Motorcycle Ride: মোটরসাইকেল ডায়েরিজ: পর্ব ৩৯–দারিংবাড়ি ট্যুরে গিয়ে লাভার্স পয়েন্ট দেখেননি? – Bengali News | How To Explore Odisha’s Kashmir Daringbadi By Bike Part Two
গত সপ্তাহে তো আপনারা জানতেই পেরেছেন বাইক রাইডিং-এর ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে, কীভাবে সামলাতে হয়। দারিংবাড়ি ঢোকার আগে আমরা একটি দুর্ঘটনার সম্মুখীন হই। তারপর হোটেলও কোনক্রমে পাওয়া গেল। তারপরই ঘটল প্রকৃতির আরেকটি ভয়ংকর পরিণতি। ঠিক সন্ধের সময় হোটেলে লাগেজপত্র রেখে বাইরে বেরিয়ে একটু আশপাশে ঘুরে দেখব, এমন সময় আমরা সবাই শুনতে পেলাম এক ভয়ংকর আওয়াজ। আশপাশের হোটেলের মানুষজনও বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। পরে পরিস্থিতি যাচাই করে যা বোঝা গেল, তা হল: এটি ছিল পাহাড় ফাটা বা ধ্বস নামার আওয়াজ। সাধারণ মানুষের মুখে পরে শুনতে পেলাম, এখানে প্রায়ই এই ধরনের আওয়াজ শোনা যায়। তাঁদের মতে, এখানকার পাহাড়-জঙ্গল, ভূ-প্রকৃতি এখনও নিজেকে গঠন করে চলেছে। তবে এই অবস্থায় আমাদের রাতটা একটু ভয়ই কাটল। সকালবেলা হোম-স্টের বারান্দা দিয়ে কাচ চুঁইয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করায় চারপাশের সবুজ পাহাড় দেখে সব ভয় আবারও দূরে সরে গেল। তাই আর সময় নষ্ট না-করে সকালের কাজকর্ম সেরে বেরিয়ে পড়লাম দারিংবাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াতে।

দারিংবাড়ি থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে আজকের দিনের প্রথম মন্তব্য স্থান মদিয়াবান্দা জলপ্রপাত। ঘন পাইন গাছে ঘেরা এই জলপ্রপাতটি মূল শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জলপ্রপাতের পুরোটা পথ বেয়ে নেমে যাচ্ছে সিঁড়ি। জায়গাটা বেশ সুন্দর। গভীর জঙ্গলের মাঝে এত বড় এবং সুন্দর জলপ্রপাত খুব কমই দেখা যায়। এখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে চলে আসুন এটি ঠিক পাশে অবস্থিত আরেকটি জলপ্রপাত যার নাম জরুণ্ড জলপ্রপাত। এটি আগেরটির থেকে ছোট হলেও এই জলপ্রপাত এর আসার আগে একটি ব্রিজ আছে, যা থেকে পুরো এলাকার ১৮০° ভিউ খুব সুন্দর দেখা যায়।
এই খবরটিও পড়ুন

দারিংবাড়ি ট্যুরে পাইন বন ও দুলুরি নদী একটি অপূর্ব সুন্দর জায়গা। এই জলপ্রপাত দেখে ফেরার সময় আমরা বনের কাছে থামলাম এবং অন্বেষণ করতে ভিতরে গেলাম। দুলুরি নদীর পথও বনের ভেতর দিয়ে। নদীর ধারটা ছিল বেশ মনোরম। এখানে প্রকৃতি যেন সব ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে। এখানে জঙ্গল যেমন ঘন তেমনি সুন্দর। এখানে আপনি স্নান না করে পারবেন না। আমাদের কাছে অতিরিক্ত জামা প্যান্ট না থাকার ফলে সেটি করা হয়নি। এই নদীর পাশে সেরকম টুরিস্ট স্পট না থাকার ফলে এই জায়গাটি অদ্ভুত সুন্দর। আমি বারবারই বলে থাকি কোন জায়গাকে ভালোভাবে দেখতে গেলে তার গভীরে ঢুকতেই হবে।

দারিংবাড়ি ট্যুরে কফি ও মশলার বাগান দেখতে যেন ভুলবেন না। দারিংবাড়ি যাওয়ার পথে আপনি অবশ্যই কফি এবং মশলার বাগান দেখতে পাবেন। এছাড়াও একটি বাগান আছে, যেখানে আপনি কফি এবং মশলা চাষ হচ্ছে্, এমন একটি বাগান পাবেন। আমরা মরিচ গাছ দেখেছি এবং বাগানের শীতল ছায়ায় কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরিও করেছি। এখানে পাবেন এমন একটি পাথর, যেটি রামের সেতু নির্মাণে কাজ হয়েছিল। মানে আপনি এখানে এমন একটি পাথর পাবেন, যেটি রীতিমতো জলে ভাসে।

