Explained: মেঘের আড়ালে হত্যা, সোনম-রাজার সানাইয়ের সুর কীভাবে সহসা বদলাল? - Bengali News | When love turns deadly meghalaya honeymoon murder analysis - 24 Ghanta Bangla News
Home

Explained: মেঘের আড়ালে হত্যা, সোনম-রাজার সানাইয়ের সুর কীভাবে সহসা বদলাল? – Bengali News | When love turns deadly meghalaya honeymoon murder analysis

Spread the love

শিলং: মেঘালয়ের আকাশে জড়ো হয়েছে রহস্যের মেঘ। আর সেই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ‘মেঘদূত’কে অবশেষে খুঁজে পেয়েছে প্রহরীরা। তারা খুঁজছে প্রতিটা খুঁটি, প্রতিটা তথ্য, যা জুড়ে দেবে মেঘালয় মধুচন্দ্রিমা হত্যাকাণ্ডের গোটা কাহিনি। মঙ্গলবার ‘মেঘদূত’ সোনমকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে শিলংয়ে। রবিবার মধ্যরাতে তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। আর তারপর থেকে বেরিয়ে আসছে মেঘালয় মধুচন্দ্রিমা-কাণ্ডে একের পর এক হাড়হিম করা তথ্য। ঘৃণা, বিশ্বাসঘাতকতার একটা নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী থাকছে প্রজন্ম।

যে ভাবে শুরু হল সবটা…

সোনম ইন্দোরের অভিজাত পরিবারের মেয়ে। বাবার সানামাইকার বিরাট ব্যবসা। একই ভাবে পারিবারিক ব্যবসা ছিল রাজা রঘুবংশীরও। তিনি থাকতেন ইন্দোরেই। গত ১১ মে দুই পরিবারের তরফে দেখাশোনা করে বিয়ে হয় সোনম-রাজার। বিবাহ অনুষ্ঠান ঘিরে আনন্দের সীমা ছিল না। ইতিমধ্য়েই সমাজমাধ্যমে বিয়ের দিনের একাধিক ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু সেই আনন্দধারা এখন ঢেকেছে শোকের ছায়ায়। বিয়ের ন’দিন পর ২০ তারিখ মধুচন্দ্রিমার জন্য মেঘালয় রওনা দেন সোনম-রাজা। এরপর ঠিক তিন দিনের মাথায় নিঁখোজ হয়ে যায় নব দম্পতি। সেই থেকে চড়তে শুরু করে পারদ।

মেঘালয়ের আকাশে বিশ্বাসঘাতকতার মেঘ

প্রথমে মধুচন্দ্রিমার জন্য কাশ্মীরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন রাজা রঘুবংশী। কিন্তু পহেলগাঁওয়ের ভয় তাঁদের যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। তাই পরবর্তীতে সোনমের সুপারিশে মেঘালয়কেই হানিমুন ডেস্টিনেশন হিসাবে বাছাই করেন তাঁরা। এরপর ২০ তারিখ সরাসরি পৌঁছে যান মেঘেদের দেশে। ২২ তারিখ তাঁরা যান ‘লিভিং রুট’ ট্রেকিংয়ে। সেই দিন ওখানেই রাত কাটান। এর পরদিন ২৩ তারিখ অর্থাৎ নিখোঁজ হওয়ার দিন সকালে উঠে তাঁরা আবার ভাড়া করা স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ঘুরতে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২৩ মে সকাল ৬টায় হোমস্টে ছাড়েন তাঁরা। বেরিয়ে পড়েন ঘুরতে। ঘর ছাড়ার সময় পরিবারের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল সোনম-রাজার। তারপর থেকে আর হদিশ মেলে না তাঁদের। পারদ চড়ে পরিবারের অন্দরে। বাড়ে উদ্বেগ। ২৪ তারিখ শিলং থানায় একটি নিখোঁজ মামলা দায়ের করে রাজের পরিবার। সেই ভিত্তিতে শুরু হয় সার্চ অপারেশন।

কেটে যায় একটার পর একটা দিন। খবরের শিরোনামে আসেন সোনম-রাজা। নিখোঁজ বলেই শুরু হয় প্রচার। এরপর ২ জুন। আরও জট পাকায় রহস্য। মেঘালয়ের ওয়ে সিটং জলপ্রপাতের সামনে মেলে রাজার পচন ধরা দেহ। গোটা দেহ, মুখে পচন ধরে যাওয়ার ফলে তাঁকে সনাক্ত করা সম্ভব হয় না। সেই সময় পথ দেখায়, তাঁর হাতে থাকা একটা ট্যাটু। যাতে লেখা রাজা। পরিবার নিশ্চিত হয়ে যায়। কিন্তু রাজার দেহ মিললেও, সোনম কোথায়? তাঁর খোঁজ তখনও পায়নি পুলিশ। বলে রাখা ভাল, রাজার দেহ উদ্ধারের পরেই ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় পুলিশ। সেই রিপোর্টে বেরিয়ে আসে যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথার পিছনে ও সামনে আঘাত করে হয়েছে।

মেঘালয়ের এক পুলিশ কর্তা জানিয়েছেন, রাজার মাথায় থাকা ধারালো অস্ত্রের ক্ষত দেখেই তাঁরা ঠাওর করতে পেরেছিলেন, কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। কারণ, যে ধরনের অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করা হয়েছে, তা মেঘালয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই আরও জোরকদমে শুরু হয় তদন্ত।

নব দম্পতির নিখোঁজ হওয়ার পর ১৬ দিনের বিভ্রান্ত কাটিয়ে অবশেষে মেলে সাফল্য। রবিবার মধ্যরাতে উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরের ধাবায় খোঁজ মেলে সোনমের। সেই ধাবার মালিকই তাকে দেখে চিনতে পারেন। তিনিই খবর দেন পুলিশকে। পাশাপাশি, সোনম নিজেই ধাবার মালিকের ফোন নিয়ে তাঁর বাড়িতে ফোন করেন। তখন সোনমের বাড়ির লোক আবার ফোন করে ইন্দোর থানায়। সেখান থেকে ফোন যায় উত্তর প্রদেশের গাজ়িপুর থানায়। তারপর সোনমকে থানায় নিয়ে যাওয়া হলেই আত্মসমর্পণ করেন তিনি। সবটা স্বীকার করেন পুলিশের কাছে।

কী স্বীকার করেন সোনম?

পুলিশের সন্দেহ ছিল, রাজ্যের বাইরের কোনও দুষ্কৃতী রাজাকে খুন করে সোনমকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছে। কারণ মেঘালয় পুলিশকে স্থানীয় এক ট্যুর গাইড জানিয়েছিলেন, ২৩ তারিখ সকালে রাজা-সোনমের সঙ্গে আরও তিন জন ছিল। যারা শুধুমাত্র সোনমের সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলছিল। তারা স্থানীয় কেউ নয়। এমনকি, যেখান থেকে রাজার দেহ উদ্ধার হয়, তারই অদূরে মেলে সোনমের বর্ষাতি।

কিন্তু রবিবার রাতে সোনমের মুখে স্বীকারোক্তি শোনার পর সব ধারণা ভেঙে যায় পুলিশের। যাকে অপহৃত ভাবছিল পুলিশ। সেই আসলে ‘খুনি’। পুলিশের কাছে সোনম স্বীকার করেন, স্বামী রাজাকে মারার পরিকল্পনা তাঁরই ছিল। কিন্তু কেন এরকম কাজ করেন তিনি? কারণ একটাই। তা হল প্রেমের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের সামনে ফিকে পড়ে গিয়েছিল তার বৈবাহিক সম্পর্কের। তবে যখন প্রেমই করছিলেন, তখন অন্য় কারওর সঙ্গে কেন বিয়ে করতে গেলেন তিনি? সেই নিয়ে এখনও কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।

অবশ্য উত্তর প্রদেশে ADG আইনশৃঙ্খলা জানিয়েছেন, আত্মসমর্পণ করেও তদন্তের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করেছেন সোনম। পুলিশকর্তার দাবি, সোনম নিজেকে পরিস্থিতির শিকার ও নির্দোষ হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘গাজিপুরে তাঁকে মাদক খাইয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল বলে বারবার আমাদের জানান সোনম। নিজেকে কার্যত পরিস্থিতির শিকার হিসাবেই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন সোনম। পুলিশ তার কাছে পৌঁছে যাবে জেনেও নিজের পরিবারকে ফোন করেছিলেন। আসলে সোনম ফাঁকি দেওয়ার পরিকল্পনা ভাল মতো কষতে পারেননি। ওর পুলিশি জেরা সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না। ভেবেছিলেন সহজেই আমাদের এড়িয়ে যাবে। কিন্তু পারেননি।’

বাবার অফিসের কর্মীর সঙ্গে মাখামাখি

মেঘালয় মধুচন্দ্রিমা-কাণ্ডের পরেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে বেশ কয়েকটি ভিডিয়ো। যার মধ্যে অন্যতম রাজা রঘুবংশীর শেষকৃত্যের ভিডিয়োটি। সেখানে দেখা গিয়েছে, সোনমের শোকাহত বাবাকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন এক যুবক। বয়স ওই ২০-২১। রাজা-খুনে পরবর্তীতে জড়িয়েছে তাঁর নামও। এই যুবক সোনমদের অফিসের কর্মী। নাম রাজ কুশওয়াহা। তাঁর সঙ্গে বেশ মাখামাখি ও ঘনিষ্ঠতা ছিল সোনমের। এমনকি, রাজের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে উদ্ধার হওয়া চ্যাটে পাওয়া গিয়েছে, সোনম তাঁকে বলছেন যে তিনি রাজার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কেও আগ্রহী নন।

