শস্যগোলায় দুর্গ ভেঙে তছনছ, গেরুয়া ঝড়ে ১৬ থেকে তৃণমূল নামল ২-এ
১৬-০ থেকে ২-১৪। পূর্ব বর্ধমান জেলায় তৃণমূলের দুর্গ এ ভাবেই গুঁড়িয়ে গেল গেরুয়া ঝড়ে। রাজ্যের শস্যগোলা হিসেবে পরিচিত এই জেলায় ২০২১ সালে ১৬টি আসনেই জিতেছিল তৃণমূল। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের নিরিখেও ১৬টি আসনেই এগিয়ে ছিল ঘাসফুল শিবির। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোট জোড়াফুলের সাজানো বাগান তছনছ হলো পূর্ব বর্ধমানে। ১৬ আসনের মধ্যে কোনও মতে দু’টি আসন ধরে রাখতে সমর্থ হলো তৃণমূল শিবির। ২০১৬ সালেও এই জেলায় ১৪ আসনে জিতেছিল তৃণমূল।
এই জেলার খণ্ডঘোষ বিধানসভা কেন্দ্রে ২০২৬ সালে জিতেছেন তৃণমূল প্রার্থী নবীন চন্দ্র বাগ। ৮,২৮৪ ভোটে তিনি হারিয়েছেন বিজেপি প্রার্থী গৌতম ধারাকে। ২০২৬ এবং ২০২১ সালে জিতেছিলেন নবীন। ২০২১ সালে তাঁর জয়ের ব্যবধান ছিল ২০,৮৮৬। ব্যবধান কমলেও জয়ের হ্যাটট্রিক করেছেন এই তৃণমূল বিধায়ক।
বর্ধমান উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী নিশীথ কুমার মালিক নবম রাউন্ড গণনার শেষে ৭,০৭৯ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন বিজেপি প্রার্থী সঞ্জয় দাসের থেকে। ২০১৬ এবং ২০২১ সালেও এই কেন্দ্রে জিতেছিলেন নিশীথ।
বর্ধমান দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র ৩০,৪৭০ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক খোকন দাসকে। ২০১৬ এবং ২০২১ সালে এই কেন্দ্র ছিল তৃণমূলের দখলে। প্রসঙ্গত, বর্ধমান শহর এই বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত।
রায়না বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী সুভাষ পাত্র ৮৩৪ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী মন্দিরা দলুইকে। ২০২১ সালে ১৮ হাজারের বেশি ভোটে এই কেন্দ্র থেকে জিতেছিল তৃণমূল। ২০১৬ সালে মাত্র ৪৪৮ ভোটে এই কেন্দ্রে জিতেছিলেন তৎকালীন তৃণমূল প্রার্থী।
জামালপুর বিধানসভা কেন্দ্রেও বিজেপি প্রার্থী অরুণ হালদার ১১,১৭৮ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী ভূতনাথ মালিককে। ২০২১ সালে এই আসন সিপিআইএম-এর থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল তৃণমূল। এ বার তা হারাতে হলো পদ্মশিবিরের কাছে।
মন্তেশ্বর বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী সৈকত পাঁজা ১৪,৭৯৮ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী তথা রাজ্যের মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীকে। ২০২১ সালে এই আসনে ৩১,৮০৫ ভোটে জিতেছিলেন সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী।
কালনা বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী সিদ্ধার্থ মজুমদার ২৮,৬৩০ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী দেবপ্রসাদ বাগকে। ২০২১ সালে এই আসনে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার ভোটে জিতেছিলেন দেবপ্রসাদ। ২০১৬ সালে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল ২৫ হাজারের বেশি।
মেমারি বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী মানব গুহ ৭,১০৬ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী রাসবিহারী হালদারকে। ২০১৬ সাল থেকেই এই কেন্দ্র ছিল ঘাসফুল শিবিরের দখলে।
ভাতার বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি সৌমেন কার্ফা ৬,৫২৮ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী শান্তনু কোনারকে। ২০১৬ এবং ২০২১ সালে এই কেন্দ্রে বিপুল ভোটে জিতেছিলেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
পূর্বস্থলী দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী প্রাণকৃষ্ণ তপাদার ১৬,৬৬২ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী তথা প্রাণীসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী স্বপন দেবনাথকে। ২০১১ সাল থেকে এই কেন্দ্রে জিতে আসছেন স্বপন দেবনাথ। একাধিক বার রাজ্যের মন্ত্রীও হয়েছেন তিনি। কিন্তু ২০২৬ সালের গেরুয়াঝড়ে পর্যুদস্ত হতে হলো তাঁকে।
পূর্বস্থলী উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী গোপাল চট্টোপাধ্যায় ৩০,২২৬ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী বসুন্ধরা গোস্বামীকে। এই কেন্দ্রে বিদায়ী বিধায়ককে টিকিট দেয়নি তৃণমূল। ২০২১ সালে বামেদের থেকে এই আসন ছিনিয়ে নিয়েছিল তৃণমূল।
কাটোয়া বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী কৃষ্ণ ঘোষের কাছে ৩৫ হাজার ৬৬ ভোটে হেরেছেন তৃণমূল প্রার্থী রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। তিনি পূর্ব বর্ধমান জেলার তৃণমূল সভাপতি। ২০১৬ এবং ২০২১ সালে তৃণমূলের টিকিটে এই কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তার আগে চারবার এই কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের বিধায়ক ছিলেন তিনি। টানা ৬ বার জেতার পরে পদ্মবনে এসে থামল তাঁর জয়ের রথ।
কেতুগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী অনাদি ঘোষ ২৭,৬১০ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী শেখ শাহনওয়াজকে। ২০১১ সাল থেকে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের টিকিটে জিতেছেন শাহনাওয়াজ।
মঙ্গলকোট বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী শিশির ঘোষ ১২,৭২৩ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী অপূর্ব চৌধুরীকে। এই কেন্দ্রে ২০২১ সালে ২২ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছিলেন অপূর্ব।
আউসগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী কালিতা মাজি ১২,৫৩৫ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী শ্যামাপ্রসন্ন লোহারকে। ২০১৬ এবং ২০২১ সালে এই কেন্দ্রে জিতেছিলেন তৃণমূলের অভেদানন্দ থান্ডার। তাঁকে অবশ্য এ বছরে টিকিট দেয়নি ঘাসফুল শিবির।
গলসি বিধানসভা কেন্দ্রে বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী রাজু পাত্র ১০,৪৯৪ ভোটে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী অলোককুমার মাঝিকে। ২০১৬ সালে এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে জিতেছিলেন অলোককুমার মাঝি। ২০২১ সালে জিতেছিলেন নেপাল ঘড়ুই।
পূর্ব বর্ধমান বরাবরই বামদুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে। ২০১৬ সালে মাত্র ২টি আসনে জেতে বামেরা। সে বার ১৪টি আসন দখল করে তৃণমূল। ২০২১ সালে ১৬টি আসনই যায় তৃণমূলের দখলে। সেখানেই থাবা বসালো বিজেপি। এবারের বিধানসভা নির্বাচনের পরে শস্যগোলা ভরল পদ্মে।