জামুড়িয়ায় কয়লাখনিতে ভয়াবহ দুর্ঘটনা মৃত ১ শ্রমিক
পশ্চিম বর্ধমানের জামুড়িয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে ঘটে গেল এক ভয়াবহ খনি দুর্ঘটনা। (Parashia Colliery)ইসিএল-এর (ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড) কুনুস্তোরিয়া এরিয়ার অন্তর্গত পরাশিয়া কোলিয়ারিতে আচমকাই ঘটে যায় ‘এয়ার ব্লাস্ট’-এর মতো বিপজ্জনক …
পশ্চিম বর্ধমানের জামুড়িয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে ঘটে গেল এক ভয়াবহ খনি দুর্ঘটনা। (Parashia Colliery)ইসিএল-এর (ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড) কুনুস্তোরিয়া এরিয়ার অন্তর্গত পরাশিয়া কোলিয়ারিতে আচমকাই ঘটে যায় ‘এয়ার ব্লাস্ট’-এর মতো বিপজ্জনক ঘটনা। এই দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে এক খনিকর্মীর এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক। মুহূর্তের মধ্যে গোটা খনি এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আহতদের আর্তনাদ, শ্রমিকদের ছুটোছুটি এবং উদ্ধারকারীদের তৎপরতায় কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় কোলিয়ারি চত্বর।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন সকালে খনির ভূগর্ভস্থ ২৭ নম্বর সেকশনে শ্রমিকরা প্রতিদিনের মতো কাজ করছিলেন। সেই সময় আচমকাই খনির ছাদের একটি অংশ বা ‘কয়লার চাল’ ভেঙে পড়ে। অভিযোগ, সেই ভাঙনের ফলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা প্রবল বায়ুচাপ হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো গতিতে বাইরে বেরিয়ে আসে। খনি প্রযুক্তির ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় ‘এয়ার ব্লাস্ট’। মুহূর্তের মধ্যে সেই তীব্র বায়ুর ধাক্কায় সুড়ঙ্গের ভিতরে থাকা শ্রমিকরা ছিটকে পড়েন। অনেকে মাটিতে আছড়ে পড়েন, কেউবা খনির দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর জখম হন।
আরও দেখুনঃফের শহরে চলল বুলডোজার! মাটিতে মিশে গেল গড়িয়ার ক্লক টাওয়ার
দুর্ঘটনার পরপরই খনির ভিতরে চিৎকার ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সহকর্মীদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েন অন্য শ্রমিকরা। পরে ইসিএলের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের দ্রুত বাইরে নিয়ে আসে। গুরুতর আহতদের প্রথমে ইসিএলের বাঁশড়া রিজিওনাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে কয়েকজনকে কাল্লা সেন্ট্রাল হাসপাতালেও স্থানান্তরিত করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, কয়েকজন শ্রমিকের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।
এই ঘটনায় এক খনিকর্মীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। যদিও মৃতের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও প্রকাশ করা হয়নি। আহতদের সংখ্যা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, অন্তত ৪০ জন শ্রমিক কম-বেশি আহত হয়েছেন। তবে ইসিএল কর্তৃপক্ষ এখনও নির্দিষ্ট সংখ্যা জানায়নি।
দুর্ঘটনার পর খনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন শ্রমিকরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই খনির ভিতরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যা ছিল। বহুবার সতর্ক করা হলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। শ্রমিকদের দাবি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং নিরাপত্তা মান বজায় রাখা হলে হয়তো এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোলিয়ারির বাইরে বিক্ষোভও দেখান শ্রমিকরা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ বাহিনী। পাশাপাশি উদ্ধারকাজে নামে বিশেষজ্ঞ দল। খনির ভিতরে আর কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। ইসিএল-এর ইঞ্জিনিয়ার ও প্রযুক্তিবিদরাও দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান শুরু করেছেন। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ চাপের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণেই এই ‘এয়ার ব্লাস্ট’ ঘটে থাকতে পারে।
এই দুর্ঘটনা ফের একবার দেশের কয়লাখনি শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ খনিতে ‘এয়ার ব্লাস্ট’ অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং বিরল ঘটনা হলেও সঠিক পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সতর্কতা থাকলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে বাস্তবে বহু খনিতেই নিরাপত্তা মান নিয়ে অভিযোগ থেকে যায়। জামুড়িয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কে রয়েছেন শ্রমিক পরিবারগুলি। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনার পাশাপাশি মৃত শ্রমিকের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ও দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের দাবি উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহল থেকে।