হ্যাগলান্ডস ডিফর্মিটি কী? কেন ফুটবলাররা বুট কেটে খেলেন
কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি হ্যাগলান্ডস ডিফর্মিটি?
গোড়ালির পিছনে ব্যথা হলেই যে সেটি হ্যাগলান্ডস ডিফর্মিটি, এমন নয়। একই ধরনের উপসর্গ অ্যাকিলিস টেন্ডিনোপ্যাথি, রেট্রোক্যালকেনিয়াল বার্সাইটিস, প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস বা স্ট্রেস ইনজুরির ক্ষেত্রেও দেখা যেতে পারে। তাই সঠিক রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থোপেডিক বা স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রথমে রোগীর উপসর্গ, পায়ের গঠন এবং হাঁটার ধরন পরীক্ষা করেন। এরপর প্রয়োজন হলে এক্স-রে করে গোড়ালির হাড়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা হয়। যদি অ্যাকিলিস টেন্ডন বা আশপাশের নরম টিস্যুর ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হয়, তবে আল্ট্রাসাউন্ড বা এমআরআই করার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসা কী?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার ছাড়াই এই সমস্যার চিকিৎসা সম্ভব।
প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসকেরা সাধারণত পরামর্শ দেন—
-
শক্ত হিলযুক্ত জুতোর পরিবর্তে নরম ও কুশনযুক্ত জুতো ব্যবহার
-
গোড়ালিতে সিলিকন হিল কাপ বা অর্থোটিক সাপোর্ট ব্যবহার
-
বরফ সেঁক দিয়ে প্রদাহ কমানো
-
ফিজিওথেরাপি ও ক্যালফ মাসলের স্ট্রেচিং
-
প্রয়োজনে ব্যথা ও প্রদাহ কমানোর ওষুধ
-
সাময়িকভাবে দৌড় বা উচ্চমাত্রার অনুশীলন কমিয়ে দেওয়া
অনেক পেশাদার ফুটবলারের ক্ষেত্রে ম্যাচের সময় ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষভাবে তৈরি কাস্টম বুটও ব্যবহার করা হয়।
কখন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়?
যদি দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও ব্যথা না কমে, হাঁটাচলায় অসুবিধা হয় অথবা হাড়ের বাড়তি অংশ অ্যাকিলিস টেন্ডনের ক্ষতি করতে শুরু করে, তখন অস্ত্রোপচার বিবেচনা করা হয়।
অস্ত্রোপচারে সাধারণত গোড়ালির বাড়তি হাড়ের অংশ অপসারণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রদাহগ্রস্ত টিস্যুও পরিষ্কার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে মাঠে ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
ফুটবলাররা কি বুট কেটে সমস্যার সমাধান করেন?
না। বুট কেটে খেলা কোনও চিকিৎসা নয়।
এটি মূলত ব্যথা ও ঘর্ষণ কমানোর একটি ব্যবহারিক সমাধান। খেলোয়াড়দের লক্ষ্য থাকে ম্যাচের সময় গোড়ালির উপর চাপ কমিয়ে পারফরম্যান্স বজায় রাখা। তাই অনেক সময় বুটের হিল কাউন্টার কেটে দেওয়া, নরম প্যাডিং ব্যবহার করা বা কাস্টমাইজড বুট তৈরি করা হয়।
স্পোর্টস সায়েন্স কী বলছে?
আধুনিক স্পোর্টস মেডিসিনে খেলোয়াড়ের পায়ের গঠন অনুযায়ী বুট নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বর্তমানে অনেক ক্লাব ও জাতীয় দল—
থ্রি-ডি ফুট স্ক্যানিং, প্রেসার ম্যাপিং, গেইট অ্যানালিসিস, কাস্টম ইনসোল, ব্যক্তিগত বুট ফিটিং।
ব্যবহার করে খেলোয়াড়দের ইনজুরি কমানোর চেষ্টা করছে।
সাধারণ মানুষ কীভাবে এই সমস্যা এড়াতে পারেন?
শুধু খেলোয়াড় নন, সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা যায়। বিশেষ করে যারা দীর্ঘক্ষণ শক্ত জুতো পরে থাকেন বা নিয়মিত দৌড়ান।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
• পায়ের সঠিক মাপের জুতো ব্যবহার করুন।
• গোড়ালির পিছনে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এমন জুতো এড়িয়ে চলুন।
• নিয়মিত ক্যালফ ও অ্যাকিলিস স্ট্রেচিং করুন।
• ব্যথা শুরু হলে জোর করে অনুশীলন চালিয়ে যাবেন না।
• দীর্ঘদিন ব্যথা থাকলে অর্থোপেডিক বা স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
১. ধারণা: বুট কেটে খেললে সমস্যা সেরে যায়।
বাস্তব: না। এতে সাময়িকভাবে চাপ কমে, কিন্তু রোগের চিকিৎসা হয় না।
২. ধারণা: এটি শুধু ফুটবলারের রোগ।
বাস্তব: না। দৌড়বিদ, টেনিস খেলোয়াড়, নৃত্যশিল্পী বা সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হতে পারেন।
৩. ধারণা: অস্ত্রোপচারই একমাত্র সমাধান।
বাস্তব: অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার ছাড়াই উন্নতি সম্ভব।
বিশ্বকাপে কেন এই বিষয়টি এত আলোচনায়?
বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ কোটি কোটি মানুষ দেখেন। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরায় খেলোয়াড়দের বুট, টেপিং বা সুরক্ষা সামগ্রী স্পষ্ট দেখা যায়। ফলে আগে যেসব বিষয় শুধুমাত্র চিকিৎসক বা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা সাধারণ দর্শকদেরও কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বুটের গোড়ালিতে ছোট একটি কাট আসলে স্পোর্টস সায়েন্স, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্টের একটি বাস্তব উদাহরণ। এটি দেখিয়ে দেয়, সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে গেলে ক্ষুদ্রতম অস্বস্তিও কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।