একটা বুলেটের বদলে জুটত ভরপেট টিফিন
চন্দন সেন
বাহাত্তর-তিয়াত্তর সাল। কলকাতা তখন জ্বলছে। আমি সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলে পড়ি। ক্লাস থ্রি। স্কুলের নীচ থেকে পুলিশ গুলি চালাচ্ছে। আর উপর থেকে বোম ছুঁড়ছে নকশালরা। গোলাগুলি শেষ হতে না হতেই আমরা দৌড়োলাম বুলেটের খোল কুড়োতে। এ ওকে ধাক্কা মেরে বন্ধুর চোখ এড়িয়ে কে আগে কুড়িয়ে নেবে বুলেটের খোল! মরিয়া চেষ্টা করছি সবাই। যেন একটা মস্ত কম্পিটিশন চলছে। বুলেট তো নয়, যেন গাছ থেকে তাল পাড়ার কম্পিটিশন। আমরা কাড়াকাড়ি করছি। ধাক্কাধাক্কি করছি। কারণ, যে বুলেটের খোল খুঁজে বের করতে পারবে তার বরাতে জুটবে একটা এক্সট্রা টিফিন। ওরা বুলেটের খোল দিয়ে তৈরি করবে বোমের স্প্লিংটার। আমরা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। পেটে ইঁদুর দৌড়লে ইশকুলের দেওয়া টিফিনই আমাদের ভরসা। বুলেটের খোল কুড়োতে কুড়োতে প্রথমবার শিখছি, একটা বুলেটের বিনিময়ে কীভাবে ছিনিয়ে নেওয়া যায় একদিনের ভরপেট খাবার।
আমার বাবা কিশললয় সেন ৬৭তে যুক্তফ্রন্টে আবদুল্লা রসুল সাহেবের পি.এ ছিলেন। গনশক্তি পত্রিকার অন্যতম প্রধাণ রিপোর্টার। মনে আছে স্কুল থেকে নিয়ে এসে আমাকে এক ভদ্রলোকের ঘরে বসিয়ে দিতেন। গম্ভীর লোকটির ঘরেই স্কুলের ব্যাগ রেখে আমি অংক কষছি। লোকটা চুরুট খাচ্ছে আর গম্ভীর গলায় জিগ্যেস করছে –’আইজ কী হইল।‘ কোনও-কোনও দিন আবার আমায় ফেলে দেওয়া হত বসন্ত কেবিনে। কিছু রোগা-রোগা ছেলের মাঝখানে। ছেলেগুলির পরণে মলিন গেঞ্জি, পাজামা। গরমে দরদর করে ঘামছে। তাদের চেহারা খুবই করুন। আজ মার খাচ্ছে,, তো কাল জেলে যাচ্ছে, পরশু আবার লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে এমনই অবস্থা। অথচ ওদেরই মধ্যে একজন আমায় ইংরেজি দুর্দান্ত শেখাচ্ছে, একজন শেখাচ্ছে অঙ্ক । একদিন জানলাম ওদের নাম। প্রথমবার। ওরা পাঁচজন—বুদ্ধ-বিমান-অনীল-সুভাষ আর আজিজুল।
পচাত্তর-ছিয়াত্তর সাল। শহীদ মিনারে সিপিএম এর মিটিং চলছে। জাদুঘরের দিক থেকে পুলিশ আক্রমণ করল। প্রতিরোধ করতে পুরুষরা ঝান্ডা থেকে পতাকা খুলে নিয়ে দৌড়লেন। আমি দেখছি ওরা ফিরে আসছেন রক্তাক্ত হয়ে। আমি সে দৃশ্য দেখে শিউরে উঠছি! পরক্ষণেই দেখলাম, মেয়েরা নিজেদের শাড়ির আচল ছিড়ে পুরুষদের ক্ষতবিক্ষত মাথা পরম মমতায় বেঁধে দিচ্ছেন। দেখতে-দেখতে আমি প্রথমবার উপলব্ধি করলাম, এ কলকাতার ভেতর আছে আরেকটা কলকাতা। সেখানে ভালবাসার রঙ — লাল।
