ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হবে, বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর, এলাকায় বাম-তৃণমূল
এই সময়, কলকাতা ও বারুইপুর: ক্লাস সিক্সের ছাত্রীকে ধর্ষণ, মারধর ও বস্তাবন্দি করে জলে ফেলে খুন করাকে ‘জঘন্যতম ঘটনা’ বলে উল্লেখ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে রবিবার ওই বালিকার মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার পরে বারুইপুরের একটি তল্লাট যে ভাবে তেতে ওঠে, সে ব্যাপারে তিনি নাম না–করে বিরোধীদের দিকে আঙুল তুলেছেন।
সোমবার মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কালই (রবিবার) ওর (নিহত ছাত্রী) বাবার সঙ্গে আমি কথা বলেছি। ওর বাবা বিচার চেয়েছেন। জঘন্যতম ঘটনা। সিট গঠন করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে চার জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল, দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে (পরে আরও এক জনকে গ্রেপ্তার করা হয়), ডিটেন করা হয়েছে তিন জনকে। যাদের সঙ্গে পলাতক দুই আসামির ফোনে কথোপকথনের কথা পুলিশ জানতে পেরেছে।’
ওই ঘটনায় দোষীদের ‘ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দেবো’ বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান। তাঁর বক্তব্য, আইজি (প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ)–র নেতৃত্বে তদন্ত চলছে। এ দিন ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান থেকে বেরনোর মুখে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পরিবার যে ভাবে জাস্টিস চেয়েছেন, সরকার ও পুলিশের কাছ থেকে তাঁরা যে সব সহযোগিতা চেয়েছেন, সেটা তাঁরা পাবেন।’
তবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘যেটা মব লিঞ্চিং হয়েছে, তার পিছনে একটা কমিউনাল অ্যাঙ্গেল ছিল।’ তিনি জানান, ‘জঘন্যতম অপরাধের’ মামলা ছাড়া আরও তিনটি মামলা হয়েছে। গণপিটুনির ঘটনা ছাড়া আরও দু’টি। শুভেন্দুর সংযোজন, ‘যে ভাবে রেলপথ ওড়ানো হয়েছে, তাতে আমাদের অতীত ইতিহাস মনে পড়ছে…সিএএ–বিরোধী আন্দোলন বা কিছু দিন আগে ওয়াকফ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল বিরোধী আন্দোলন। তৃতীয় হচ্ছে, সিআরপিএফের দু’জন জওয়ান আহত হয়েছেন, পুলিশের একটা গাড়ি জ্বালানো হয়েছে।’
মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এই তিনটে বিষয়ে জড়িত তিন পক্ষ— যাঁরা অতৃপ্ত আত্মা, ভোটে হেরে যাঁরা ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন এবং এখনও যাঁরা ঘরে ঢুকে আছেন— এই তিন পক্ষ। মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি, ‘এঁদেরও কিন্তু ভুগতে হবে। এমন ভোগাব, বুঝতে পারবেন।’
বারুইপুরের ঘটনার প্রতিবাদে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোমবার বিকেলে হাতে মোমবাতি নিয়ে তাঁর হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়ি থেকে মিছিল করে হাজরা মোড় ঘুরে বাড়িতে ফেরেন। মমতার ওই মোমবাতি মিছিলে তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরের সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন ও প্রতিমা মণ্ডল ছাড়াও তৃণমূলের ছাত্র–যুবকর্মীরা ছিলেন। মোমবাতি মিছিলের পরে মমতা কিছু না বললেও সাংসদ প্রতিমা বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে বিভাস সর্দার, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন ও আমি বারুইপুরে গেছিলাম। আমরা ওই পরিবারের পাশে রয়েছি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রবিবার ওখানে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাঁকে হাউস অ্যারেস্ট করে রেখেছিল।’
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে হাউস অ্যারেস্ট করার অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, ‘কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হাউস অ্যারেস্টে রাখা হবে না? গত ১৫ বছরে যখন প্রতিদিন মহিলাদের উপরে অত্যাচার হয়েছিল তখন উনি উন্নাও, মণিপুরে টিম পাঠাতেন, কিন্তু বাংলার কোথাও পাঠাননি। এখন উনি রাজনীতি করতে যাবেন! আমার তা অ্যালাও করব? আপনি গিয়ে উস্কানি দেবেন? এটা আমরা করতে দেবো না।’ রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ অবশ্য বলছেন, ‘হাউস অ্যারেস্ট কেন করা হবে? উনি (মমতা) যাতে ডিম না–খান, তার জন্য পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’ তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরের বক্তব্য, রবিবার রাতের পরে সোমবারও মমতা বারুইপুরের নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন।’
অভয়ার মা, পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ বারুইপুরের ঘটনা নিয়ে এ দিন বলেন, ‘এক জন মা হিসেবে এই নৃশংসতার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমাদের সরকার মাত্র দু’মাস হলো দায়িত্ব নিয়েছে।’ তাঁর দাবি, পূর্বতন সরকারের আমলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং দুর্নীতির পরিবেশের ফলেই সমাজে এ ধরনের অপরাধ বেড়েছে।
রবিবারের মতো অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির পুনাবৃত্তি ঠেকাতে বারুইপুর,সোনারপুর ও নরেন্দ্রপুর থানা এলাকায় বিএনএসএসের ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। তার মধ্যেই এ দিন তৃণমূলের প্রতিনিধিদল গিয়ে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে। এ দিন ওই এলাকায় যায় সিপিএমের প্রতিনিধিদল। ওই দলে ছিলেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী শমীক লাহিড়ী ও সিপিএমের দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা সম্পাদক রতন বাগচী। সুজন বলেন, ‘সরকারের বদল হলেও নারী সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন থেকই গেল।’ নিহত স্কুলছাত্রীর বাড়িতে এসেছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের নেতৃত্বে কংগ্রেসের এক প্রতিনিধিদল। এ দিন বামফ্রন্টের তরফে বারুইপুর থানায় স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। স্মারকলিপি জমা দিয়েছে এসইউসিআই–ও। এসইউসিআই নেতা তরুণ নস্করের বক্তব্য, ‘পুলিশ যদি পরিবারের কাছ থেকে ছাত্রীটির নিখোঁজ সংবাদ পাওয়ার পরে একটু সক্রিয় হতো, তা হলে হয়ত মেয়েটিকে জীবন্ত অবস্থায় ফিরে পাওয়া যেত।’