১৫ বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্যাম্পাস খোলার ছাড়পত্র, সবুজ সঙ্কেত কেন্দ্রের
জয় সাহা
দেশে বসেই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিল জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০। সেই শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ বার বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ক্যাম্পাস দেশে তৈরির ক্ষেত্রে বড়সড় অগ্রগতি হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রক সূত্রের খবর, ইউজিসি-র ২০২৩ সালের নির্দিষ্ট নিয়মাবলি মেনে ইতিমধ্যেই ১৫টি বিশ্বমানের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে ভারতে তাদের ক্যাম্পাস খোলার জন্য ‘লেটার অফ ইনটেন্ট’ বা প্রাথমিক সম্মতিপত্র দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ ভারতের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এক সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করবে বলে মনে করছেন মন্ত্রকের কর্তারা।
কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের কথায়, ‘যে কোনও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কিন্তু ভারতে দরজা খোলা হয়নি। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ৫০০-র মধ্যে যে সব বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেই উচ্চ মানের প্রতিষ্ঠানগুলিকেই এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাথমিক সম্মতি দেওয়া হয়েছে। অপেক্ষা করে রয়েছে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।’
শিক্ষা মন্ত্রকের বক্তব্য, এই অবস্থায় এক অভাবনীয় সুযোগ আসতে চলেছে ভারতীয় পড়ুয়াদের কাছে। এখন আর বিদেশে পাড়ি না–দিয়ে, দেশে বসেই বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাবেন ছাত্রছাত্রীরা। এর ফলে ব্রেন ড্রেন বা মেধা পাচারের দীর্ঘদিনের সমস্যাও মিটবে বলে সুকান্ত আশাবাদী। আন্তর্জাতিক স্তরের সিলেবাস, আধুনিক পঠনপাঠন পদ্ধতি এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে জ্ঞান আদানপ্রদানের পথ আরও প্রশস্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, মূলত উদ্ভাবন, উন্নত গবেষণা এবং বিশ্বায়নকে উৎসাহ দেওয়া— জাতীয় শিক্ষানীতির এই প্রধান লক্ষ্যগুলি পূরণ করতেই এই পদক্ষেপ।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলিতে পঠনপাঠনের মান বজায় রাখার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে। সেখানে ছাত্র ও শিক্ষকের অনুপাত থাকবে ১২:১ থেকে ২৫:১-এর মধ্যে। অর্থাৎ, অল্প সংখ্যক পড়ুয়ার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকবেন, যাতে প্রত্যেক ছাত্র বা ছাত্রী ব্যক্তিগত ভাবে শিক্ষকদের কাছ থেকে আরও বেশি সাহায্য ও মনোযোগ পান।
তবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুবিধে হলো, সাশ্রয়। বিদেশে গিয়ে কোনও নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়, সেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় ক্যাম্পাসে পড়লে সেই খরচ অনেকটাই কমবে। শিক্ষা মন্ত্রকের দাবি, বিদেশে পড়ার তুলনায় ভারতে এই ক্যাম্পাসগুলিতে পড়লে ফি বাবদ ছাত্রছাত্রীদের খরচ প্রায় ১৮ শতাংশ থেকে ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে।
যদিও এ বিষয়ে শিক্ষা মহলে কিছু বিতর্কও রয়েছে। শিক্ষাবিদ সুকান্ত চৌধুরীও মনে করছেন এই ব্যবস্থায় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ অনেকটাই কমবে, তবে তাঁর আশঙ্কা, ‘এর ফলে স্বাধীনতার পর থেকে এত বছর ধরে তিলে তিলে যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়–ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার ভবিষ্যৎ কী হবে? এই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এক ধরনের সাম্য রয়েছে। গরিব-বড়লোক সব ধরনের পড়ুয়ারাই এখানে পড়ার সুযোগ পেয়ে এসেছে। দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ভারতের ক’জন ছেলেমেয়ে পড়ার সুযোগ পাবে?’ তাঁর সংযোজন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আসা ইস্তক এমনিতেই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি পিছিয়েছে। এ বার বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় চলে আসায় এ দেশের সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পিছোতে শুরু করবে না তো?’ তাঁর আরও প্রশ্ন, ‘বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কি আদৌ ভারতে তাদের মূল ক্যাম্পাসের মতো পরিকাঠামো দিতে পারবে?’
তবে বর্তমানে সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহ–উপাচার্য (শিক্ষা) ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, ‘এতে ভালোই হলো। এর ফলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। আর সুস্থ প্রতিযোগিতা আরও বেশি সুযোগ করে দেবে উন্নত মানের পড়াশোনার।’ কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্তরও অভিমত, এই প্রতিযোগিতার পরিবেশই দেশের শিক্ষা মানচিত্রে নতুন আশার সঞ্চার করবে। তবে কোন কোন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাথমিক সম্মতি দেওয়া হয়েছে, তা এখনই সুকান্ত জানাতে চাননি।