মারোয়াড়ি হাসপাতালের পাশ দিয়ে একটা গলি দিয়ে স্কুলে যেতাম। আশ্চর্য হয়ে দেখতাম, রাস্তার দুধারে বাড়িগুলোর মেসবাড়ির আদল। সারা বাংলা থেকে ছাত্ররা পড়তে আসছে। তাই তাদের থাকার জন্য ওভাবেই বাড়ি বানানো হয়েছে। সে সব বাড়ির ধারে গজিয়ে উঠেছিল এক আশ্চর্য যৌথ জীবন। একটা মেসপাড়া। ছাত্ররা থাকছে, ওখানেই পড়াশোনা করছে, পাশেই দোকানে খাচ্ছে, অনতিদূরে বই বাঁধানো হচ্ছে, সেখান ভেসে আসছে গদের আঠার গন্ধ। এই রাস্তাটা আমি মিস করি। এখনও খুঁজলে কলকাতার কিছু পুরনো পাড়ায় মেসবাড়ির আদলে বানানো এমন দু একটা বাড়ির হদিস হয়তো পেলেও পাওয়া যেতে পারে।
ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার পর্বের শুরুটা আমহার্স্ট স্ট্রীট থেকে হয়েছিল বটে, পরে পড়তে গিয়েছি সরিষা রামকৃষ্ণ মিশনে। আবাসিক ছাত্র আমি। আমাদের রামকৃষ্ণ মিশনে কোনও বাউন্ডারি ওয়াল ছিল না। সীমানা নেই, তাই বহুদূর হেঁটে চলে যেতাম আমরা। আমরা বাঁধনছাড়া ছিলাম বটে কিন্তু বেঁধে বেঁধে থাকতাম। নিয়ম ফাকি দেও্যার হাজার ফিকির খুঁজতে আমাদের জুড়ি ছিল না। মিশনের আবাসিক ছাত্রদের ভোরবেলা উঠতে হবে।
প্রার্থণার সময় সাড়ে পাঁচটা। অত সকালে কে ওঠে। ঠিক করলাম প্রতিদিন আমদের মধ্যে দুজন ডিউটি করবে। তারা জাগবে। বাকিরা ঘুমবে। প্রহরীদের পারিশ্রমিক ঠিক হল। সবার বাড়ি থেকে আনা ভাল-ভাল খাবার। কৌটোর ভেতর পাথর দিয়ে তৈরী করে ফেললাম ঘন্টা। আমরা ঘুমবো। যদি কখনও মহারাজ চলে আসেন, দুজন প্রহরী কৌটো ধরে টানবে। সাবধান করবে। একদিন সত্যিই মহারাজ এলেন, ধড়ফড় করে উঠে বসলাম।
অনেকরকম কাজ প্রথমবার শিখেছি রামকৃষ্ণ মিশনে। যেগুলো পরে ব্যবহারিক জীবনে আশ্চর্য কাজে লেগেছে। ্নিজের জামা নিজে সেলাই করা, নিজের ঘর নিজে পরিষ্কার করা– এগুলো তো ছিলই। মনে আছে হাঁপরে কাস্তে তৈরি করেছি প্রথমবার, সূতো তৈরি করছি হাত চরকায়। প্রথমবার পোলট্রি পরিষ্কার করার দায়িত্ব পেয়ে কাঁচা ডিম খেয়ে ফেললাম। কপালে মার জুটল। চুরি করে ডাব খেলাম। আবার মার। মার খাওয়া আটকাতে পারি না-পারি প্রতিরোধের বর্ম তো তৈরি করতে পারি? তখন একটা কোম্পানি লম্বা লম্বা খাতা তৈরি করত। জামার নীচে পিঠের মধ্যে গুজে রাখলাম সেই লম্বা খাতা। জানি, মার খাব পশ্চাতদেশে। উত্তম-মধ্যম পড়লেও, ব্যাথা কম লাগবে। একদিন ধরা পড়ে খাতা সমেত জামানত জব্দ হল এবং পিঠে যা পড়ল তা গতবারের দ্বিগুন! আমি অবশ্য এতে দমে যাওয়ার পাত্র ছিলাম না। ধানকাটা হয়েছে। আমাদের কাজ পড়ল– ইদুরের গর্ত খুঁজে ধান আনার। আমাদের সতর্ক করা হল, গর্তে সাপ আছে কিনা আগে খতিয়ে দেখতে হবে। এব্যাপারে সাহায্য করবে তুলনায় একটু বড় ক্লাস ইলেভেনের এক দাদা। সে অভিজ্ঞ।
অবাক হয়ে দেখলাম, চোখে ধুলো দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের থেকে ইঁদুরদের স্কিলসেটও বড় একটা কম নয়। আগেকার দিনে পাখার আর্মেচার হত। দেখলাম, ঠিক সেই আর্মেচারের মতো করে ইদুররা ধান সাজিয়ে রেখেছে। প্রথমে খারাপ ধান, তারপর ভাল ধান। আর একেবারে মাঝখানে রেখেছে তাদের ছানাপোনা। আর একদিন হয়েছে কী, তড়বড় করে গাছে উঠেছি ফল পাড়তে, ফল নেব কী, দেখছি বড়সড় একটা জলঢোরা সাপ! পাখীর বাচ্চা খেতে গাছে চড়েছে। আমার সঙ্গেই। নড়ব, না চড়ব, না কোনও ডাল ধরে ঝাঁপ মারব , ভবতে গিয়ে দেখি গাছের ভিতর থিকথিক করছে কাঠপিঁপড়ে। কামড়ালে রক্ষে নেই! ওদিকে ফলচুরির খবর পেয়ে চোর ধরতে গাছের নীচে হাজির হয়েছে বাহাদুর । প্রথমবার হাড়ে হাড়ে টের টেলাম- জলে কুমীর, ডাঙায় বাঘ কাকে বলে।
হস্টেল জীবন শেষ করে একসময় পার্ক সার্কাস সিআইটি রোডে থাকা শুরু করলাম। আমাদের পাড়াটা ছিল আক্ষরিক অর্থে যাকে বলে মাল্টি-এথনিক। অসংখ্য চীনা পরবার, তাদের গা ঘেষাঘেষি করে বাঙালি আর বিহারী মুসলমান, আবার তাদের পাশাপাশি খ্রীস্টান এবং বাঙালি হিন্দু পরিবার। সবাই একসঙ্গে চুটিয়ে ফুটবল খেলছি পাড়ায়। সরস্বতী পুজো হলে নিজেরাই চাটাই জোগাড় করছি।। ফল কিনতে গিয়ে পয়সা কম পড়েছে দেখে সংঘবদ্ধ হয়েই ফল চুরি করছি বেমালুম। আবার যারা-যারা আমাদের চাঁদা দেয়নি, তাদের বাড়িতে চুপিচুপি ময়লা ফেলে আসছি। কম ডানপিটে তো ছিলাম না। বন্ধুরা একসাথে পুজোর চাদা তুলছি , ইদের দিন বাড়ি-বাড়ি মাংস বিক্রি করছি, দুলদুলে নাচছি। চাইনিজ বড়দিনে সবাই মিলে ড্রাগনের মধ্যে ঢুকে সে কী লম্ফঝম্ফ নাচ! নাচতে নাচতে প্রথমবার বুঝতে পারছি বেঁচে থাকাটা কী অপূর্ব রঙিন আর কী অনায়াস সহজ!
আস্তে আস্তে যখন বড় হয়ে উঠলাম তখন চোখের সামনে দেখলাম, কীভাবে আমার বন্ধুরা অনেকেই পেটের দায়ে সমাজবিরোধী হয়ে উঠল। ওদের জীবনের নানা ওঠাপড়ায় জড়িয়ে আমিও প্রথমবার বুঝতে শিখলাম, ওরা সিনেমায় দেখা বা গল্পে পড়া সমাজবিরোধীদের মতো নয়। ওরা আদ্যন্ত মানুষ। ওদের সুখ দুঃখ আশা আকাংক্ষা, প্রেম, সন্তানের জন্মতে আনন্দাশ্রু, শিশুকে বড় করার লড়াই — সবটাই আর পাঁচটা মানুষের মতো। ওদের আসলে উপায় ছিল না, তাই ওরা সমাজবিরোধী হয়েছে। এত কাছ থেকে ওদের জীবন দেখতে দেখতে প্রথমবার মনে হয়েছে, এই “মানুষ সমাজবিরোধী”-দের কি সত্যিই এ-শহর চেনে? একদিন কথাচ্ছলে সুনীলদা (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) কে বলেই ফেললাম, আপনারা যে সমাজবিরোধীদের ছবি আঁকেন, আমার দেখা সমাজবিরোধীরা কিন্তু মোটেও সেরকম নয়। সুনীলদা রেগে যান নি। বরং অসম্ভব আগ্রহ নিয়ে আমার থেকে শুনতেন, ওদের জীবনের কথা। একদিন সমরেশ মজুমদারের সঙ্গে এই নিয়ে তর্ক জুড়ে দিলাম। তখন বয়স অল্প ছিল, রক্ত গরম।
২০০৬ সাল। যে-আসগার আমাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হইহই করে সরস্বতী পুজোর ঠাকুর নিয়ে আসে প্রতিবার, প্রথমবার শুনলাম, তার নাকি এসব পুজো আচ্চার কাজে থাকা বারণ। ঠিক কবে ও আমাদের থেকে আলাদা হল এর আগে বুঝিনি। সব প্রথমের অনুভব তো মধুর হয় না। কখনও কখনও তা বেঁচে থাকাকে বেরঙিন, অর্থহীনও করে দেয়। ২০০৬ সাল প্রথমবার আমার বর্ণময় পাড়াটাকেও ফিকে করে দিল। চাইনিজ পরিবারগুলো ক্রমে পাড়া ছেড়ে যেতে শুরু করল। শহরের চেহারাটা যে আস্তে আস্তে পালটে যাচ্ছে—এর আগে বোধহয় কোনওদিন এত স্পষ্ট করে ঠাহর করতে পারিনি।
যে-আমি ইস্ট বেঙ্গল মোহনবাগানের খেলা দেখে প্রবল গন্ডগোলের মধ্যে পিঠে মাউন্টেন পুলিশের ঘা খেয়ে বাড়ি ফিরেছি, প্রচন্ড কাদার মধ্যে ফুটবল খেলে দুম করে লাফিয়ে পড়েছি পুকুরে, বাবলা গাছের কাঁটা বাঁচিয়ে ফল খেতে গিয়ে হাত পা কেটেকুটে একসা হলেও শরীর নিয়ে আতুপুতু করিনি, সেই-আমি একদিন জানতে পারলাম আমার ভেতরে বাসা বেধেছে কর্কট রোগ। প্রথমে মনে হল, আমিই কেন? আমি তো বাসভাড়া দিই। ট্রেনেও টিকিট কেটে উঠি। জ্ঞানত কোনও মানুষকে অপমান করিনি। এতগুলো প্রেম ভাঙার পরেও, আবার প্রেম করেছি। তাহলে? তখন ক্যালক্যাটা ক্লাবে প্রায় আটবছর টানা ডিরেকশনের কাজ করছি। এক সিনিয়র ডাক্তারের পরামর্শে গেলাম ডাক্তার সুবীর গাঙ্গুলির চেম্বারে। দেখতে পেলাম ওখানে যারা এসেছেন তারা বেশীরভাগই নিম্নবর্গের মানুষ । অসুস্থ শরীরে প্রত্যেকেই একা এসেছেন। এদিকে আমার সঙ্গে চারটে ছেলে। আমায় তারা আগলে নিয়ে গিয়েছে। প্রথমবার নিজেকে অসম্ভব প্রিভিলেজড মনে হল। এই মানুষগুলোর সঙ্গে কেউ নেই , আমার সঙ্গে চার-চারজন! তবু আমি ভাবছি আমিই নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা লোক! সেই মুহূর্তে মনে হল, অসুখ নিয়ে আমার এ দুঃখবিলাস সাজে না। আমি ও ভাবনা ছেড়ে দিলাম।
মানুষের মাথা দুটো হাড়ের উপর থাকে। তাই মাথাটা ভিন্ন ভিন্ন দিকে ঘোরে। আমার ডানদিকের হাড়টা ক্যান্সার খেয়ে ফেলে। তেরো ঘন্টা অপারেশনের পর আমার ডানদিকের ওই অংশ কার্যত তার দিয়ে জোড়া লাগান ডাক্তাররা। ষোল ঘন্টা পরে আমার জ্ঞান ফেরে। অপারেশনের পর রেস্ট্রিকশন ছিল বিস্তর। প্রথম যেদিন মঞ্চে পা রাখলাম, সেদিন সমস্ত রেস্ট্রিকশনের কথা মাথা থেকে বেরিয়ে গেল। আমি যেন আগের আমি! অভিনয় করতে করতে হঠাত অনুভব করলাম তীব্র যন্ত্রণা, হাতের নীচে অপারেশন হয়েছে খেয়াল ছিল না, অপারেশনের সেলাই কেটে রক্ত বেরতে শুরু করল। ওখানে একজন ডাক্তার ছিলেন দর্শকাসনে। বললেন, ‘দশ মিনিটের জন্য বন্ধ করুন অভিনয়।‘ ওখানেই সেলাই করলেন আমার হাত। কোনোরকম এনাস্থেসিয়া ছাড়া। আমার যন্ত্রনাদগ্ধ মুখ দেখে রসিকতা করে বললেন, :পাপের ফল। আপনার কী এ অবস্থায় অভিনয় করতে আসা উচিত হয়েছে?’ প্রথমবার মঞ্চের পাশে বসে বকা খেয়ে বেশ মজাই লাগল। ডাক্তারবাবু রীতিমতো ধমক দিয়ে অভিভাবকের স্বরে বললেন—‘কথা দিন হাত নাড়াবেন না। নাহলে হাত কিন্তু বেঁধে দেব।‘ বাধ্য ছেলের মতো কথা দিলাম। এবং আবার অভিনয় শুরু করলাম। এবার শরীরের সীমা এবং মুভমেন্টের রেস্ট্রিকশন সম্পর্কে সচেতন হয়ে। মাথার মধ্যে তখন ঘুরছে আমার প্রিয় লাইন—বাবুমশাই জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি নেহি।
প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। দ্বিতীয় স্ত্রী প্রতারণা করে অন্যের কাছে চলে গিয়েছে, আমি ভেঙে যাইনি। প্রেমের উপর আস্থা হারাইনি। তৃতীয়বার বিয়ে করেছি। তাতে অনেকে হেসেছেন। আমি পাত্তা দিই নি। স্রোতের বিপরীতে হেঁটেছি বলে আমায় অপছন্দ করেছেন অনেকে। আমি সারাজীবন বিশেষ একটা রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করলেও সরাসরি পার্টির সদস্য হইনি। কারণ, আমি বুঝেছি, কোনও দলে থাকলে সেই দলের সমালোচনা করা যায় না। কিন্তু আমার নাট্যদল অশোকনগর নাট্য আনন তো নব্বই সাল থেকেই সরকারের সরাসরি সমালোচনা করেছে বহুবার। আমি চিরকাল বিশ্বাস করে এসেছি– I rebel, therefore we exist.
শুধু একটা দিন নিজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলাম। সেদিন সি আর এভিনিউ পেরচ্ছি। একটা বিরাট কনভয় ট্রাফিকে আটকে গেল আমার সামনেই। দেখলাম ভেতরে লালকৃষ্ণ আদবানী। আমার দেড় হাতের মধ্যে। সদ্য বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। প্রতিবাদী আমি সেদিন ওর চোখে চোখ রেখে চিতকার করে বলতে পারলাম না —শুনছেন! আপনি যেটা করেছেন, সেটা ঠিক নয়!! এই প্রথমবার নিজেকে দুর্বল মনে হল। প্রথমবার নিজেকে মনে হল, নপুংশক।
অনুলিখন: দীপান্বিতা করগুপ্ত