থ্রি-ডি প্রিন্টিংয়ে তাক লাগাচ্ছে জঙ্গলমহলের পড়ুয়ারা
সুমন ঘোষ, শালবনি
জঙ্গলমহলের স্কুলে স্কুলে ছড়িয়ে পড়ছে থ্রি–ডি প্রিন্টিংয়ের আলো। সৌজন্যে মাদ্রাজ আইআইটির অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিক্সের অধ্যাপক পীযূষ ঘোষ। তাঁর চেষ্টায় নবম-দশম শ্রেণির পড়ুয়ারাও তৈরি করে ফেলছে থ্রি–ডি লকেট, ফুলদানি, পেনস্ট্যান্ড থেকে স্কেলিটন! বিজ্ঞান–ভীতি সরিয়ে পড়ুয়ারা বলছে, ‘থ্রি–ডি প্রিন্টার শুধু বিজ্ঞানচর্চার হাতেকলমে শিক্ষা দিয়েছে তা–ই নয়, আমাদের সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। যার মাধ্যমে আমরা সহজেই বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি জানার পাশাপাশি কর্মসংস্থান এবং আত্মনির্ভরতার হাতছানিও দেখতে পাচ্ছি।’
স্কুলে পাঠ্যবিষয় হিসেবে বিজ্ঞান থাকলেও গ্রামের স্কুলগুলিতে প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষাগারের অভাবে কতটুকুই বা সুযোগ মেলে? প্রশ্নটা ভাবিয়েছিল অধ্যাপককে। বিদেশের বিভিন্ন স্কুলে বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ মুগ্ধ করেছিল অধ্যাপককে। তাঁর কথায়, ‘ভারতের একাধিক রাজ্য থ্রি–ডি প্রিন্টিং নিয়ে এগিয়ে গেলেও পশ্চিমবঙ্গ অনেকটাই পিছিয়ে। তাই এ রাজ্যের পড়ুয়াদের কাছে এটি পৌঁছে দেওয়া জরুরি বলেই আমি মনে করি। যাতে প্রতিযোগিতার নিরিখে আমাদের রাজ্যের পড়ুয়ারাও অন্যদের মতোই সমান তালে এগোতে পারে।’
ভার্টিভ এনার্জি প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) গ্রান্ট বাবদ অর্থসাহায্য পেয়ে তাঁর তৈরি ‘টিচ টু লার্ন’ সংস্থা স্কুলে স্কুলে তৈরি করছে ডিভাইস ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব। প্রথমে তামিলনাড়ু ও কেরালার বিভিন্ন স্কুলে সেই পরীক্ষাগার স্থাপন করে থ্রি–ডি প্রিন্টিংয়ের খুঁটিনাটি শেখানো এবং তার মাধ্যমে বিভিন্ন জিনিস তৈরি শেখান তিনি। কিন্তু যে এলাকার সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান, সেই পিছিয়ে পড়া জঙ্গলমহলের স্কুলপড়ুয়ারা কেন বঞ্চিত হবে?
মৌপালে মামাবাড়ি হওয়ায় শৈশবের স্মৃতি রয়েছে যে! তাই মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক প্রসূনকুমার পড়িয়া এবং ভাদুতলা বিবেকানন্দ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক অমিতেশ চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করেন। তাঁরাই গৌতম স্মৃতি সাতপাটি বীণাপাণি বিদ্যামন্দির, গোদাপিয়াশাল চারুবালা বালিকা বিদ্যালয়, পিঁড়াকাটা হাইস্কুল, বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠ (বালিকা)— এই চারটি স্কুলকেও যুক্ত করেন। এই ছ’টি স্কুলে তৈরি করা হয় ডিভাইস ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব। এক্ষেত্রে স্কুলকে স্রেফ ঘর দিতে হয়েছে। বাকি সব খরচই বহন করেছে ‘টিচ টু লার্ন’।
কিন্তু ল্যাব থাকলেই তো হলো না, পড়ুয়াদের শেখাবে কে? দু’জনকে মাদ্রাজ আইআইটিতে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে মাস্টার ট্রেনার তৈরি করেন পীযূষ। তাঁরাই দু’বছর ধরে থ্রি–ডি প্রিন্টারের এবিসিডি, নিজের পছন্দের জিনিস তৈরির ডিজাইন বানানো, তার সঠিক থ্রি–ডি রূপ দেওয়ার কাজ শেখান। মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠের দশমের ছাত্র সৌম্যদীপ ঘোষ, ভাদুতলা বিবেকানন্দ হাইস্কুলের সায়ন্তন চৌধুরীর কথায়, ‘আমি এখন সহজেই থ্রি–ডি ফুলদানি, পেন স্ট্যান্ড, লকেট, ফুলদানির মতো নানা জিনিস ডিজাইনের পাশাপাশি তৈরি করতেও শিখে গিয়েছি।’ বিদ্যাসাগর বালিকা বিদ্যালয়ের দশমের ছাত্রী সঙ্গীতা গুঁইনের কথায়, ‘আমরা ফুসফুস, হাড়, কিডনি থেকে স্কেলিটন – মানব শরীরের প্রতিটি অঙ্গ তৈরি করতে পারি থ্রি–ডি প্রিন্টারের মাধ্যমে। যা ক্লাসে পড়ানোর ক্ষেত্রে অতি জরুরি। সেগুলি আর স্কুলকে কিনতে হবে না।’
২২-২৬ জুন, ৬ দিন ধরে মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যালয়ে আয়োজিত প্রিন্টিং এক্সিবিশন কাম কনফারেন্সে যোগ দিয়েছে জেলার প্রায় ৩০টিরও বেশি স্কুলের ১২০০ জনের মতো পড়ুয়া। পীযূষের কথায়, ‘উৎসাহী মেধাবী পড়ুয়ারা ইচ্ছে করলে এই বিষয়ে আরও চর্চা করে এগিয়ে যেতে পারবে। কারণ, খেলনা থেকে এয়ারক্র্যাফটের বিভিন্ন যন্ত্র — সবই এই থ্রি–ডি প্রিন্টারের মাধ্যমে করা যায়! কারও ইচ্ছে হলে, আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগও রয়েছে খেলনা, ফুলদানি, লকেট থেকে সোনার গয়নার ডিজাইন বানিয়ে।’ প্রসূন বলেন, ‘আমাদের ভীষণ ভালো লাগছে যে, পিছিয়ে পড়া জঙ্গলমহলের পড়ুয়ারাও বিজ্ঞানের একটি বৃহৎ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারল। হাতে-কলমে শিখতে পারল।’