ইমু পাখির খামার। ইমু খামারটি দারিংবাড়ি শহর থেকে বালিগুড়ার দিকে যাওয়ার পথে প্রায় 12 কিলোমিটার দূরে। একটি ছোট ঘেরা বাগান আছে, যেখানে কয়েকটি ইমু পাখি রাখা হয়েছিল। ইমু পাখি কীভাবে লালন-পালন করা হয় এবং তা ডিম থেকে কীভাবে বড় হয়, আপনি এখানে সেই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া দেখতে পাবেন। একটি নতুন পাখি দেখা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। ইমুর ডিমও এখানে বিক্রি করা হয়; এখানেই আপনি তা খেতেও পারবেন। রান্না-করা ডিমের দাম ৩০০ টাকা।

দারিংবাড়ি ট্যুরে লাভার্স পয়েন্টটি ইমু ফার্ম থেকে প্রায় ১ কিমি দূরে রয়েছে। লাভার্স পয়েন্টের রাস্তাটাও একটু রুক্ষ। তবে জায়গাটা খুবই সুন্দর। নদীটি প্রবাহিত হচ্ছে এবং আপনি কেবল বিশাল পাথরের উপর বসে কিছু শান্ত সময় উপভোগ করতে পারেন। এটি প্রকৃতির নীরবতা অনুভব করার জায়গা বা প্রকৃতির সঙ্গে নিজের প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে! তাই আপনার দারিংবাড়ি ট্যুরে এই জায়গাটি মিস করা উচিত নয়।

হিল ভিউ পার্ক, বাটারফ্লাই পার্ক এবং হিল টপ ভিউ পয়েন্ট—এই তিনটি স্থান একে-অপরের কাছাকাছি এবং লাভার্স পয়েন্ট থেকে দারিংবাড়ি ফেরার পথে পড়েছিলাম। বাটারফ্লাই পার্কটি হিল ভিউ পার্কের মধ্যে অবস্থিত এবং হিল টপ ভিউ পয়েন্টটি হিল ভিউ পার্কের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত। হিল ভিউ পার্কে একটি সুন্দর এবং সুন্দরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ-করা বাগান এবং ঔষধি গাছের বাগানও রয়েছে। হিল ভিউ পার্কের ভিতরে কুটিয়া কোন্ধ উপজাতির একটি প্রদর্শনী রয়েছে। বাটারফ্লাই গার্ডেন হিল ভিউ পার্কের ভিতরে একটি সুন্দর ফুলের বাগান।

হিল টপ ভিউ পয়েন্টে একটি শিশু পার্ক রয়েছে। সেখান থেকে দারিংবাড়ি এবং আশপাশের এলাকার মনোরম দৃশ্য দেখার জন্য এটি সেরা জায়গা। আমার মনে হয় জায়গাটা ভাল সূর্যোদয় দেখার জন্য, কারণ এটি পূর্ব দিকে দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড় দেখা যায়।

এছাড়াও আরেকটি পয়েন্ট আছে, যেটি সানসেট ভিউ পয়েন্ট অথবা সাইলেন্ট ভ্যালি নামে পরিচিত। এখান থেকে আপনি সূর্যাস্তের সুন্দর ভিউ পাবেন। এটি দারিংবাড়ি থেকে মাত্র দু’-কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এসব জায়গা আপনি দারিংবাড়িতে দু’দিন থেকেই ভালভাবে দেখতে পাবেন।

এবার বাড়ি ফেরার পালা, দারিংবাড়ি থেকে কলকাতার দূরত্ব ৮০০ কিলোমিটার। রাস্তাটি যেহেতু দেওঘর এবং সিমলিপাল ন্যাশনাল পার্কের পাশ দিয়ে গিয়েছে, তাই এই দুই জায়গা কভার করে আপনি বাড়ি ফিরতে পারেন। সিমলিপাল নিয়ে আগেও লেখা হয়েছে; তাই শুধুমাত্র দেওঘর নিয়ে একটি আলাদা পর্ব নিয়ে আসব। এই ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা বাইক নিয়ে একদিনে শেষ করা সম্ভব নয়। তাই মাঝে আপনার সুবিধামতো কোথাও এক রাত কাটিয়ে কলকাতা ফিরে আসুন। এই ৮০০ কিলোমিটার রাস্তাটি বাইক নিয়ে রাইড করার মজাই আলাদা, কারণ এখানে আপনি পাবেন কালাহান্ডি ফরেস্ট রেঞ্জ ও ফুলবনি রেঞ্জ। সঙ্গে সুবিশাল মহানদী; এছাড়াও আছে বামুর ফরেস্ট রেঞ্জ, বৈতরণী রিভার… আরও সুন্দর-সুন্দর জায়গা।