কৌশলে বিরোধ, অস্ত্র ব্যবসা প্রসারে একজোট
আশিস গুপ্ত
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গত ৭ ও ৮ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে উত্তর আটলান্টিক জোট, অর্থাৎ ন্যাটো-র ৩৬তম শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনকে ঘিরে তুরস্ক সরকার নজিরবিহীন নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ২৮ জুন থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত পুরো প্রদেশে সব ধরনের সমাবেশ, মিছিল, বিক্ষোভ, জমায়েত এবং লিফলেট বিতরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে সম্মেলন শুরুর আগেই তুরস্কের বিভিন্ন শহরে ন্যাটো-বিরোধী আন্দোলন জোরালো হয়ে ওঠে। ইস্তানবুল, আঙ্কারা ও ইজ়মির সহ বিভিন্ন শহরে শ্রমিক সংগঠন, শান্তিকামী সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা ন্যাটো-র সামরিক সম্প্রসারণ নীতি, সদস্য রাষ্ট্রগুলির প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি এবং বিশ্ব জুড়ে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাদের দাবি ছিল, যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক কল্যাণে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং তুরস্কের স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, সন্ত্রাস-বিরোধী অভিযানের নামে বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হয়েছে। তাদের মতে, এই অভিযানে ২০০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে মানবাধিকার কর্মী, শ্রমিক নেতা, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্য রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ মত প্রকাশের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের স্বাধীনতা সীমিত করতে নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলন শুধু ন্যাটোর সামরিক ও কৌশলগত ভবিষ্যৎ নিয়েই নয়, নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এক দিকে জোটের সদস্য-রাষ্ট্রগুলি নিরাপত্তা-সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা-নীতিকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছে, অন্য দিকে সম্মেলনকে ঘিরে তুরস্কে কঠোর নিরাপত্তা-ব্যবস্থা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এবারের ন্যাটো সম্মেলন ছিল ক্ষমতার ভারসাম্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ, অস্ত্র-বাণিজ্য এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী।
সম্মেলনের শুরু থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো সদস্যদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ব্যয় করছে না, ইউক্রেন যুদ্ধ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত নয়, এবং গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পুরোনো দাবি আবার সামনে আনেন। প্রতিরক্ষা-ব্যয় কমানোর অভিযোগে স্পেনকে বাণিজ্যিক চাপের হুমকিও দেন। এ সব বক্তব্যে মনে হচ্ছিল, এবারের সম্মেলন হয়তো বিভাজনের মধ্য দিয়েই শেষ হবে। কিন্তু সম্মেলনের চূড়ান্ত ফলাফল ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।