পুলিশের দাবি, সোনম চেয়েছিলেন রাজের সঙ্গে বিয়ে করতে। কিন্তু সম্ভবত সামাজিক-শ্রেণিগত বিভেদ থাকার কারণেই তা আর হয়ে ওঠেনি। তাই বিয়ের পরদিন থেকে শুরু হয়ে গিয়েছিল মৃত্যু ফাঁদ তৈরির কাজ। পুলিশি জেরায় সোনম স্বীকার করেছেন, রাজাকে খুন করার গোটা পরিকল্পনাটাই ছিল রাজের। এমনকি, মেঘালয়কে বাছা হয়েছিল মধুচন্দ্রিমা নয়, বরং খুনের ডেস্টিনেশন হিসাবে। সূত্রের খবর, ২৩ মে যেদিন ব্যবসায়ী রাজা রঘুবংশীকে খুন করা হয়, সেদিন প্রথমে নির্জন এলাকায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁকে মারার জন্য গুয়াহাটি থেকে অনলাইনে আনানো হয়েছিল কুড়ুল। যার ক্ষত পরবর্তীতে ধরা পড়েছে ময়নাতদন্ত রিপোর্টেও। এমনকি ভাড়া করা হয়েছিল তিন সুপারি কিলার।

আসলে এই তিন ভাড়াটে খুনি পেশাদার নয়। রাজের বন্ধু। নাম, আনন্দ কুমরি, আকাশ রাজপুত ও ভিকি ঠাকুর। প্রত্যেকেই মধ্য়প্রদেশের বাসিন্দা। একমাত্র আনন্দ থাকতেন উত্তর প্রদেশে। মেঘালয়ে ঘুরতে যাওয়া সোনমকেও পাওয়া গিয়েছিল উত্তর প্রদেশ থেকে। পুলিশের সন্দেহ, মেঘালয় থেকে সরাসরি উত্তর প্রদেশে তিনি এসেছিলেন এই আনন্দের হাত ধরেই। ইতিমধ্য়েই এদের প্রত্যেককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

জানা গিয়েছে, খুনের ঘটনার দিন রাজাকে যখন তারা একটি নির্জন পাহাড়ের কোণে নিয়ে যায়, সেই সময় পাহাড়ে উঠতে গিয়ে প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল অভিযুক্ত রাজের বন্ধুরা। এমনকি, এক মুহূর্তের জন্য খুন করতেও অস্বীকার করে তারা। সেই সময় এগিয়ে আসে সোনম। বিধবা হলেই বিয়ে করতে পারবে বলে রাজকে উস্কানি দেয় সে। পাশাপাশি, রাজের বন্ধুদের দেয় ২০ লক্ষ টাকার টোপ। তৎক্ষণাৎই তাদের হাতে ১৫ হাজার টাকাও তুলে দেয় সে। যা পরবর্তীতে রাজ কুশওয়াহারা ধরা পড়তেই সেই টাকা বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ।

পরিবারের দাবি

সোনম যে এই রকম করতে পারে, তা এখনও মেনে নিতে পারছে না তাঁর পরিবার। সোমবার মেয়ে যখন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, সেই সময়ও তাঁর বাবার দাবি, ‘সোনম মিথ্যা কথা বলছে। ও খুন করতে পারে না। ও হয়তো খুব ভয় পেয়ে গিয়েছে। ও ভাল মেয়ে। ওকে খুনি সাজানো হচ্ছে। আমি সিবিআই তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’ একই দাবি সোনমের মায়েরও। তবে মেয়েকে নির্দোষ বলার পাশাপাশি, জামাইয়ের হত্যার তদন্তে পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।

অন্যদিকে, মৃত রাজার মা উমা রঘুবংশী বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে পছন্দ করে আনা পুত্রবধূই তাঁর কোল খালি করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ওর খুব ভাল ব্যবহার ছিল। বিয়ের পর রোজ জড়িয়ে ধরত আমায়, হেসে কথা বলত। হানিমুনে যাওয়ার যাবতীয় বুকিং সোনম করেছিল। কিন্তু ও রিটার্ন টিকিট কাটেনি। যদি সোনম খুনে জড়িত থাকে, তবে ওকে যেন ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়।’

কলকাতা হয়ে শিলংয়ের পথে সোনম

মঙ্গলবার তাঁকে উত্তরপ্রদেশ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে পটনায়। এবার সেখান থেকে সোনম আসবেন কলকাতায়। জানা গিয়েছে, কলকাতা বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হবে সোনমকে। তারপর সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে গুয়াহাটি। উত্তরপ্রদেশ থেকে সরাসরি কোনও বিমান না মেলায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেঘালয় পুলিশ। এরপর গুয়াহাটি থেকে সড়কপথ ধরে নিয়ে যাওয়া হবে শিলংয়ে মেঘালয় পুলিশের সদর দফতরে। শুরু হবে জেরার আরও এক ধাপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *