কুরুক্ষেত্রের ‘অর্জুন-বিষাদ-যোগ’ ও আধুনিক পেশাজীবীর ‘প্যানিক অ্যাটাক’ - 24 Ghanta Bangla News
Home

কুরুক্ষেত্রের ‘অর্জুন-বিষাদ-যোগ’ ও আধুনিক পেশাজীবীর ‘প্যানিক অ্যাটাক’

Spread the love

আমাদের খেয়াল আছে, উদ্বেগে আক্রান্ত হওয়ার আগে অর্জুন প্রিয় সখা-সারথি শ্রীকৃষ্ণকে অনুরোধ করেছিলেন, রথকে কুরুক্ষেত্রের দুই যুযুধান সৈন্যদলের মাঝে নিয়ে রাখতে। যোগেশ্বর তাই করেছিলেন। ‘বার্ডস আই ভিউ’ হয়ে গেল। সবাইকে দেখে-শুনে তখনই সব্যসাচীর ওই মনোবিকলন। আজকের যুগেও অধিকাংশ পেশাজীবীর ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বা তীব্র উদ্বেগের পেছনেও প্রায়শই অক্ষমতা নয়, বরং এই রকম অতিরিক্ত সচেতনতা বা ‘পারফরম্যান্স কনশাসনেস’ কাজ করে।

আজকের প্রেক্ষাপটে

আধুনিক কর্মজীবনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। যে কর্মীটি জানেন একটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তে শতাধিক মানুষের চাকরি চলে যেতে পারে, তাঁর উদ্বেগ স্বাভাবিক। যে চিকিৎসক জানেন একটি অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি আছে, তাঁর দুশ্চিন্তা স্বাভাবিক। যে শিক্ষক জানেন একটি ভুল মূল্যায়ন একজন ছাত্রের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, তাঁর দ্বিধাও স্বাভাবিক। অর্থাৎ সব উদ্বেগ দুর্বলতার লক্ষণ নয়। কখনও কখনও তা দায়িত্ববোধের লক্ষণ। সমস্যা শুরু হয় যখন মানুষ নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করতে অস্বীকার করে।

আমাদের সমাজে একটি বিপজ্জনক ধারণা আছে, সফল মানুষ সব সময় আত্মবিশ্বাসী হবেন, নেতা সবসময় দৃঢ় হবেন, সিনিয়র ম্যানেজার দুর্বলতা দেখাবেন না। আর সেই চিরাচরিত ক্লিশে — ‘পুরুষ মানুষকে কাঁদতে নেই’। ফলে অসংখ্য মানুষ নিজের চিন্তা-ভয়কে লুকিয়ে রাখতে রাখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বাইরে শক্তির অভিনয় চলতে থাকে, ভিতরে জমতে থাকে বিষাদ।

অর্জুন অন্তত সেই ভুলটি করেননি। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘হে মাধব, আমি পারছি না।’ স্বীকারোক্তিটি শুনতে দুর্বলতার মতো। কিন্তু আদপে এটি ছিল সততার কাজ। কারণ যে মানুষ নিজের বিভ্রান্তি চিনতে পারে না, তাকে কোনও জ্ঞান সাহায্য করতে পারে না। শ্রীগীতার শুরু তাই উপদেশ দিয়ে নয়, সৎ স্বীকারোক্তি দিয়ে।

আজ অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের ‘রেজ়িলিয়েন্স’ শেখাতে চায়। প্রফেশনাল বানাতে চায়। কিন্তু সে সবের মানে অনুভূতিহীন হয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের মানসিক অবস্থাকে চিনতে শেখা। একজন মানুষ যখন বলেন, ‘আমি ক্লান্ত’, ‘আমি বিভ্রান্ত’, ‘আমি সাহায্য চাই’ — তখন তিনি আসলে ভেঙে পড়ছেন না। তিনি আসলে নিজেকে পুনর্গঠনের প্রথম পদক্ষেপটি নিচ্ছেন।

আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। অর্জুনের মানসিক সংকটের মূল কারণ যুদ্ধ ছিল না, ছিল পরিচয়ের ভাঙন। সারা জীবন তিনি নিজেকে ‘যোদ্ধা’ হিসেবে জেনেছেন। কিন্তু কুরুক্ষেত্রে এসে হঠাৎ প্রশ্ন উঠল — যুদ্ধে নিয়োজিত হতে যাওয়া এই ‘আমি’ কে? আমার পিতৃব্যস্থানীয়, গুরুজন, অগ্রজ-অনুজ-আত্মীয়দের বাদ দিলে ‘আমি’ কোথায় থাকে?

আজকের বহু পেশাজীবীর জীবনেও একই প্রশ্ন দেখা যায়। যদি আমার ‘পজ়িশন’ বা ‘ডেজ়িগনেশন’ চলে যায়, যদি বাধ্যতামূলক অবসর নিতে হয়, তখন সমাজ আমাকে কী ভাবে দেখবে? ‘প্রফেশন’ যখন এ ভাবে ‘পরিচয়’ হয়ে ওঠে, তখন কর্মক্ষেত্রের সংকট ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *