কথা নয়, ইশারাতেই চলে জীবন! ভারতের ‘সাইলেন্ট ভিলেজ’-এর রহস্য জানেন কি?

ভারতের প্রতিটি জায়গারই নিজস্ব একটি পরিচয় রয়েছে। কোথাও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, কোথাও আবার ইতিহাস বা সংস্কৃতির জন্য সেই গ্রাম বিখ্যাত। কিন্তু ভারতের এই ছোট্ট গ্রামে সবসময়ই থাকে নিস্তব্ধ। কিন্তু পুরো একটা গ্রাম এমন সাইলেন্ট কী করে? আসলে এই গ্রামে থাকেন ১০৫ টি পরিবার। আর এরা কেউই কথা বলেন না।

কোথায় অবস্থিত এই গ্রাম?
জম্মু ও কাশ্মীরের ডোডা জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত ধাদকাই (Dhadkai) গ্রাম। ভাদেরওয়া (Bhaderwah) শহর থেকে প্রায় ১০৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রাম চারিদিকে সবুজ পাহাড়, ঘন বন এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। প্রথম দেখায় এটি যেন ছবির মতো সুন্দর একটি পাহাড়ি জনপদ।

এই গ্রামের সৌন্দর্য এতটাই মনোমুদ্ধকর যে, মানুষ এমনি এখানে গেলে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আসলে এই গ্রামের মানুষরাই কেউ কারও সঙ্গে কথা বলেন না।

আসলে এই গ্রামের বিশেষত্ব হলো, এখানকার বহু বাসিন্দাই জন্মগত ভাবে শুনতেও পারেন না এবং কথাও বলতে পারেন না। এখানে মানুষের কোলাহল, শিশুদের চিৎকার বা সাধারণ কথাবার্তার শব্দও এতটাই কম শোনা যায়, যে এই গ্রামকে ‘সাইলেন্ট ভিলেজ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

তবে একই গ্রামের এত বেশি মানুষের মধ্যে এক ধরনের সমস্যা দেখা যাওয়ায় এই গ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসক ও গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

তবে এখানকার আরও একটি বিষয় মজাদার। যেহেতু অনেকেই এখানে কথা বলতে বা শুনতে পারেন না, তাই গ্রামের মানুষ মূলত ইশারা ও ‘সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের’ মাধ্যমেই যোগাযোগ করেন। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা এই ভাষা শিখে বড় হয়। ফলে নীরবতার মধ্যেও গ্রামের সামাজিক জীবন স্বাভাবিক ভাবেই এগিয়ে চলে।

স্থানীয়দের মতে, এই সমস্যা নতুন নয়। বহু প্রজন্ম ধরেই গ্রামের শিশুদের মধ্যে জন্মগত এই সমস্যা রয়েছে। কিন্তু কেন এই সমস্যা? চিকিৎসকদের একাংশের মতে, এই অস্বাভাবিক ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে জিনগত (Genetic) বৈশিষ্ট্য।

এখানে একই সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিয়ের প্রচলন ছিল। তাই কিছু জন্মগত রোগ বা প্রতিবন্ধকতার সেই জিনগত পরবর্তী প্রজন্মের মধ্য এগিয়ে চলেছে। এই নিয়ে রয়েছে অনেক কুসংস্কারও। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকলেও গ্রামের কিছু বাসিন্দা এখনও এই ঘটনাকে স্থানীয় অভিশাপ হিসেবে মানেন।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর উদ্যোগ
এই গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর রাষ্ট্রীয় রাইফেলস (Rashtriya Rifles)। তারা ধাদকাই গ্রামে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করছে। শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা, সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে শেখানোর প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য পরিষেবা, খাদ্য ও পোশাকের মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে সেনাবাহিনির তরফে।

নীরবতার মাঝেও জীবনের লড়াই
ধাদকাই শুধু একটি নীরব গ্রাম নয়, এটি মানুষের অদম্য মানসিক শক্তি ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতারও প্রতীক। কথা বলতে বা শুনতে না পারলেও এখানকার মানুষ পরস্পরের সহযোগিতা, ইশারার কথা বলা এবং আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে একটা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।