমেরিন ‘মাংরোল’
আর্য হামসার কয়েকজন বাসিন্দা এই ব্যবস্থা নিয়ে কর্নাটক রিয়েল এস্টেট রেগুলেটরি অথরিটি বা কর্নাটক রেরা-র দ্বারস্থ হন। তাঁদের দাবি ছিল, সাধারণ সুবিধাগুলি মূলত তাঁদের প্রকল্পের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। অন্য প্রকল্পের বাসিন্দাদের ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় তাঁদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কর্নাটক রেরা তাঁদের অভিযোগ খারিজ করে দেয়। এরপর রেরা অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালেও তাঁরা সুরাহা পাননি। শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট মালিকরা হাইকোর্টে আবেদন করেন। কিন্তু হাইকোর্টও তাঁদের দাবি গ্রহণ করেনি।
আদালতের সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি ছিল রেজিস্টার্ড সেল ডিডের ভাষা। আইনজীবী সুব্রত মুখার্জির মতে, ফ্ল্যাট মালিকদের দাবি টেকসই ছিল না, কারণ তাঁদের নিজেদের সেল ডিডেই নির্দিষ্ট কিছু সাধারণ সুবিধা ভাগ করে ব্যবহারের কথা ছিল।
অর্থাৎ, অন্য প্রকল্পের বাসিন্দারা সুবিধাগুলি ব্যবহার করছেন বলেই তাঁরা মামলা হারেননি। তাঁরা মামলা হারিয়েছেন কারণ রেজিস্টার্ড নথিতে তাঁরা নিজেরাই সেই ব্যবস্থায় সম্মতি দিয়েছিলেন।
ফ্ল্যাট মালিকরা ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২-এর ১১ নম্বর ধারার উল্লেখ করে দাবি করেছিলেন, এই ধরনের বিধিনিষেধ আইনসঙ্গত নয়। কিন্তু আদালত সেই যুক্তি খারিজ করে জানায়, ক্রেতারা তাঁদের ফ্ল্যাটের উপর একচেটিয়া মালিকানা রাখেন ঠিকই, কিন্তু ভাগ করে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত সাধারণ সুবিধাগুলির উপর তাঁদের সম্পূর্ণ বা একচেটিয়া মালিকানার অধিকার নেই।
আইনজীবী দিব্যা আলেকজান্ডারের মতে, এই রায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেগুলি হল স্পষ্ট সম্মতি, এস্টপেল এবং অ্যাপ্রোবেট অ্যান্ড রিপ্রোবেটের আইনি নীতি। সহজভাবে বললে, কোনও ব্যক্তি একই চুক্তির সুবিধা গ্রহণ করে পরে সেই চুক্তিতে থাকা সংশ্লিষ্ট বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করতে পারেন না।
মামলায় ফ্ল্যাট মালিকরা ইন্ডিয়ান কনট্রাক্ট অ্যাক্টের ২৯ নম্বর ধারা-ও উল্লেখ করেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, সাধারণ সুবিধা ভাগ করে নেওয়ার ব্যবস্থা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। হাইকোর্ট এই যুক্তিও খারিজ করে জানায়, রেজিস্টার্ড সেল ডিডে লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ভাগাভাগির ব্যবস্থা স্পষ্টভাবেই লেখা ছিল।
আইনজীবী সময়রা আদলখার মতে, এই মামলা রেরা-র ক্ষমতার সীমাও স্পষ্ট করেছে। তাঁর বক্তব্য, ফ্ল্যাট মালিকরা কার্যত একটি রেজিস্টার্ড সেল ডিডের শর্ত পরিবর্তন বা চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিলেন, অথচ সেই নথিকে প্রথমে দেওয়ানি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়নি।
তাঁর মতে, রেরা-র মঞ্চ কোনও চূড়ান্তভাবে রেজিস্টার্ড নথির শর্ত নতুন করে লিখে দেওয়া বা পুনর্বিবেচনা করার জন্য তৈরি নয়। কোনও নির্মাতা রেরা-র নিয়ম মেনেছেন কি না, সেই প্রশ্ন এক জিনিস। আর রেজিস্টার্ড সম্পত্তির নথিতে থাকা নির্দিষ্ট চুক্তির শর্ত বাতিল করার চেষ্টা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য এই রায়ের শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও আবাসন প্রকল্পের ব্রোশিওর, বিক্রয় প্রতিনিধির বক্তব্য বা বর্তমান বাসিন্দাদের কথার উপর নির্ভর করে কোনও সুবিধাকে শুধুমাত্র নিজেদের প্রকল্পের বাসিন্দাদের জন্য নির্দিষ্ট বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ফ্ল্যাট কেনার আগে রেজিস্টার্ড সেল ডিডে সাধারণ এলাকা, রাস্তা, প্রবেশপথ এবং ভাগ করে ব্যবহারের সুবিধা সংক্রান্ত শর্তগুলি খুঁটিয়ে দেখা জরুরি। প্রকল্পটি কোনও বড় টাউনশিপের অংশ কি না, ভবিষ্যতে আরও পর্যায়ে নির্মাণ হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কি না এবং পাশের পর্যায়ের বাসিন্দারা একই পরিকাঠামো ব্যবহার করবেন কি না, তাও যাচাই করা দরকার।
ক্লাবহাউস, রাস্তা, পার্কিং এলাকা, বিনোদনমূলক সুবিধা এবং প্রবেশ ও বেরোনোর পথ কারা ব্যবহার করতে পারবেন, সেই বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য থাকা উচিত। একই সঙ্গে রেরা-তে প্রকল্পের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তার সঙ্গে বিক্রয় নথির তথ্য মিলিয়ে দেখা দরকার।
আইনজীবী মনু কুমার ঝা-র মতে, এই রায় দেখিয়ে দেয় যে কোনও অ্যাপার্টমেন্ট কেনার অর্থ প্রকল্পের সীমানার মধ্যে থাকা প্রতিটি সুবিধার উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ পাওয়া নয়। অধিকার নির্ভর করবে সম্পত্তি সংক্রান্ত চুক্তি ও নথির উপর।
আইনজীবী বি. শ্রাবণ্থ শঙ্করের মতে, সেল ডিডে যদি সাধারণ সুবিধা ভাগ করে ব্যবহারের কথা স্পষ্টভাবে লেখা থাকে, তাহলে শুধুমাত্র ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার কারণে সেই সুবিধার উপর একচেটিয়া অধিকার তৈরি হয় না।
আইনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ফ্ল্যাট কেনার আগে শুধু বাড়ির নকশা, দাম বা সুযোগ-সুবিধার তালিকা দেখলেই হবে না। সেল ডিড, প্রকল্পের নথি, অনুমোদন, ডেভেলপমেন্ট কাঠামো এবং রেরা-র প্রকাশিত তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে একাধিক পর্যায়ে তৈরি হওয়া আবাসন প্রকল্পে কোন পর্যায়ের বাসিন্দারা কোন সুবিধা ব্যবহার করবেন, তা আগে থেকেই নথিতে নির্ধারিত থাকতে পারে।
আইনজীবী শশাঙ্ক আগরওয়ালের মতে, আইনি যাচাই শুধু ফ্ল্যাটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। প্রকল্পের ঘোষণা এবং অন্যান্য নথিও পরীক্ষা করা দরকার। কোনও প্রকল্প বাইরে থেকে একচেটিয়া সুবিধাসম্পন্ন বলে মনে হলেও আইনি নথিতে অন্য পর্যায়ের বাসিন্দাদের সেই সুবিধা ব্যবহারের অধিকার থাকতে পারে।
আরেক আইনজীবী ইশিতা সিংয়ের মতে, কোনও আবাসিক সমিতি বা ব্যবস্থাপনা কমিটির পরবর্তী সিদ্ধান্তও রেজিস্টার্ড সেল ডিডের মাধ্যমে ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া অধিকারকে সহজে বদলে দিতে পারে না। নথিতে যদি ভাগ করে ব্যবহারের অধিকার দেওয়া থাকে, তাহলে দুই প্রকল্পের বাসিন্দাদের অধিকার সেই নথির ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হবে।
ফলে এই মামলার গুরুত্ব শুধু বেঙ্গালুরুর একটি আবাসন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সরাসরি শিক্ষা হল, ফ্ল্যাট কেনার সময় শুধু ফ্ল্যাটের মালিকানা নয়, সেই মালিকানার সঙ্গে ঠিক কোন কোন সাধারণ সুবিধার অধিকার যুক্ত হচ্ছে, সেটিও বুঝে নেওয়া জরুরি।
ক্লাবহাউস, রাস্তা বা অন্যান্য সুবিধা একান্তভাবে নিজেদের হবে ধরে নিয়ে ফ্ল্যাট কেনার পরে যদি সেল ডিডে অন্য প্রকল্পের বাসিন্দাদের ব্যবহারের অধিকার পাওয়া যায়, তাহলে পরে সেই অবস্থান বদলানো কঠিন হতে পারে। তাই বুকিংয়ের আগে ব্রোশিওর বা বিক্রয় প্রতিশ্রুতির বদলে রেজিস্টার্ড সেল ডিড এবং প্রকল্পের আইনি নথিই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে পড়া উচিত।