Nimisha Priya: ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়ার ফাঁসির সাজা স্থগিত, ২৪ ঘণ্টা আগে মিলল স্বস্তি – Bengali News | Execution of Indian Nurse Nimisha Priya postponed in Yemen before 24 hours
মাত্র ২৪ ঘণ্টা সময় ছিল হাতে। রাত পোহালেই মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত হওয়ার কথা ছিল ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়ার। অনেক চেষ্টা করেও আটকানো সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে ফিরল স্বস্তি। স্থগিত হয়ে গেল নিমিশার ফাঁসি। তবে এখনই তাঁকে ভারতে ফেরানো সম্ভব হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ছ’মাস আগেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনান হয়েছিল। রায় শুনিয়েছে ইয়েমেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, নিমিশা ভারতের মেয়ে। তাঁর পুরো নাম নিমিশা প্রিয়া। কেরলের পালক্কাড় জেলার বাসিন্দা তিনি। নার্সের কাজ নিয়ে ২০০৮ সালে ইয়েমেনে গিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গী হয়েছিলে স্বামী টমি টমাস ও মেয়েও। সেখানেই পাকাপাকি ভাবে ছিল তাদের বাস। কিন্তু পাকেচক্রে ২০১৪ সাল থেকেই শুরু হয় সমস্যা।
জানা যায়, নিজের ক্লিনিক খোলার ইচ্ছা ছিল নিমিশার। সেই সূত্রেই ওই বছর তালাল আব্দো মাহদি নামে এক ইয়েমেনি নাগরিকের সঙ্গে আলাপ হয় নিমিশার। মাহদিই তাঁকে নতুন ক্লিনিক খুলতে সাহায্য করবেন বলে আশ্বাসও দিয়েছিলেন। এককথায়, তার ব্যবসায়ীক পার্টনার হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরেই ২০১৫ সালে খোলা হয় ক্লিনিক। কিন্তু তালালকে ছাড়া কি ক্লিনিক খুলতে পারতেন না নিমিশা? কারণ যত সমস্যা তার পরই শুরু হয়।
ইয়েমেনের নিয়ম অনুযায়ী, দেশীয় কোনও অংশীদারি ছাড়া কোনও বিদেশি নাগরিক সেদেশে ব্যবসা শুরু করতে পারবে না। সেই কারণেই তালালকে নিজের ব্যবসায়ীক পার্টনার করেন নিমিশা। আর তারপরই শুরু হয় মতবিরোধ। বলে রাখা প্রয়োজন, এই সময়কালে ইয়েমেনে একাই ছিলেন নিমিশা। কোনও পারিবারিক কারণে তার স্বামী ও সন্তানকে ফিরে আসতে হয় ভারতে।
নিমিশার অভিযোগ, প্রথম দিকে ব্যবসা ভাল চললেও,পরে বিবাদ তৈরি হয়। তার টাকা, পাসপোর্ট কেড়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল মাহদি। এমনকি, তাকে মাদকসেবনেও বাধ্য করত সে। পাশাপাশি, ব্যবসার কাগজপত্র স্বাক্ষরের সময় অবৈধ ভাবে বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিমিশাকে নিজের স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে প্রশাসনিক সাহায্য পাওয়ার পথও বন্ধ করে দেয় ওই মাহদি। যার জেরে পুলিশে দ্বারস্থ হলেও কোনও সহযোগিতা পাননি নিমিশা। বাধ্য হয়েই তাকে থাকতে হয়েছে মাহদির সঙ্গে।
২০১৭ সাল ২৫ জুলাই। নিজের ক্ষোভ চেপে রাখতে পারে না নিমিশা। মাহদির হাত থেকে বাঁচতে মাহদিকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে নিজের পাসপোর্ট উদ্ধার করে সে। কিন্তু ওষুধের ওভারড়োজের কারণে মৃত্যু হয় মাহদির। তখন দেহ লোপাটে তা টুকরো টুকরো করে বাড়ির জল ট্যাঙ্কে ফেলে দেয় সে। কিন্তু হয় না শেষ রক্ষা। ইয়েমেন ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আগেই নিমিশাকে গ্রেফতার করে সেখানকার পুলিশ। পাঠানো হয় রাজধানী সানার কারাগারে। ২০১৮ সালে দোষী সাব্য়স্ত হন নিমিশা। ২০২০ সালে শোনানো হয় মৃত্যুদণ্ডের সাজা। ২০২৩ সালে সেই সাজা বহাল রাখে হুথিদের ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’।
এরপরই শুরু হয় নিমিশাকে বাঁচানোর লড়াই। নিমিশার প্রাণভিক্ষার আবেদন করে তার কেরলের পরিবার। গত ডিসেম্বরেও সেই আবেদন খারিজ করেছে ইয়েমেনের সুপ্রিম কোর্ট। আবেদন খারিজ করেছেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমিও। ওই দেশ থেকে কোনও উত্তর না মেলায় এরপর তারা সাহায্য চেয়ে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকে দ্বারস্থ হয়। ততক্ষণে ইয়েমেনের জেলের সাত বছর বন্দিদশা কাটিয়ে ফেলেছেন নিমিশা। অবশেষে আসরে নেমেছে ভারত সরকার। এদিকে নিমিশার মৃত্যুদণ্ড ১৬ই জুলাই কার্যকর হওয়ার কথা। ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে সময়। বাঁচার আশা হারিয়ে ফেলে নিমিশা ও তার পরিবার। ওই নার্সের মা প্রেমা কুমারী দিল্লির উদ্দেশে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, অনুরোধ করেছিলেন, যদি কোনও ভাবে তার মেয়েকে বাঁচানো সম্ভব হয়। পাল্টা নয়াদিল্লি জানায়, তারা সমস্ত ভাবে চেষ্টা করছে।
চেষ্টা এই শব্দটাই একটা আশা জিইয়ে রাখে মাসের পর মাস ধরে। কিন্তু সেই আশা কি কোনও কাজে এল? ইয়েমেনে ভারতের কোনও প্রতিনিধি নেই। একটা গোষ্ঠী সেখানে শরিয়ত আইনে সরকার চালাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ অবস্থাও ভাল নয়। সেই দেশের সঙ্গে সমঝোতা কীভাবে হবে?
দেখতে দেখতে দিন পেরিয়ে যায়। মাস পেরিয়ে যায়। সেই ‘চেষ্টা’ শব্দটা নিমিশার কাছে যেন ফিকে হয়ে আসে। দু’দিন আগে সুপ্রিম কোর্টেও এই নিয়ে সওয়াল জবাব হয়েছে। কেন্দ্রের কাছে পরিস্থিতি জানতে চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার বিচারপতি বিক্রম নাথ ও সন্দীপ মেহতার বেঞ্চে ছিল শুনানি। সেখানে নিমিশার প্রিয়ার মৃত্যুদণ্ড রুখতে বিশেষ কিছু করার নেই বলে জানিয়েছে ভারত সরকার। আদালতে উপস্থিত কেন্দ্রের অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামানি বলেন, ‘এটা দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু সরকারের আর কিছু করার নেই। ইয়েমেন কূটনৈতিক ভাবে ভারতকে স্বীকৃতি দেয়নি। সরকারি স্তরে আর কিছু করা সম্ভব নয়।’
কেন্দ্রকে ইয়েমেন নাকি স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা যা চাইছে, তা সম্ভব নয়। এই সময়ই শীর্ষ আদালতের শুনানিতে উঠে আসে ‘ব্লাড মানি’ প্রসঙ্গ। বলা হয়, একমাত্র এটাই নাকি নিমিশাকে রক্ষা করতে পারবে। শরিয়ত আইন অনুযায়ী, ব্লাড মানি বা রক্তের দাম হল এমন একটি শর্ত যা অভিযুক্ত ও নিহতের পরিবারের মধ্যে হয়ে থাকে। অভিযুক্তর পরিবার যদি নিহতের পরিবারকে যথার্থ টাকা প্রদান করে দেয় তা হলে সেক্ষেত্রে অভিযুক্তকে রেহাই দেওয়া হয়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, নিমিশার পরিবারের থেকে ‘রক্তের দাম’ হিসাবে প্রায় ৮ কোটি টাকা চেয়েছে ইয়েমেনি নিহতের পরিবার। কিন্তু এত পরিমাণ টাকা প্রদানের সামর্থ্য তাদের নেই। যার জেরে ক্ষীণ হয়ে আসে নিমিশার বাঁচার আশা। এরই মধ্যে আসরে নামেন সুন্নি সম্প্রদায়ের মুসলিম ধর্মগুরু কান্দাপুরম এপি আবুবকর মুসলিয়ার, এরপরই হঠাৎ স্থগিত হয়ে গেল ফাঁসি।