রাজার মৃত্যুতে ম্লান মালবাজার, জয়া বচ্চনের ‘দেশ’-এর শুটিং হয় ডুয়ার্সে
সব্যসাচী ঘোষ, মালবাজার
রবিবার ৭১ বছর বয়সে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন জাতীয় পুরস্কার জয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক রাজা সেন। ২৫ বছর আগে গোটা ইউনিট নিয়ে ডুয়ার্সে একটি ছবির শুটিং করেছিলেন তিনি। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ডুয়ার্সের কয়েকজন বাসিন্দাও। সেই সব স্মৃতি মনে করে প্রয়াত পরিচালককে নিয়ে আবেগে ভাসলেন তাঁরা।
২০০১–এর সেপ্টেম্বর মাস। বিরাট লটবহর নিয়ে স্বাধীনতা দিবসের পতাকা তোলার অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে গোরুবাথানের (বর্তমানে এলাকাটি কালিম্পং জেলার অন্তর্গত) সরকারি যুদ্ধবীর হাইস্কুলে। সদ্য ১৫ অগস্ট পেরিয়ে এসে আবার কেন তেরঙ্গা পতাকায় সেজে উঠছে স্কুল চত্বর? বিষয়টিতে খানিকটা অবাকই হয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তার পরেই জয়া বচ্চনকে দেখে সবাই বুঝতে পারেন, সিনেমার শুটিং হতে চলেছে।
ততদিনে ‘দামু’ সিনেমার জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়ে গিয়েছেন রাজা। নামডাকও হয়েছে বেশ। এ বার প্রফুল্ল রায়ের কাহিনী অবলম্বনে নতুন ছবি ‘দেশ’–এর শুটিং করতে মালবাজারে আসেন তিনি। ছবির মুখ্য চরিত্রে অমিতাভ–জায়া। ১৯৭৪–এ ‘সাধু যুধিষ্টিরের কড়চা’–র ২৭ বছর পরে ফের বাংলা ছবিতে কাজ করতে চলেছেন জয়া। স্বভাবতই সিনেপ্রেমীরা মুখিয়ে ছিলেন এই ছবির জন্য। জয়া অভিনয় করেছিলেন সুপ্রভা দেবী নামে এক প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামীর চরিত্রে। তাঁর ছেলের চরিত্রে বাস্তবে অমিতাভ–জয়ার সন্তান অভিষেক বচ্চন। সম্পর্কে পরিচালকের শ্যালক এবং প্রখ্যাত অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী ওই ছবিতে স্থানীয় সাংবাদিকের চরিত্রে অভিনয় করেন। স্থানীয় এমএলএ–র ভূমিকায় ছিলেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়।
‘দেশ’ ছবিতে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের দৃশটি ফুটিয়ে তুলতে মালবাজার সুভাষিণী উচ্চতর বালিকা বিদ্যালয়ের শতাধিক ছাত্রীকে গোরুবাথানের ওই স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বড় ল্যাডারে ক্যামেরা বসিয়ে চলছিল শুটিং। শীর্ষ রায় ছিলেন ছবির সিনেমাটোগ্রাফার। সব ঠিক চলছিল। গোল বাঁধে জয়ার ডায়লগ নিয়ে। তেরঙ্গা পতাকা তোলার পরে তাঁকে মাইক্রোফোনে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে হবে। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট ভাষণ স্ক্রিপ্টে লেখা ছিল না। চটজলদি সব্যসাচী চক্রবর্তীকে ইদানীং দেশে যা চলছে, দেশ আবার টুকরো টুকরো হয়ে যেতে চলেছে, সেটা আমরা হতে দিতে পারি না— এরকম ভাবনার উপরে ভাষণটি লিখে দিতে বলেন রাজা। সব্যসাচীও দ্রুত কাগজে সেটি লিখে জয়াকে দেন।
তার পরে সেই ভাষণ মুখস্ত করে ডায়লগ আকারে বলেন রিলের সুপ্রভা দেবী। ডায়লগ শেষ হতেই ছাত্রছাত্রীদের করতালিতে মুখরিত হয় গোটা স্কুলমাঠ। ২৫ বছর আগের সেই সব দিনের স্মৃতি আজও টাটকা মালবাজারের বিশ্বনাথ পোদ্দারের। তিনি ছিলেন ডুয়ার্সে রাজার অন্যতম পথপ্রদর্শক। সেই সময়ে সুভাষিণী স্কুলের পরিচালন কমিটির সভাপতিও ছিলেন তিনি। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘দামুর সাফল্যের পরে ওঁর নাম সকলেই জানত। বড় থেকে ছোট, সবাই সেই সিনেমা দেখেছিলেন। তাই রাজা মালবাজারে শুটিং করতে আসছেন জেনে গোটা শহরে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।’
তিনিই জানান, শুটিংয়ের সময়ে মালবাজার টুরিস্ট লজে থাকতেন রাজা। বিশ্বনাথের ছেলে গৌরব পোদ্দার সেই ছবিতে এক নির্যাতিতা তরুণীর ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বর্তমানে গৌরবের বয়স ৪০। স্মৃতিচারণায় তিনি বলেন, ‘তখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। সেটাই আমার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর প্রথম সুযোগ। রাজা সেন সাহস দেওয়ায় নার্ভাসনেস কেটেছিল। জয়া বচ্চনের সামনে কী করে আনকোরা একটা ছেলেকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নিতে হয়, সেটা রাজা সেন বিলক্ষণ জানতেন। পরিণত বয়সে ছবিটা দেখে বুঝেছিলাম।’
মালবাজারের একটি সংস্থার অভিজ্ঞ গাড়িচালক কর্মা লামা সিনেমায় জয়ার বিশ্বস্ত গাড়িচালক ‘বাহাদুর’–এর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। রাজা মারা গিয়েছেন, এই খবরটা বিকেল পর্যন্ত তাঁর কানে পৌঁছয়নি। পরে জানতে পেরে তাঁর চোখেমুখে আবেগ ফুটে ওঠে। কর্মা বলেন, ‘তখন ড্রোন ছিল না। তাই অনেকগুলো দৃশ্যায়নে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছিল। বিশেষ করে আমি জয়া ম্যাডামকে নিয়ে সেবকের করোনেশন সেতু পার হচ্ছি, ঠিক মাথার উপরে হেলিকপ্টার থেকে আমাদের গাড়ির ছবি তোলা হচ্ছিল। রাজা সেন আমায় বলেছিলেন, হেলিকপ্টার দিয়ে তো বারবার ছবি তোলা যাবে না, তাই তুমি গাড়ি একলয়ে সোজা চালিয়ে নিয়ে আসবে। আমি সেটাই করেছিলাম।’
সেই সময়ে ক্লাস ইলেভেনের ছাত্র এবং বর্তমানে বড়দিঘী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভূগোলের শিক্ষক ধৃতিমান রাহা বলছেন,‘স্কুল কামাই করে রাজা সেনের ছবির শুটিং দেখতে যেতাম। অবসর সময়ে রাজা সেন, জয়া বচ্চন, সব্যসাচী চক্রবর্তীরা আমাদের কাছে দাঁড়িয়ে গাড়ির মধ্যেই তাস খেলতেন। সবই যেন মনে হচ্ছে সে দিনের কথা!’