বাংলাদেশের সরকারের মূল্যায়ন, নিজের ও দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, মুখ খুললেন শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনা: আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছিল। অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার বেআইনি ভাবে ৪ বার অধ্যাদেশ জারি করে এই আইনে ৩৭টি পরিবর্তন এনে ট্রাইবুনাল পুনর্গঠন করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। আমার বিরুদ্ধে যে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে সেটি কোনও বিচার নয়, এটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশোধ মাত্র। আইসিটি-র ক্যাঙ্গারু ট্রায়ালে ন্যায়বিচারের কোনও মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। আমাকে এবং বাংলাদেশ আওয়ামি লিগকে রাজনৈতিক ময়দান থেকে দূরে রাখার জন্যই বিচারের নামে এই প্রহসন করা হয়েছে।
২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে যে আন্দোলন হয়েছিল সেটি কোনও স্বতঃস্ফূর্ত কিংবা স্বাভাবিক আন্দোলন ছিল না। কোটা পরিবর্তনের দাবির আড়ালে এটি ছিল একটি ষড়যন্ত্রমূলক সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন, যাতে দেশি ও বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জড়িত ছিল। অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ক্ষমতা দখল করা ইউনূস নিজেই এই আন্দোলনকে ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আর এই ষড়যন্ত্রকে সফল করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরাই হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নিয়েছিল। আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, এই আন্দোলনের প্রথম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের কর্মী সবুজ আলী।
এই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররা প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে বলেছে, আন্দোলন সফল করার জন্য তারা পুলিশ হত্যা করেছে, মেট্রোরেলে আগুন দিয়েছে। আন্দোলন সফল না হলে সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনার কথাও তারা স্বীকার করেছে। সিরাজগঞ্জের এক বিএনপি নেতা প্রকাশ্যে এনায়েতপুর থানা আক্রমণ করে পুলিশকে হত্যা করার কথা স্বীকার করেছে। অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আহত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দেখতে গিয়ে বলেছিলো আন্দোলনকারীরা ‘লিথাল ওয়েপন’ ব্যবহার করেছে। এই বিষয়গুলোই নির্দেশ করে সাধারণ মানুষদের বিভ্রান্ত করতে খুবই পরিকল্পতি ভাবে কোটা বিরোধী আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।
কোনও মৃত্যুই কাম্য নয়। প্রথম হতাহতের ঘটনার পরেই তাই আমি সঠিক ভাবে তদন্ত করার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলাম। কিন্তু দেশবিরোধী গোষ্ঠী ক্ষমতা দখল করে সেই কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করে দিয়েছে। এমনকি নিহতদের লাশের ময়নাতদন্ত পর্যন্ত করতে দেয়নি। কী ভয় ছিল তাদের? কেন আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে?
রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশন অর্থাৎ ওএইচসিএইচআর-এর তদন্ত পরিচালিত হয়েছিল ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে। ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলনের মাধ্যমে যারা দেশের শাসনক্ষমতা দখল করেছিল তাদের আমন্ত্রণে পরিচালিত তদন্ত কী ভাবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে পারে? এই প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্ট প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এর সপক্ষে কোনও প্রমাণ দেয়া হয়নি। খোদ অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী এই সংখ্যা ৮৩৪, যা ওএইচসিএইচআর-এর চেয়ে অনেক কম। এমনকি গেজেটেও নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মিথ্যা তথ্য সম্বলিত নাম সংযোজন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত। ফলে আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বুদ্ধীজীবী, পেশাজীবী, সাংবাদিক ও বিচারকদের উপর যে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় নির্যাতন চলেছে তা তদন্তের বাইরে রয়েছে। এটি কি কাকতালীয়?
আর একটি বিষয় লক্ষণীয়, ওএইচসিএইচআর-এর কমিশনার ভলকার টুর্ক ২০২৫ সালের মার্চ মাসে বিবিসি-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন— তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, আন্দোলন দমনে কঠোর হলে শান্তিরক্ষী মিশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এটি দৃশ্যতই একটি দেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল, যা রাষ্ট্রপুঞ্জের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। আমরা সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিলাম রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য। মানবাধিকার কমিশনের তরফ থেকে কেন তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকতে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল? অতএব এটি পরিষ্কার, জুলাই অগস্টের ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলন চলাকালীন সময়ে এবং প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশন নিরপক্ষেতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।