কেন শুধু নিমকাঠ দিয়েই তৈরি হয় জগন্নাথদেবের মূর্তি? কী ভাবে তা মিলে যায় জীবনদর্শনের সঙ্গে? - 24 Ghanta Bangla News
Home

কেন শুধু নিমকাঠ দিয়েই তৈরি হয় জগন্নাথদেবের মূর্তি? কী ভাবে তা মিলে যায় জীবনদর্শনের সঙ্গে?

Spread the love

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের লীলাকথার শেষ নেই। কখনও তাঁর দর্শন পেতে ছুটে আসেন স্বয়ং সমুদ্রদেব, ভেসে যায় সব ঘর বাড়ি। কখনও আবার তিনি তাঁর প্রিয় ভক্তের সঙ্গে যান আম চুরি করতে, তারপর ধরা পড়লে দোষ চাপিয়ে দেন সেই ভক্তের কাঁধে। হাওয়ার বিপরীতে ওড়ে জগন্নাথ মন্দিরের ধ্বজা। তেমনই আরেক বিশেষত্ব হলো এখানে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শনের কোনও পাথর বা ধাতুর মূর্তি নেই। বরং তা নির্মিত বিশেষ ভাবে নির্বাচিত নিমকাঠ দিয়ে। ভারতের অধিকাংশ হিন্দু মন্দিরে যেখানে পাথরের বিগ্রহ পূজিত হয়, সেখানে জগন্নাথদেবের কাঠের মূর্তি কেন? তাও আবার যে সে কাঠ নয়, স্বপ্নাদেশে পাওয়া বিশেষ চিহ্নযুক্ত নিমকাঠ।

কেন নিমকাঠে তৈরি হয় জগন্নাথের মূর্তি?

তার নেপথ্যে রয়েছে পুরাণ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা বিশেষ আচার। জগন্নাথ সংস্কৃতিতে নিমকাঠকে ‘দারু ব্রহ্ম’ বলা হয়। ‘দারু’ অর্থ কাঠ এবং ‘ব্রহ্ম’ অর্থ পরম চৈতন্য। বিশ্বাস করা হয়, ভগবান স্বয়ং এই পবিত্র কাঠে অধিষ্ঠান করেন। তাই জগন্নাথদেবের মূর্তি সাধারণ কাঠ দিয়ে নয়, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে নির্বাচিত নিমগাছের কাণ্ড থেকেই তৈরি করা হয়।

কী ভাবে বাছা হয় সেই কাঠ?

যে কোনও নিমগাছ দিয়ে এই মূর্তি তৈরি করা যায় না। ‘নবকলেবর’ অনুষ্ঠানের সময় মন্দিরের দৈতাপতি সেবক ও পুরোহিতরা বিশেষ ধর্মীয় আচার পালন করে উপযুক্ত গাছের সন্ধান করেন। প্রচলিত বিশ্বাস, সেই গাছে শঙ্খ, চক্র, গদা বা পদ্মের মতো শুভ চিহ্ন থাকতে হয়। পাশাপাশি গাছটির অবস্থান, আশপাশের পরিবেশ এবং আরও একাধিক ধর্মীয় লক্ষণও বিচার করা হয়। এই পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপনীয় ভাবে সম্পন্ন হয়।

জগন্নাথদেবের মূর্তি চিরস্থায়ী নয়। নির্দিষ্ট সময় অন্তর, সাধারণত ১২ থেকে ১৯ বছর অন্তর, নবকলেবর উৎসবে পুরোনো বিগ্রহের পরিবর্তে নতুন নিমকাঠের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পুরোনো মূর্তির অন্তর্নিহিত পবিত্র ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ বিশেষ গোপন আচার মেনে নতুন মূর্তিতে স্থানান্তর করা হয়। এই প্রথা জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের চিরন্তন দর্শনের প্রতীক বলে মনে করা হয়।

জড়িয়ে রয়েছে পুরীর জগন্নাথ মন্দির তৈরির ইতিহাসও

পুরাণ ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান জগন্নাথের মূর্তি তৈরির ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে মালব দেশের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন-এর সঙ্গে। বলা হয়, রাজা স্বপ্নে ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশ পান যে, তিনি নীলাচলে তাঁর এক বিশেষ রূপে অধিষ্ঠিত হতে চান। সেই স্বপ্নাদেশ অনুসারে রাজা পুরীতে এসে একটি মহামন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন।

কিন্তু দেবমূর্তি কী দিয়ে তৈরি হবে, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন। তখন সমুদ্রতটে এক অলৌকিক নিমকাঠের গুঁড়ি ভেসে আসে। প্রচলিত বিশ্বাস, এটি ছিল স্বয়ং বিষ্ণুর ‘দারু ব্রহ্ম’ রূপ। রাজা সেই কাঠ দিয়েই মূর্তি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মূর্তি গড়বে কে?

লোকবিশ্বাস, বিষ্ণুর আদেশে এক বৃদ্ধ ছুতোরের বেশে বিশ্বকর্মা রাজদরবারে এসে জানান, তিনি মূর্তি গড়বেন। তবে তাঁর একটি শর্ত ছিল— মূর্তি গড়তে সময় লাগবে একুশ দিন। সেই সময় মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকবে, কেউ ভিতরে উঁকি দিতে পারবেন না। আর যদি কেউ নিয়ম ভঙ্গ করেন, তা হলে যতদূর কাজ হবে, সেখানেই থামিয়ে রেখে তিনি চলে যাবেন।

রাজা সেই শর্তও মেনেও নেন। কিন্তু কয়েক দিন পর ভিতর থেকে কোনও শব্দ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ইন্দ্রদ্যুম্ন দরজা খুলে দেন। তখনই বিশ্বকর্মা অন্তর্ধান করেন। দেখা যায়, জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তি সম্পূর্ণ হলেও তাঁদের হাত-পা পূর্ণাঙ্গ নয়।

রাজা অনুতপ্ত হলেও দৈববাণী হয়, এই রূপেই ভগবান পূজিত হতে চান। সেই থেকেই নিমকাঠ দিয়ে নির্মিত অসম্পূর্ণ অঙ্গবিশিষ্ট জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তিই আজও পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে পূজিত হয়ে আসছে। এই কাহিনি ভক্তদের কাছে বিশ্বাস, ভক্তি ও ঈশ্বরের অলৌকিক লীলার এক অনন্য প্রতীক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জগন্নাথদেবের কাঠের মূর্তি শুধু একটি ধর্মীয় প্রথা নয়। বরং এটি জীবনের অসম্পূর্ণতা, নবজন্ম এবং ঈশ্বরের চিরন্তন উপস্থিতির প্রতীক। এই অনন্য ঐতিহ্যই পুরীর জগন্নাথ ধামকে বিশ্বের অন্যান্য মন্দিরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পরিচয় দিয়েছে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *