পাশের হারে এগিয়ে, তবু ‘ভালো রেজ়াল্টে’ পিছিয়েই মেয়েরা
এই সময়: মেয়েরা এগিয়ে — ফল প্রকাশের সময়ে গত বেশ ক’বছর ধরেই এ কথা শোনা যাচ্ছে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের কর্তাদের গলায়। কিন্তু এই ‘আশার বাণী’র আড়ালে একটা প্রশ্ন থাকছে — রেজ়াল্টের গুণগত মানের নিরিখেও কি মেয়েরা এতটাই এগিয়ে?
২০২৬–এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পরীক্ষার্থী ও পাশের হারে ছেলেদের থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে মেয়েরা। সফলদের ৮৯.৭১ শতাংশ ছাত্র, ৯২.৭১ শতাংশ ছাত্রী। আড়াই লক্ষ ছাত্র ও ৩ লক্ষ ২০ হাজারের বেশি ছাত্রী এ বার পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু ভালো রেজ়াল্ট, গ্রেডের নিরিখে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা পিছিয়ে। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ৯০ শতাংশ ও তার বেশি পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্ররাই এগিয়ে। আবার, মেধাতালিকায় প্রথম দশ র্যাঙ্কে থাকা ৬৪ জন পড়ুয়ার মধ্যে মাত্র আটজন ছাত্রী। প্রথম তিনে কোনও কোনও মেয়ে নেই।
আগের সরকারের আমলে মেয়েদের স্কুলছুট বন্ধ করতে, তড়িঘড়ি বিয়ে রুখতে ‘কন্যাশ্রী’, ‘সবুজসাথী’র মতো নানা প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। তারপরেও কেন ভালো রেজ়াল্টে তারা পিছিয়ে? রাজ্যের বর্তমান নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের মতে, মেয়েদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে শুধু এ ধরনের প্রকল্প যথেষ্ট নয়। তাঁর কথায়, ‘বাল্যবিবাহ, বয়ঃসন্ধিতে গর্ভবতী হওয়া, নারী পাচারে পশ্চিমবঙ্গ এগিয়ে রয়েছে। মেয়েদের প্রকৃত অর্থে এগিয়ে আনতে স্কুলস্তর থেকেই তাদের মোটিভেট করা দরকার। ভালো পড়াশোনা করে কেরিয়ার গঠন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরির বার্তা দিতে হবে। অভিভাবকদেরও এই মোটিভেশন প্রয়োজন। তা হলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল মিলবে।’
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য তথা ইতিহাসবিদ সুরঞ্জন দাস করোনাকালের একটি গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, এ রাজ্যেও কন্যাসন্তানদের পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত করছে পরিবার। দেখা যায়, কোনও বাড়িতে ছেলে ও মেয়ে দু’জনেই একটি মোবাইল বা ডিভাইসে অনলাইন ক্লাস করলে ছেলেদেরই অগ্রাধিকার দিয়েছেন পরিজন! লকডাউনের সময়ে ছেলেদের নয়, বরং মেয়েদের অনেক বেশি করে ঘরোয়া কাজে লাগানো হয়েছে। ছাত্রীদের রেজ়াল্টের মান ছাত্রদের তুলনায় কম হওয়ার পিছনে এটাও বড় কারণ বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের অধ্যক্ষা শিউলি সরকার বলেন, ‘ছেলেরা পড়াশোনা করে ভালো চাকরি পেলে পরিবারের উন্নতি হবে। আর মেয়েদের তো বিয়ে হয়ে যাবে। এই মানসিকতা থেকে আজও অনেকে বেরোতে পারেননি।’ টাকি বয়েজ়ের অধ্যক্ষা স্বাগতা বসাকের সংযোজন, ‘এখন তো দু’ভাগে পরীক্ষা (সেমেস্টার) হচ্ছে। শর্ট কোয়েশ্চেনে ছেলে ও মেয়েরা ভালো করলেও বড় প্রশ্নের উত্তরে মেয়েরা একটু পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে। এর প্রধান কারণ পারিবারিক ও সামাজিক।’
হাওড়ার তারাসুন্দরী বালিকা বিদ্যাভবনের অধ্যক্ষা মোনালিসা মাইতি অবশ্য একটু অন্য কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘মেয়েদেরও একটু নিজেদের কথা ভাবতে হবে। সামগ্রিক ভাবে সমাজের মানসিকতার সমস্যা তো আছেই। কিন্তু অনেক সময়ে মনে হয়েছে, মেয়েরাও ধরে নিচ্ছে যে তাদের পক্ষে আর কিছু করা অসম্ভব। পড়াশোনার বদলে রিলেশনশিপ, সাজগোজে অনেক মেয়ে এত বেশি নজর দিচ্ছে বলেও সঙ্কট তৈরি হচ্ছে।’