অন্তরালে অভিমানী কেষ্ট: ভুলে গেল দল - 24 Ghanta Bangla News
Home

অন্তরালে অভিমানী কেষ্ট: ভুলে গেল দল

Spread the love

হেমাভ সেনগুপ্ত, বোলপুর

বোলপুরের নিচুপট্টির নীল রঙের বাড়িটার এক চিলতে বৈঠকখানায় এখন হাতে-গোনা চার জন পুলিশ। দু’জন মুখ গুঁজে খবরের কাগজে। দু’জন মোবাইলে। এটাই বীরভূমের একদা ডাকসাইটে তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল ওরফে কেষ্টর বসতবাড়ি। দরজার সামনে দাঁড়াতেই এক পুলিশকর্মী বলে উঠলেন, ‘দাদা বাড়িতে কারও সঙ্গে দেখা করেন না। যদি পার্টি অফিসে যান, ওখানে দেখা হবে।’ সাংবাদিক পরিচয় দিতেই মুচকি হেসে বললেন, ‘আগে লোকের ভিড়ে ব্যতিব্যস্ত থাকতাম। এখন আর কেউ আসে না।’

বাড়িটার উল্টো দিকের চায়ের দোকানেও এখন আর ভিড় হয় না। দোকানি বলছেন, ‘আগে চা দিয়ে উঠতে পারতাম না।’ নীলবাড়ির ৫০০ মিটারের মধ্যেই তৃণমূলের কোটি টাকার পার্টি অফিসটাও আজ খাঁ খাঁ করছে। যে ক’জন রয়েছেন, তাঁদের চোখ-মুখ জুড়ে বিষাদের ছবি। পার্টি অফিসের ভিতরে কালী মন্দিরের পুজোর সেই জৌলুস আর নেই।

খবর এসেছিল পার্টি অফিসে তিনি আসবেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষার শেষে নিচুপট্টির বাড়ি থেকে সাদা গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে দেহরক্ষীর কাঁধে ভর দিয়ে পার্টি অফিসে ঢুকে গেলেন কেষ্ট। সঙ্গে কোনও পারিষদ নেই। আগে ভিড় লেগে থাকত। এখন দেখা করার প্রত্যাশায় বসে হাতে-গোনা মাত্র কয়েক জন। নিজের চেয়ারে হেলান দেওয়া কেষ্টর সামনে ফোন বেজেই চলল। কখনও ফোন তুলে বললেন, ‘একটু সময় অপেক্ষা কর’, কখনও তাঁকে বলতে শোনা গেল, ‘স্থানীয়দের পাশে থাক।’ কখনও অভয়বাণী, ‘আমি তো মরি নাই।’

পাশ থেকে বিড়বিড় করছিলেন মুরারই ব্লকের তৃণমূল সভাপতি বিনয় ঘোষ ‘কোর কমিটির আর অস্তিত্ব নেই, আইপ্যাকের মাতব্বরিতে সব গেল।’ এক নেতার কথায়, ‘যাঁদের গলায় বিদ্রোহের সুর, দাদা তাঁদের একটাই কথা বলছেন, যখন দল ক্ষমতায় ছিল তখন বলনি কেন? এখন মিডিয়ার সামনে দলের সমালোচনা করে লাভকী?’ কেষ্ট নিজেও মিডিয়া থেকে বহু দূরে থাকছেন। মুখে যেন লিউকোপ্লাস্ট সাঁটিয়ে নিয়েছেন। শুধু ‘এই সময়’ কে একান্তে বললেন, ‘বিপদে পড়া কর্মীদের যতটা পারছি আইনি সহায়তা দিচ্ছি।

সবাই কে বলেছি চুপ থাকুন। ঝামেলায় জড়াবেন না।’ অবশ্য ভোট পরবর্তী হিংসায় অনুব্রত মণ্ডলের বিরুদ্ধেও সম্প্রতি শান্তিনিকেতন থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে। তা নিয়ে মুখ খুলতে চাননি তিনি। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী, বোলপুরের তৃণমূল বিধায়ক চন্দ্রনাথ সিনহার কথায়, ‘বোলপুরে থাকলে অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে আমিও পার্টি অফিসে যাচ্ছি। অনুব্রত-আমি দু’জনেই দলের কর্মী-নেতাদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। এখন চুপ থাকা ছাড়া উপায় নেই। আমরা কথা বললে কর্মীরা বিপদে পড়বে।’

কিন্তু বললে শুনছে কে? ঢিলে হয়ে গিয়েছে দলের নিয়ন্ত্রণ। একদা কেষ্ট-ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতা বিকাশ রায়চৌধুরী খোলামেলা বলছেন, ‘৪৫ বছর রাজনীতি করছি। এই অবস্থার জন্য দলই দায়ী। কোর কমিটি গড়েই সব চেয়ে ক্ষতি হয়েছে। আইপ্যাক টাকা নিয়ে প্রার্থী করে দলকে ডুবিয়েছে। অনুব্রত মণ্ডলকে এক ঘরে করা হয়েছে। বড় বড় লেকচার মারা নেতারা আজ ঘরে ঢুকে পড়েছে।’ কখনও অভিমান ফুটে উঠছে কেষ্টর গলাতেও ‘দল করতে জেল খাটলাম। পরে দল ভুলে গেল।’

কেমন ছিল কেষ্ট মণ্ডলের সাম্রাজ্য? লাল দুর্গ বীরভূম জেলা, দোর্দণ্ডপ্রতাপ অনুব্রতর হাত ধরে সবুজ গড়ে পরিণত হয়েছিল ২০১১-য়। তখন জেলার দিকে দিকে জোড়াফুল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহমিশ্রিত ‘প্রশ্রয়’ কেষ্টকে দিয়েছিল গগনচুম্বী ক্ষমতা। তিনিই হয়ে উঠেছিলেন জেলার ‘শেষ কথা’। জেলায় পুলিশ-প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তারাও তাঁর সামনে ছিলেন নিষ্প্রভ। কখনও ‘চড়াম-চড়াম’ ঢাক বাজিয়ে, কখনও ‘গুড়-বাতাসা’ অথবা ‘নকুলদানা’-র কথা বলে ত্রাসের যে আবহ তৈরি করা হয়েছিল, তার প্রতি আস্কারা ছিল নেতৃত্বের। বলা হতো, ‘আহা। বেচারার ব্রেনে ঠিক মতো অক্সিজেন যায় না।’ সেই ‘অক্সিজেন ডেফিশিয়েন্সি’-র যুক্তিকে খারিজ করে, ২০১৬-এ বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন তাঁকে নজরবন্দি করে রেখেছিল।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই প্রেক্ষাপট। এ বার ঘুরে গিয়েছে চাকা। গুড়-বাতাসা, নকুলদানা এখন বোতলবন্দি। ঢাকের আওয়াজও মিলিয়ে গিয়েছে বাতাসে। বোলপুর পুরসভা এলাকাতেই এ বার ১৬ হাজারের বেশি ভোটে লিড পেয়েছে বিজেপি। অনুব্রতর নিজের ওয়ার্ডেও বিজেপির লিড। এলাকা এখন কেষ্টর দাপটমুক্ত। কার্যত গৃহবন্দি বীরভূমের ডাকসাইটে নেতা।

বিজেপির সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডলের মন্তব্য, ‘যে বড় বড় লেকচার মেরেছেন, তারপরে আর কোন মুখে বাড়ি থেকে বেরোবেন। লোকে তো তাচ্ছিল্য করবে। তাই লজ্জায় বেরোচ্ছেন না।’

একটি টোটোর পিছনে ব্যানারে চোখ আটকাল। এআই দিয়ে তৈরি কেষ্ট-র ছবি একদিকের চুল ও গোঁফ কামানো। নীচে লেখা, ‘সাংবাদিকদের তুমি বলেছিলে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে, একদিকের মাথার চুল ও গোঁফ কামিয়ে দেবে। সাধারণ মানুষ অপেক্ষায় আছে।’ বোলপুর স্টেশন রোড দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেই টোটো। এমনকী কেষ্টর বাড়ির রাস্তাতেও ভাবা যায়।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *