সীমান্ত জুড়ে এভাবেই কি তৈরি হল ‘গেরুয়া প্রাচীর’?
কলকাতা: ১৯৯০-এর দশকে আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে যেমন ভাষাগত আদান-প্রদান এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল, ২০২৬-এর বাংলা সীমান্তে তার এক ভিন্ন রূপ দেখল রাজনৈতিক মহল। তবে এই প্রভাব সাংস্কৃতিক নয়, …
কলকাতা: ১৯৯০-এর দশকে আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে যেমন ভাষাগত আদান-প্রদান এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল, ২০২৬-এর বাংলা সীমান্তে তার এক ভিন্ন রূপ দেখল রাজনৈতিক মহল। তবে এই প্রভাব সাংস্কৃতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক। নির্বাচনের ফলাফল বলছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং কট্টরপন্থী জামায়াতে ইসলামীর উত্থান পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ভোটারদের মেরুকরণে অনুঘটকের কাজ করেছে। (Bangladesh Jamaat Impact West Bengal Election)
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে কট্টরপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী এক অভাবনীয় ফল করে। ওপার বাংলার অন্তত ১৭টি সীমান্ত সংলগ্ন আসনে জয়ী হয় তারা। আশ্চর্যজনকভাবে, ওপার বাংলার যে ১৭টি আসনে জামায়াত জয়ী হয়েছে, তার ঠিক বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিজেপি অন্তত ২৬টি আসনে জয়লাভ করেছে। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’ সংলগ্ন বাংলাদেশের রংপুর বিভাগে জামায়াতের জয় ভারতীয় ভোটারদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
অনুপ্রবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তা
নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি বারবার দাবি করেছে যে, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলে পশ্চিমবঙ্গের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে যাচ্ছে। শুক্রবার বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বাংলায় বিজেপির এই জয় কেবল সংগঠনের বিস্তার নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তার জয়।” অর্থাৎ, অনুপ্রবেশ ইস্যুতে ভোটারদের আশঙ্কার যে প্রতিফলন ব্যালটে ঘটবে, তা আগেই আঁচ করেছিল গেরুয়া শিবির।
সংখ্যালঘু নিপীড়নের আঁচ এপারে
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সে দেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ, মন্দির ভাঙচুর এবং গণপিটুনির মতো ঘটনার খবর এপারের মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে দীপু চন্দ্র দাসের মতো ব্যক্তিদের হত্যার ঘটনা জনমানসে গভীর ক্ষত তৈরি করে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী এই ইস্যুকে রাজপথে নিয়ে আসেন এবং বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশনের সামনে বিক্ষোভ থেকে শুরু করে পেট্রাপোল সীমান্তে প্রতিবাদ সভার মাধ্যমে হিন্দু ভোটারদের সংহতি নিশ্চিত করেন।
সীমান্ত জেলাগুলোতে বিজেপির দাপট
ভোটের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকা থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার পর্যন্ত সীমান্ত সংলগ্ন ৯টি জেলায় বিজেপির জয়ের ধারা অব্যাহত ছিল-
দক্ষিণবঙ্গ: বাগদা, বনগাঁ উত্তর এবং হিঙ্গলগঞ্জের মতো আসনে বিজেপির জয় বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চলে জামায়াতের জয়ের সরাসরি প্রতিক্রিয়া বলে মনে করা হচ্ছে।
মালদা ও দিনাজপুর: মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজ বাজার, বৈষ্ণবনগর বা বালুরঘাটের মতো আসনে বিজেপির জয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
উত্তরবঙ্গ ও ডুয়ার্স: কোচবিহারের শীতলকুচি, সিতাই এবং মেখলিগঞ্জের মতো এলাকাগুলো বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার বিপরীতে অবস্থিত, যেখানে জামায়াত ও তাদের সহযোগীরা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের মহম্মদ ইউনুস পরিচালিত অন্তর্বর্তী সরকার যখন সে দেশে জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, তখন থেকেই সীমান্ত এলাকায় নতুন করে উদ্বেগের মেঘ জমতে শুরু করেছিল। ওপার বাংলার অস্থিরতা এবং হিন্দু নির্যাতনের কাহিনিগুলো পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মধ্যে পরিচয় রক্ষার যে তাগিদ তৈরি করেছিল, তারই ফসল ঘরে তুলেছে বিজেপি। সীমান্তবর্তী এই ২৬টি আসনের ফলাফল আদতে দুই বাংলার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক জটিল আয়না।