১৭ বছর কেটে গেল, ঘরে ফেরেননি ন'জন
বুদ্ধদেব বেরা, লালগড়
সদ্য মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। হস্টেল থেকে বাড়ি ফিরছিল ১৬ বছরের ধীরাজ মানা। দিনটা ছিল রবিবার। অভিযোগ, সে দিন ভোরে ধীরাজের জেঠু, সিপিএম কর্মী কেশবচন্দ্র মানার বাড়িতে হানা দেয় মাওবাদী ও পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণ কমিটির নেতারা।
পরিবারের অভিযোগ, সিপিএম করার ‘অপরাধ’–এ কেশবচন্দ্রকে গণআদালতে বিচারের জন্য বাড়ি থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল সেই নেতারা। ‘জেঠুকে তোমরা নিয়ে যাচ্ছ কেন’— প্রশ্নটা করতেই ধীরাজকেও নিয়ে যায় তারা। ধীরাজের মা পূর্ণিমা বাধা দিলে তাঁকে জানানো হয়, ‘গণ–আদালতের কাজ মিটে গেলেই ছেলেকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’ পশ্চিম মেদিনীপুরের লালগড়ের শালবনি গ্রামে ২০০৯–এর ১৪ জুনের সেই ঘটনার পরে কেটে গেল ১৭টা বছর। ধীরাজ আজও বাড়ি ফেরেনি। ফেরেননি তার জেঠুও। পূর্ণিমার মনে সে দিনের স্মৃতি আজও টাটকা। আঁচলে চোখ মুছে তিনি বলেন, ‘আচ্ছা, বলুন তো, ওইটুকু ছেলে কী অপরাধ করেছিল?
সে দিন যারা ছেলেটাকে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়েছিল তারা আজ দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ, আমার ছেলে, ভাসুরের আজও কোনও খোঁজ নেই। রাজ্যের নতুন সরকারের কাছে বিচার চাইছি।’
ধীরাজ ও তাঁর জেঠুই নন, সে দিন ভোরে শালবনির ছ’জন ও পাশের গ্রাম জিরাপাড়ায় চার জনকে গণ–আদালতে বিচারের জন্য তুলে নিয়ে গিয়েছিল মাওবাদী ও জনসাধারণ কমিটির নেতারা। পরের দিন, ১৫ জুন শালবনি গ্রাম লাগোয়া জমিতে প্রবীর মাহাতোর গুলিবিদ্ধ ও গলাকাটা দেহ উদ্ধার হয়। কিন্তু, শালবনির কেশবচন্দ্র মানা, ধীরাজ মানা, মোহন সিং, দেবব্রত সরেন, সঞ্জয় মাহাতো এবং জিরাপাড়ার অসিত সামন্ত, নাড়ু সামন্ত, সুনীল দাস ও তপন দাসদের আজও হদিশ মেলেনি। যদিও ছত্রধর মাহাতোর বক্তব্য, ‘আমাদের ঘাড়ে ভর করে জমানা পরিবর্তন হয়েছিল। অনেকে সুবিধা পেয়েছেন। আর সব পাপের ভাগী হলাম আমি?’
ওই ঘটনার ১০ দিনের মাথায় সিপিএমের ধরমপুর লোকাল কমিটির তৎকালীন সম্পাদক ডালিম পান্ডে পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপারের কাছে ছত্রধর মাহাতো (পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণ কমিটির তৎকালীন মুখপাত্র)–সহ ৪৭ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানান। পরে অভিযোগ দায়ের হয় লালগড় থানায়। সেই মামলা আজও ঝাড়গ্রাম আদালতে বিচারাধীন। ২০২১–এ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণা অনুযায়ী মাওবাদী হানায় নিহত ও নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের স্পেশাল হোমগার্ডের চাকরি দেওয়া হয়। শালবনি ও জিরাপাড়ায় ১০টি পরিবারেই এক জন করে সদস্য সে চাকরি পেয়েছেন। জিরাপাড়ার সুনীল দাস ও তপন দাস, দুই ভাইকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল মাওবাদীরা।
তপনের ছেলে শ্যামল বলেন, ‘২০২১–এর অগস্টে স্পেশাল হোমগার্ডের চাকরি পেয়েছি। তবে দুঃখের বিষয়, সে সময়ে যারা বাবাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, বাড়িঘর ভাঙচুর করেছিল, আজ তাদের সঙ্গেই ডিউটি করতে হয়!’ঝাড়গ্রাম জেলা বিজেপির সভাপতি তুফান মাহাতো বলেন, ‘ওই পরিবারগুলো ঘটনার নথিপত্র আমার হাতে তুলে দিলে আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েই দেখব।’