ধ্বংসকাণ্ডে, রক্তপাতে কেন আনন্দ পায় মানুষ?
হাতুড়ি কি মনোরঞ্জন করতে পারে? গাঁইতি কি হয়ে উঠতে পারে বিনোদন সামগ্রী? ধরুন, টেক্সাস শহরের এক প্রাচীন দালানবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রকাণ্ড ক্রেনের রেকিং বলটি সজোরে আঘাত হানল, নিমেষে ধূলিসাৎ হলো দেওয়াল। এক সময়ের বাসযোগ্য ঘরটি, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে পরিণত হলো ধ্বংসাবশেষের নিদারুণ স্তূপে। কিংবা ধরুন, কয়েকশো টন ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রলিক প্রেসের নীচে একনাগাড়ে ছাতু হচ্ছে আপেল, জেলি বিন, ম্যাকারুন, ব্যয়বহুল সব খাদ্যসামগ্রী, চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে চলেছে মহার্ঘ মোবাইল, বহুমূল্যের ল্যাপটপ। নয়তো গাড়ির চাকা মাড়িয়ে দিচ্ছে পানীয়ের বোতল, চাপের তীব্রতায় পিচকিরির মতো ছিটকে বেরোচ্ছে তার রঙিন তরল। আবার ও দিকে নয়তো মেটাল শ্রেডার-এর ধাতব-দাঁত তক্কে তক্কে রয়েছে। বাইসাইকেল, সাবেকি আসবাব, এমনকি মহামূল্যবান মোটরগাড়িটিকেও তুবড়ে কুচিকুচি করবে তার নির্বিকার গ্রাস। ইন্টারনেট-এর এই ‘অডলি স্যাটিসফায়িং’ বা অদ্ভুত রসের তৃপ্তিদায়ক ভিডিয়োগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ধ্বংসযজ্ঞ। অত্যন্ত জনপ্রিয় ও মনস্তাত্ত্বিক ভাবে উদ্দীপক একটি ধারা। দর্শকরা প্রায় ছিনেজোঁকের মত লেপটে থাকে। লক্ষের গুণিতকে ভিউ। অগণিত লাইক, তার সঙ্গে উপচে পড়ছে মন্তব্য-ঘর।
গুঁড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে এমন কী আছে, যা মানুষকে স্ক্রিন-এর সামনে পেরেক-ঠোকা করে রাখে? কেন একটি নিখুঁত, সুগঠিত, কার্যকর বস্তুকে চোখের সামনে চূর্ণবিচূর্ণ হতে দেখলে ভিতরে অদ্ভুত এক তৃপ্তির তরঙ্গ খেলে যায়? মানুষ কি তবে শুধু নির্মাণের প্রাণী নয়, বিপর্যয়েরও গুপ্ত রসিক? ইতিহাসকে মোটের উপর নির্মাণের এক নিরবচ্ছিন্ন আখ্যান হিসেবেই গড়ে তোলা হয়। সভ্যতাকে ওজন করা হয় মিনার, গম্বুজ, ও স্তম্ভের গোনাগুনতিতে। অথচ সেই একই মানুষ চুরমারের ছবিতেও উল্লাস-স্নান করে, থেঁতলে দেওয়ার গল্পকেও চোলাইয়ের মতো গোপনে সেবন করে। ভেঙে-চুরে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে তার সত্তায় জেগে ওঠে এক নিষিদ্ধ হুল্লোড়, এক অনস্বীকার্য ধ্বংসরস। নির্মাণের দীর্ঘ, শ্রমসাপেক্ষ, ধৈর্য দাবি-করা প্রক্রিয়া তাকে যতটা না স্নায়বিক ভাবে আবিষ্ট করে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত ও অধিক তীব্রতায় গ্রাস করে ধ্বংসের তাৎক্ষণিক নাটকীয়তা। অবশ্য শর্ত একটাই— ধ্বংসটি নিজের নয়, ঘটতে হবে অন্যের জীবনে।
ভাঙন, পতন, রক্তপাত, অগ্নিদাহ, নিষ্পেষণ— এ সবও যে চিরকাল মানুষকে এক ধরনের মৌতাত জুগিয়েছে, তার ঐতিহাসিক নিদর্শন বিস্তর। ধ্বংসের নান্দনিকতা মানুষ যে বিস্ময়, তন্ময়তা এবং প্রায় লজ্জাহীন মুগ্ধতার সঙ্গে যুগে যুগে উপভোগ করেছে, নৃতত্ত্ব তার অসংখ্য প্রমাণে ভারাক্রান্ত। প্রাচীন রোমে কলোসিয়াম-এর পাথুরে অঙ্গনে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হতো গ্ল্যাডিয়েটরদের রক্তারক্তি দেখতে, মৃত্যু সেখানে ছিল জনতার মনোরঞ্জন। ফরাসি বিপ্লবের সময় প্যারিসে গিলোটিনের চার পাশেও ভিড় জমত প্রায় উৎসবের আমেজে, সপরিবারে মানুষ উপভোগ করেছে খসে পড়া মুণ্ডু, রাষ্ট্রীয় হত্যা সেখানে সামাজিক প্রদর্শনী। শুধু নিষ্ঠুরতা নয়, এই সব দৃশ্যে ছিল নিরাপদ দূরত্ব থেকে ভয়, করুণা, রোমাঞ্চ ও আতঙ্ক ভোগ করার অবারিত সুযোগ। নগরদাহ থেকে সাম্রাজ্যের পতনকে মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে আতঙ্কের পাশাপাশি এক ধরনের অনস্বীকার্য মুগ্ধতা নিয়েও। অ্যারিস্টটল তাঁর ‘ট্র্যাজেডি’ তত্ত্বে যে ‘ক্যাথারসিস’ বা আবেগ-পরিশোধনের কথা বলেছিলেন, তার এক অন্ধকার সামাজিক সংস্করণ ঠিক যেন এখানেই।
দর্শক নিজে বিপর্যয়ের শিকার নয়, কিন্তু বিপর্যয়ের দৃশ্য দেখে তার ভিতরে দলা পাকিয়ে থাকা ভয়, হিংসা, করুণা ও উত্তেজনার মিশ্রণ নিয়ন্ত্রিত পথে নিঃসরিত হয়। সে মৃত্যু দেখছে, কিন্তু নিরাপদ দর্শকাসন থেকে। সে রক্ত অনুভব করছে, নিজেকে অক্ষত রেখে। ফলে মৃত্যু বা ধ্বংস তার কাছে তখন আবেগ-নিঃসরণের এক অনুমোদিত সামাজিক আচার। সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘বিয়ন্ড দ্য প্লেজ়ার প্রিন্সিপল’-এ মানুষের এক অস্বস্তিকর প্রবণতার সন্ধান দেন। বলেন, মানুষ শুধুই জীবন, সৃজন ও সংরক্ষণের প্রতি আকৃষ্ট নয়, ভাঙন, ঝুঁকি, আগ্রাসন ও শূন্যতার প্রতিও রয়েছে তাদের প্রবল ঝোঁক। এই প্রবণতাকেই ‘থ্যানাটোস’ বা মৃত্যুতাড়না বলা হয়, যার বিপরীতে আছে ‘ইরোস’ বা জীবনতাড়না। ‘ইরোস’-এর কাজ সংযোগ ঘটানো, টিকিয়ে রাখা, সৃষ্টি করা, সেখানে ‘থ্যানাটোস’-এর ভূমিকা হলো বিচ্ছেদ ঘটানো, ক্ষয় ডেকে আনা, বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেওয়া। এই মৃত্যুতাড়না বহির্মুখী হলে, চেতনে বা অবচেতনে, মানুষ অন্যের পতন ও ধ্বংসেও উদ্বাহু নৃত্য করে। অপরের দুর্বিপাক তখন সহমর্মিতার বিষয় নয়, হয়ে ওঠে আমোদের উপকরণ।
প্রকাশ্য রক্তারক্তি, বা শিরশ্ছেদের প্রদর্শনী আজ আর অবশ্য সামাজিক বিনোদন নয়, কিন্তু মানুষের অবদমিত ধ্বংসপ্রীতি তার নিরাপদ নির্গমনের পথ খুঁজে নিয়েছে ঠিকই। ইউটিউব বা অন্যান্য দৃশ্যভিত্তিক সামাজিক মাধ্যম আজ এই বিচিত্র আসক্তির এক বৈধ ও ব্যাপক চারণক্ষেত্র। চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার ছবি থেকে মানুষ যে দায়মুক্ত সুখ আহরণ করে, তা সম্ভবত সেই মৃত্যুতাড়নারই এক গৃহপালিত সংস্করণ। সেখানে প্রতি দিন অগণিত মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ আটকে রাখে কাচের বোতল সজোরে আছড়ে চুরমার করাতে, ধারালো ব্লেড দিয়ে সাবান কুচি কুচি করে কাটা কিংবা থকথকে জেলির মতো আঠালো পদার্থকে চটকে বিকৃত করে দেওয়ার আপাত-নিরর্থক কাণ্ডকারখানায়। এই সব ভিডিয়ো স্নায়ুতে এক অদ্ভুত, সম্মোহনী পুলক এনে দেয়। আশ্চর্যের বিষয়, কোনও সুনির্দিষ্ট কাহিনি বা চরিত্রের উপস্থিতি ছাড়াই এ সব দৃশ্যাবলীতে ধরা পড়ে স্রেফ একটি বস্তুর সুষম অবয়ব থেকে বিশৃঙ্খল অবস্থায় ভেঙে পড়ার চাক্ষুষ রূপান্তর। স্বচক্ষে কিছুকে গুঁড়িয়ে বা তুবড়ে যেতে দেখার মধ্যে আসলে তো কাজ করে ক্ষমতার এক নগ্ন নন্দনতত্ত্ব। হাইড্রলিক প্রেস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল-রোলার কিংবা শ্রেডার-এর সামনে বস্তুটি প্রতিরোধশূন্য। তার আকৃতি, কার্যকারিতা, এমনকি তার স্বতন্ত্র পরিচয়ও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লোপাট। এই একতরফা আধিপত্যের রোয়াবই দর্শককে বুঁদ করে রাখে। দর্শক অবচেতনেই সেই অপ্রতিরোধ্য শক্তির সাথে একাত্ম বোধ করে। ধ্বংসের মুহূর্তে বস্তুটি যেহেতু যন্ত্রের স্বেচ্ছাধীন, তাই দর্শকের কাছে তা শুধুমাত্র দৃশ্যগত তৃপ্তির উৎস নয়, তা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য এবং রূপান্তরের এক তৃপ্তিদায়ক নাট্যরূপও।
কিন্তু এই তৃপ্তি কি সদাসর্বদাই শুধু জড় বস্তুর ভাঙনেই সীমাবদ্ধ? তা কি প্রায়শই প্রতিপক্ষের সর্বনাশ বা অন্যের বিপর্যয় উপভোগের দিকে বাঁক নেয় না? সামাজিক ঈর্ষা, শ্রেণিগত ক্ষোভ ও নৈতিক প্রতিশোধস্পৃহার মিশেলে অন্যের দুর্বিপাক আকছার পরিণতি পায় এক উপভোগ্য খোরাকে। বিরোধী শক্তি পরাভূত হলে, প্রতিদ্বন্দ্বী হোঁচট খেলে, বা অপছন্দের মানুষটি পতিত হলে মনের গভীরে যে চাপা আনন্দের ঢেউ ওঠে, তার একটি সুনির্দিষ্ট জার্মান নাম রয়েছে— ‘শ্যাডেনফ্রয়েড’। যার অর্থ ‘অন্যের সর্বনাশে আনন্দলাভ’, বাংলায় একে ‘পরপতন-সুখ’ বলা যেতে পারে। বহু ভাষায় এর একক প্রতিশব্দ না থাকলেও, অনুভূতিটি জনজীবন নির্বিশেষে সর্বজনীন।
এমনকি পাপুয়া নিউগিনির নিসান অ্যাটল দ্বীপের প্রান্তিক মেলানেশীয় সমাজেও এর দেখা মেলে— সেখানে এর নাম ‘বানবানাম’। এই আবেগ তাদের ক্ষেত্রে এতটাই তীব্র যে, পরাস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর মৃতদেহ কবর থেকে তুলে এনে উপহাস করাও প্রতীকী বিজয়ের এক সাংস্কৃতিক উদ্যাপন। মাত্রার হেরফের থাকলেও অন্যের পতন দেখার এই প্রবৃত্তি সর্বত্র বিরাজমান। আসলে অন্যের পতন নিজের অবস্থানকে আপাতদৃষ্টিতে শ্রেয় করে তোলে। ধনী সর্বস্বান্ত হলে, বা ক্ষমতাসীন পর্যদুস্ত হলে— দর্শকের ভিতরে তৈরি হয় এক ধরনের তুলনামূলক স্ফূর্তি। সেই দর্শক যেন নিজের কোনও অর্জন ছাড়াই অন্যের পতনের সিঁড়ি বেয়ে সাময়িক ভাবে একটু উচ্চাসনে উঠে বসল।
‘শ্যাডেনফ্রয়েড’ সর্বত্রই নিছক নিষ্ঠুরতা বা স্যাডিজ়ম-এর প্রতি আসক্তি নয় কিন্তু। অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে আছে সামাজিক সাম্যের আদিম আকাঙ্ক্ষা। মানুষ যখন দেখে কয়েক কোটির ল্যাম্বরগিনিকে ক্রাশার দিয়ে পিষে ধাতব জঞ্জালে পরিণত হতে, তখন তার মনে এক অভূতপূর্ব প্রশান্তি নেমে আসে। এই প্রশান্তি নিছক ঈর্ষার পরিতৃপ্তি নয়, একে বলা যায় ‘অস্তিত্বগত স্বস্তি’ বা ‘এক্সিস্টেনশিয়াল রিলিফ’। হোক তা স্রেফ লোহা পেষাইয়ের যন্ত্র। অবচেতনে সে বলে ওঠে: ‘দেখো, ক্ষমতাবানের বৈভবও নশ্বর!’ এই আশ্বাস সাধারণ মানুষকে জোগান দেয় এক অসীম অস্তিত্বগত পরিতৃপ্তির। পুঁজিবাদ সম্পদের চারপাশে যে অমরত্বের বিভ্রম বুনে রাখে, বিলাসবহুল বস্তুর দুরমুশ হওয়াটা সেই মোহকে চুরমার করে দেয়।
একই কারণে, যখন এক বিষণ্ন পপ তারকা তাঁর পেল্লায় বিলাসবহুল ম্যানসনে বসে নিজের একাকিত্ব ও মর্মান্তিক বিচ্ছেদের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে ঈর্ষার বদলে দানা বাঁধে এক ধরনের স্বস্তি। কারণ সেই মুহূর্তে সম্পদ ও সাফল্যের চকচকে মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে মানুষের অভিন্ন ভঙ্গুরতা। বোঝা যায়, অর্থের প্রাচুর্য মানসিক শূন্যতার বিরুদ্ধে কোনও নিশ্চয়তা নয়, আর প্রতিপত্তিও হৃদয়ভঙ্গের প্রতিষেধক নয়।
যে মানুষটি ঋণের কিস্তি, কর, অনিশ্চয়তা এবং দৈনন্দিন বঞ্চনার গ্যাঁড়াকলে ন্যুব্জ, সে অন্যের পতনে অনর্গল প্রতিশোধের আনন্দ খোঁজে না। কখনও কখনও সেখান থেকে কুড়িয়ে আনে মহাজাগতিক সাম্যের এক একটি ঝলক। বিলাসবহুল গাড়িটি যখন চূর্ণ হয়, কিংবা ক্ষমতাবানের দুর্ভেদ্য জীবনে যখন কোনও ফাটল দেখা দেয়, তখন তার মনে হয়— ধনী ও দরিদ্রের বিত্তগত ব্যবধান মুছে না গেলেও, নশ্বরতার ব্যবধান অন্তত ঘুচে গেল। কয়েক মুহূর্তের ধ্বংসলীলায় সে এমন এক সত্য প্রত্যক্ষ করে, যা বৈষম্যের সমস্ত প্রদর্শনকে অতিক্রম করে। অবচেতন তাকে আশ্বস্ত করে বলে, ক্ষয়ই পৃথিবীর একমাত্র অনিবার্য সাম্য, তার কাছে বৈভবের অহংকার এবং বঞ্চনার ক্ষত, উভয়ের গন্তব্য একই— বিলুপ্তি।
লেখক আবহাওয়াবিদ