শাগরেদদের ডামি সাজিয়ে পাঠাতেন, ১৪ বছরে প্রথম স্কুলে যেতেই বন্দি হেড স্যর!
কৌশিক দে, মালদা
তিনি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। অথচ গত ১৪ বছরে একদিনও স্কুলে যাননি। ‘শাগরেদ’–দের নানা সময়ে ‘ডামি’ সাজিয়ে স্কুলে পাঠাতেন! সেই ‘নকল শিক্ষকরা’ তাঁর অ্যাটেনডেন্স দিয়ে দিতেন! শেষমেশ বৃহস্পতিবার গাড়িতে চেপে ঠাটবাটের সঙ্গে স্কুলে ঢুকতেই তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুধু তাই নয়, ওই প্রধান শিক্ষককে টেনেহিঁচড়ে একটি ঘরে ঢুকিয়ে তালাবন্দি করে ‘চোর চোর’ স্লোগানও দিলেন তাঁরা। ওই শিক্ষক আর কেউ নন, জেলার দাপুটে তৃণমূল নেতা এবং মালদার হবিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের দু’বারের প্রার্থী অমল কিস্কু।
এ দিন মালদার বামনগোলা গ্রাম পঞ্চায়েতের পারহবিনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই ঘটনায় বেশ কিছুক্ষণ আটক থাকার পরে পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে অমলই খবর দেন থানায়। স্থানীয় পুলিশ গিয়ে তাঁকে সেখান থেকে বের করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আটক থাকা অবস্থায় অমল নিজের ভুল স্বীকার করেছেন বলে জানান গ্রামবাসীরা। তাঁরা ওই শিক্ষকের বদলির দাবিও করেছেন।
২০২১ এবং ২০২৬, অমল পর পর দু’বার হবিবপুর বিধানসভা থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে হেরেছেন। তাতে অবশ্য মমতার ‘আশীর্বাদ’ পাওয়া থেকে কখনও বঞ্চিত হতে হয়নি তাঁকে। রাজনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যতবার মালদায় সভা করতে এসেছেন, প্রায় প্রত্যেক মঞ্চ থেকে অমলের নাম উচ্চারণ করেছেন। এতটা আস্থাভাজন বলেই কি স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি তিনি? প্রশ্ন তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের মধ্যে রথীন বিশ্বাস, আশিস মণ্ডল, বিজয় মণ্ডলদের অভিযোগ, তৃণমূলের জমানায় অমলকে একদিনও স্কুলে ক্লাস নিতে দেখা যায়নি।
তাঁদের বক্তব্য, ‘শেষবার ২০১৬–র জানুয়ারিতে তাঁকে কয়েকদিন স্কুলে আসতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সেটা অন্য কোনও কাজে, ক্লাস করাতে নয়। তার পর থেকে কোনওদিন ওই নেতাকে আমরা স্কুলে আসতে দেখিনি। বরং সব সময়ে তাঁকে রাজনীতির মঞ্চেই দেখা গিয়েছে।’
বিক্ষোভকারীদের প্রশ্ন, একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষক কী ভাবে দিনের পর দিন নিজের জায়গায় অন্য কাউকে পাঠিয়ে কাজ সারতে পারেন? এত দিন ‘প্রভাবশালী’ অমলের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খোলেননি। এ বার সরকার বদল হতেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে দাবি গ্রামবাসীদের।
এ দিন গ্রামবাসীদের সঙ্গেই বিক্ষোভে যোগ দেন ওই প্রাথমিক স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক পরানচন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘২০২০–তে আমার অবসরের পরে অমল কিস্কু এখানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান। তার আগে তো বটেই, এমনকী প্রধান শিক্ষক হয়েও স্কুলের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখেননি তিনি। গ্রামবাসীদের মুখে প্রতিদিন শুনতাম প্রধান শিক্ষক আসেন না।’
তাঁর সংযোজন, ‘এ দিন হইচইয়ের খবর পেয়ে স্কুলে এসে দেখি প্রধান শিক্ষককে ঘিরে অসংখ্য মানুষ বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। ওঁদের বিক্ষোভ থামিয়ে অমল বাবুকে বুঝিয়েছি, এ ভাবে কামাই না–করে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুন।’
স্কুল থেকে গাড়িতে চেপে বেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁর ফোন সুইচড অফ থাকায় অমলের কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। পুরো বিষয়টিতে তৃণমূলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন হবিবপুরের বিজেপি বিধায়ক এবং রাজ্যের মন্ত্রী জোয়েল মুর্মু।
তাঁর কথায়, ‘তৃণমূল জমানায় এ ভাবেই শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। এই ধরনের ফাঁকিবাজ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিক।’ মালদা জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক এবং ডিপিএসসি–র চেয়ারম্যান মলয়কুমার মণ্ডল বলেন, ‘কী ঘটেছে জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হবে।’
তৃণমূলের জেলা সভাপতি আব্দুর রহিম বক্সী বলেন, ‘বিষয়টি জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব।’ এখনও পর্যন্ত অমলের নামে কোথাও কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি।