মিনিমাম ব্যালান্স না রাখলেই গ্যাঁটগচ্চা, ৭,০৮৬ কোটি টাকা জরিমানা আদায় ব্যাঙ্কগুলির
এই সময়: দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলিতে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম গড় ব্যালান্স বা মিনিমাম অ্যাভারেজ ব্যালান্স রাখার নিয়ম নিয়ে বহু বার আপত্তি তুলেছেন গ্রাহকেরা। তারপরে নিয়মে কিছু অদল-বদল করা হলেও ন্যূনতম গড় ব্যালান্স রাখার বিষয়টি বেশ কিছু ব্যাঙ্ক পুরোপুরি তুলে দেয়নি। আর এর সুবিধে নিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দেশের গ্রাহকদের কাছ থেকে বেসরকারি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি মোট ৭,০৮৬ কোটি টাকার জরিমানা আদায় করেছে।
মঙ্গলবার রাজ্যসভায় এক লিখিত জবাবে এই তথ্য দিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধরি। তিনি বলেন, ‘শুধু বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলিই গ্রাহকদের কাছ থেকে ৪,৯৪৮.৭১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে, যা মোট আদায়ের ৭০ শতাংশ। একই সময়ে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির আদায়ের পরিমাণ ছিল ২,১৩৭.৯২ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম ব্যালান্স না রাখার জন্য গ্রাহকদের উপরে চাপানো জরিমানার অঙ্ক ৭,০৮৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।’
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রাহকের তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম গড় ব্যালান্স রাখতে পারছেন না কেন? বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশের মতে, কম আয়, চাকরি হারানো, বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর চড়া দাম, ভুল পরিকল্পনা এবং ব্যাঙ্ক ফি–কে এর জন্য অনেকাংশে দায়ী করা যেতে পারে। কম আয়ের কারণে খাদ্যপণ্য কেনা, বাড়ি ভাড়া দেওয়া এবং নানাবিধ খরচের জন্য অ্যাকাউন্ট থেকে পুরো টাকা তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অধিকাংশ গ্রাহক। এর পাশাপাশি চাকরি থেকে ছাঁটাই অ্যাকাউন্ট থেকে পুঁজি তুলে নেওয়ার আর এক কারণ। পণ্যের চড়া দাম গ্রাহকদের পকেটের উপরে অনেকটাই চাপ বাড়িয়েছে। যার জেরে অ্যাকাউন্ট থেকে বেশি করে টাকা তুলতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা। যা তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ন্যূনতম ব্যালান্সের অঙ্ক কমিয়ে দিচ্ছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির মধ্যে সর্বাধিক জরিমানা আদায় করেছে এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক। গ্রাহকদের কাছ থেকে তারা এই খাতে ১্,৭৯৮.১৪ কোটি টাকা আদায় করেছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক, যারা আদায় করেছে ১,০৮১.৩৩ কোটি টাকা। এই দুই ব্যাঙ্ক মিলেই বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির মোট আদায়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ সংগ্রহ করেছে। এছাড়া আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক ৩৫৩.৫০ কোটি টাকা, কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাঙ্ক ২৯০.৬৫ কোটি টাকা, ইয়েস ব্যাঙ্ক ১৯৫.০৫ কোটি টাকা এবং আইডিবিআই ব্যাঙ্ক ১৭৫.১৫ কোটি টাকা আদায় করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মধ্যে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (এসবিআই) গ্রাহকদের কাছ থেকে ন্যূনতম ব্যালান্স বজায় না রাখার জন্য জরিমানা আদায়ের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি—৪৭৭.২৭ কোটি টাকা। তবে সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, এসবিআই-এর এই আদায় শুধুমাত্র কারেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে হয়েছে। ২০২০-র মার্চ মাসেই এসবিআই সেভিংস অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম ব্যালান্স না রাখার ক্ষেত্রে জরিমানা তুলে দেয়। ব্যাঙ্ক অফ বরোদা ৩৯৪.১০ কোটি টাকা এবং ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক ২৯৯.১৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে।
অর্থ প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মধ্যে ১০টি ইতিমধ্যেই সেভিংস অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম গড় ব্যালান্স না রাখার জন্য জরিমানা নেওয়া বন্ধ করেছে। বাকি দু’টি ব্যাঙ্ক তাদের পরিচালন পর্ষদের অনুমোদিত নীতি অনুযায়ী এই চার্জ নিয়ে থাকে।
সরকার আরও জানিয়েছে, বেসিক সেভিংস ব্যাঙ্ক ডিপোজ়িট অ্যাকাউন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনার আওতায় খোলা অ্যাকাউন্টগুলিতে কোনও ন্যূনতম ব্যালান্স রাখার বাধ্যবাধকতা নেই। এই জ়িরো ব্যালান্স অ্যাকাউন্টে জমা, তোলা এবং এটিএম ব্যবহারের মতো মৌলিক ব্যাঙ্কিং পরিষেবা নিখরচায় পাওয়া যায়। বর্তমানে এ ধরনের প্রায় ৭৩ কোটি অ্যাকাউন্ট, যার মধ্যে জনধন অ্যাকাউন্টও রয়েছে, ন্যূনতম ব্যালান্স সংক্রান্ত জরিমানা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাঙ্কগুলি তাদের পরিচালন পর্ষদ অনুমোদিত নীতির ভিত্তিতে সেভিংস ও কারেন্ট অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম ব্যালান্স না রাখার ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ স্থির করতে পারে। তবে সেই চার্জ যুক্তিসঙ্গত, স্বচ্ছ এবং পরিষেবা প্রদানের খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। গ্রাহকদের এসএমএস, ই-মেল বা চিঠির মাধ্যমে আগাম জানানো এবং ব্যালান্স পুনরুদ্ধারের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার নির্দেশও রয়েছে।