ক্যানিংয়ে মাদক চক্র ভাঙতে গিয়ে আক্রান্ত পুলিশ
ক্যানিং: দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে ফের উত্তপ্ত পরিস্থিতি। (Canning)দুষ্কৃতী, মাদক পাচারকারী এবং অসামাজিক চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান চলাকালীন নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলার অভিযোগ ঘিরে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে একটি ভিডিও, যেখানে দেখা যাচ্ছে পুলিশের উপর হামলার পর বিশাল বাহিনী নিয়ে এলাকায় তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, সম্প্রতি ক্যানিংয়ের কয়েকটি এলাকায় অসামাজিক কার্যকলাপ, মাদক পাচার এবং অপরাধমূলক চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। সেই সময় কিছু দুষ্কৃতী নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় বলে অভিযোগ। ঘটনার পর অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে গোটা এলাকায় তল্লাশি শুরু করা হয়। বিভিন্ন বাড়ি, গলি এবং সন্দেহভাজন আস্তানায় তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
আরও দেখুনঃ সংবেদনশীল এলাকার ছবি পাক জঙ্গিদের! ৫ কিশোরের বিরুদ্ধে রিপোর্ট NIA র
এই ঘটনার মধ্যেই আরও একটি রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে এসেছে। গত ১৬ মে গভীর রাতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা উত্তম দাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি স্থানীয় এক বিধায়কের ভাই বলেই জানা গিয়েছে। অভিযোগ, এক বিজেপি কর্মীকে খুনের চেষ্টার ঘটনায় তাঁর নাম উঠে এসেছে। উত্তম দাসের গ্রেফতারের পর ক্যানিংয়ে তৃণমূল সমর্থকদের বিক্ষোভও দেখা যায়। রাতভর বিক্ষোভ ও উত্তেজনার কারণে এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ক্যানিং এখন শুধু রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়, অপরাধচক্র এবং মাদক কারবারের কারণেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে মানবপাচার, অবৈধ কারবার এবং দুষ্কৃতী চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা এবং কর্মসংস্থানের অভাবকে কাজে লাগিয়ে বহু অসামাজিক চক্র গ্রামীণ যুবকদের অপরাধের জগতে টেনে নিচ্ছে।
ক্যানিংয়ের সামাজিক বাস্তবতাও অত্যন্ত জটিল। একসময় এই এলাকা কলকাতায় সবচেয়ে বেশি গৃহকর্মী পাঠানোর জন্য পরিচিত ছিল। এখন পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। শুধু কলকাতা নয়, দেশের বিভিন্ন বড় শহরেও এখানকার বহু মহিলা ও তরুণী গৃহপরিচারিকার কাজে যাচ্ছেন। ক্যানিংয়ের পাশাপাশি বারুইপুর, সোনারপুর, ডায়মন্ড হারবার, গোসাবা, বাসন্তী, সন্দেশখালি, হাসনাবাদ, মিনাখাঁ, কালিয়াচক, ইসলামপুর-সহ রাজ্যের আরও বহু এলাকা থেকেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সমাজবিদদের মতে, এই সমস্ত অঞ্চলে দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব এবং সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে কাজের জন্য লোক পাঠায়। আর সেই সুযোগকেই কাজে লাগায় মানবপাচারকারী এবং অপরাধচক্র। ফলে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখলেই সমস্যার সমাধান হবে না, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
এদিকে ক্যানিংয়ে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনায় প্রশাসন কড়া অবস্থান নিয়েছে। পুলিশের দাবি, যারা হামলায় জড়িত ছিল তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে এবং মাদক পাচার ও অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানো হবে বলেও জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক সংঘর্ষ, অপরাধচক্র, মাদক কারবার এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে ক্যানিং এখন রাজ্যের অন্যতম উদ্বেগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং প্রশাসনের অভিযান কতটা সফল হয়, সেদিকেই এখন নজর সাধারণ মানুষের।
