‘এপস্টেইন ফাইলস’ কী? কে কে জড়িয়ে বিশ্বের জঘন্যতম যৌন নির্যাতনে? – Bengali News | Trump vs musk explosive epstein files allegation sparks public feud
দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণ্য ও কুখ্যাত সেক্স স্ক্যান্ডেল ‘এপস্টেইন ফাইলস’ বিতর্ক আবার ফিরে এল মার্কিন মুলুকে। সৌজন্যে টেসলা কর্তা ইলন মাস্ক। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে স্পেস এক্স কর্তা অভিযোগ তোলেন, জেফ্রি এপস্টেইনের একাধিক নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও নামোল্লেখ রয়েছে। সেই কারণেই নাকি এই চূড়ান্ত গোপনীয় ফাইলের সব নথি এখনও প্রকাশ্যে আনেনি মার্কিন প্রশাসন। যদিও পরে সেই টুইট মুছে দেন তিনি। তবে নিঃসন্দেহে বড় অভিযোগ। কারণ, গতবছরের এই এপস্টেইন ফাইলস নিয়ে মার্কিন মুলুকে একসময় ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়। কী নিয়ে এত বিতর্ক? কী রয়েছে এপস্টেইন ফাইলসে? চলুন একবার ফিরে দেখা যাক ইতিহাসের কুখ্যাত এই ‘সেক্স স্ক্যান্ডেল’।
‘এপস্টেইন ফাইলস’ আসলে কোনও একটি ফাইলের নাম নয়। কয়েক হাজার পাতার নথি, প্রচুর ভিডিয়ো ও একগুচ্ছ তদন্তমূলক প্রতিবেদন, যেগুলি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্দি ২০২৪ থেকে প্রকাশ্যে আনতে শুরু করেন। জেফ্রি এপস্টেইন একজন মার্কিন ব্যবসায়ী, ধনকুবের। বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনকী প্রিন্স অ্যান্ড্রিউ-র মতো নামীদামি ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা। দিন-রাত এইসব বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের নানা পার্টিতে আমন্ত্রণ জানাতেন। সে সব নাকি আসলে অজুহাত মাত্র। আড়ালে চলত অন্য ‘খেলা’। নিজের ব্যক্তিগত দ্বীপে সমাজের বিশিষ্ট মানুষদের আমন্ত্রণ জানাতেন, তাঁদের সঙ্গে নাবালিকাদের জোর করে যৌন মিলনে বাধ্য করতেন ও সে সবের ভিডিয়ো শ্যুট করে রাখতেন। তাঁর বিলাসবহুল আবাসনগুলি নাকি গোপন ক্যামেরায় মোড়া ছিল। পরে সেই সব ভিডিয়ো দেখিয়ে বিশিষ্টদের ব্ল্যাকমেইল করতেন বলে অভিযোগ। নিউ ইয়র্ক, ফ্লোরিডা-সহ তাঁর বিভিন্ন বাড়িতে অন্তত ২৫০ জন নাবালিকাকে জোর করে যৌন দাসী করে রেখেছিলেন বলে অভিযোগ। চলত দেদার ফুর্তি। হত এমন সব কাণ্ডকারখানা, যা কোনও সভ্য সমাজে হতে পারে না। কিন্তু দিনের পর দিন এসব সহ্য করার পর একসময় তাঁর বিরুদ্ধে নির্যাতিতারা মুখ খুলতে শুরু করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার হতে হয় এপস্টেইনকে।
যদিও তাঁর বিরুদ্ধে মার্কিন মুলুকে বহু আগে থেকেই যৌন নির্যাতনের অভিযোগ। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের কর্তা, হলিউডের নায়ক, এমনকী ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে নিজের মেলামেশার প্রভাব খাটিয়ে নাকি সে সব অভিযোগ থেকে রেহাই পেয়ে যেতেন এপস্টেইন। ২০০৮-এ এক নাবালিকাকে দিয়ে জোর করে পতিতাবৃত্তি করানোর অভিযোগে প্রথমবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু মাত্র ১৩ মাস পরেই তিনি মুক্তি পেয়ে যান। সমাজের বিশিষ্টদের সঙ্গে তাঁর নৈশপার্টির ছবি নানা মার্কিন ম্যাগাজিনের প্রথম পাতায় ছাপা হত। ২০১৯-এ আবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্ত শুরু করে এফবিআই। কিন্তু বেশিদিন করা যায়নি। কারণ, জেলেই তাঁর রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়। সেটাও আগাগোড়া ধোঁয়াশায় মোড়া। নিন্দুকরা বলেন, অনেক প্রভাবশালীর কুকীর্তি জানতেন বলে নাকি জেলের ভিতরেই তাঁকে খুন করা হয়। যদিও মার্কিন প্রশাসন কখনই এই দাবির সত্যতা স্বীকার করেনি।
এপস্টেইনের কেচ্ছার কথা প্রথম জনসমক্ষে আনেন ভার্জিনিয়া জিওফ্রে নামের এক নির্যাতিতা। যিনি পরে মহিলাদের পাচারবিরোধী আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠেন। ২০০০ সালে এক ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্তা ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। তিনিই ভার্জিনিয়াকে এপস্টেইনের কাছে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যান। অভিযোগ, সেই থেকে দুজনে মিলে ভার্জিনিয়াকে যৌন হেনস্থা করতে শুরু করেন। ভার্জিনিয়াকে বাধ্য করা হত, সমাজের বিশিষ্টদের সঙ্গে রাত কাটাতে। এমনকী ভার্জিনিয়া অভিযোগ করেন, ব্রিটেনের প্রিন্স অ্যান্ড্রিউ পর্যন্ত তাঁর উপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছেন। তখন ভার্জিনিয়ার বয়স মাত্র ১৭। যদিও ব্রিটিশ রাজপরিবার এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ভার্জিনিয়ার এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই মার্কিন মুলুকে তোলপাড় পড়ে যায়। এক এক করে আরও নির্যাতিতা মুখ খুলতে শুরু করেন। ২০১৯-এ ফের গ্রেফতার হন এপস্টেইন। তখনই জেলের ভিতরে তাঁর মৃত্যু হয় রহস্যজনকভাবে।
২০২৪-এ মার্কিন আদালত ও এফবিআই এই মামলা সংক্রান্ত প্রায় ১০০০ পাতার নথি, কে কে এপস্টেইনের সঙ্গে জড়িত, কাদের সঙ্গে তিনি মেলামেশা করতেন এই সংক্রান্ত নথি জনসমক্ষে নিয়ে আসে। তাজ্জব ব্যাপার হল, মার্কিন আদালত ও গোয়েন্দা সংস্থা এই নথি প্রকাশ্যে আনলেও মার্কিন সরকার কিন্তু কখনই আনুষ্ঠানিকভাবে এই সব নথি প্রকাশ করেনি। আবার এটাও ঠিক যে এই নথিতে যাদের নাম রয়েছে, তাঁরাই যে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে নাবালিকাদের উপর যৌন নির্যাতন করতেন, সেটাও নয়। কিন্তু এবার টেসলা কর্তা ইলন মাস্ক যে অভিযোগ তুলে দিলেন তা নিঃসন্দেহে গুরুতর। একা ট্রাম্প তো নন, ট্রাম্পের পূর্বসূরি বিল ক্লিনটনের নামেরও উল্লেখ রয়েছে এপস্টেইনের ব্ল্যাক বুকে। কী এই ব্ল্যাক বুক? এপস্টেনের প্রাইভেট জেট, যার নাম ‘ললিতা এক্সপ্রেস’, সেই জেটে কে কে নিয়মিত চড়তেন তাঁদের নামের উল্লেখ রয়েছে ব্ল্যাক বুকে। যদিও, ট্রাম্প বা ক্লিনটন দুজনেই প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, তাঁরা নাকি এপস্টেইনের কুকীর্তির কথা জানতেন না। এপস্টেইনের বিমান তাঁরা ব্যবহার করেছেন পার্টিতে যোগ দেওয়ার জন্য। এপস্টেইন নাকি সুন্দরী মহিলাদের নিয়ে পার্টি দিতেন, যেটা দুই মার্কিন প্রেসিডেন্টেরই নাকি বিশেষ পছন্দ ছিল।
কেন এই ললিতা এক্সপ্রেসের প্রসঙ্গ এখানে গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ, এই ব্যক্তিগত বিমানে চাপিয়ে প্রভাবশালীদের নিজের ব্যক্তিগত পাম আইল্যান্ডের বিচ হাউসে নিয়ে যেতেন ধনকুবের এপস্টেইন। সেখানে নাকি আগে থেকেই নাবালিকাদের গলায় শিকল পরিয়ে রাখা হত। তাদের কুকুরের মতো চার হাতপায়ে হাঁটানো হত রিসর্টের ভিতরে। দিনরাত নেশার ইনজেকশন দিয়ে বেহুঁশ করে রাখা হত অন্তত ২৫০ জন নাবালিকাকে। যাতে তারা কোনও কূকর্মেই বাধা দিতে না পারে। আর সেটাই নাকি ‘আমোদ’ দিত প্রভাবশালীদের। মাইকেল জ্যাকসন, লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও, এমনকী স্টিফেন হকিংও নাকি তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপে প্রায়ই যেতেন। যদিও কেন যেতেন, তা কেউ-ই প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি। কিন্তু এপস্টেইনের লালসার শিকার ভার্জিনিয়া পুলিশের কাছে নিজের জবানবন্দীতে বলেছেন, ১৩-১৭ বছরের নাবালিকাদের চাকরি ও অর্থের লোভ দেখিয়ে ওই দ্বীপে নিয়ে যেতেন এপস্টেইন ও তাঁর বন্ধুরা। এক রাতের জন্য এপস্টেইনের বন্ধুদের মনোরঞ্জন করতে পারলে দামি উপহার, ব্যক্তিগত জেট, নতুন বাড়ি কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হত। জুলিয়েট ব্রান্ট নামে এক নির্যাতিতা জানিয়েছেন, সারাদিন তাঁকে ড্রাগের ইনজেকশন দিয়ে রাখা হত। উলঙ্গ করে গোটা ফার্ম হাউসে ঘোরানো হত। আরেক নির্যাতিতার বক্তব্য, দিনে অন্তত ৬ বার করে প্রতিদিন তাঁকে ধর্ষণ করতেন এপস্টেইনের প্রভাবশালী বন্ধুরা। কেউ কেউ এটাও বলেছেন, এপস্টেইনের সাম্রাজ্যে প্রভাবশালীরা যৌনদাসীদের বারবার যৌন সংসর্গে বাধ্য করত এক বিশেষ শক্তিশালী প্রজন্মের শিশুর জন্ম দেওয়ার চেষ্টায়। নির্যাতিতাদের কাছ থেকে মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পারেন, এপস্টেইন ও তাঁর প্রভাবশালী বন্ধুরা মিলে সেন্ট জেমস দ্বীপে ৭২ একর জমির উপরে অবস্থিত প্রাইভেট রিসর্টে রীতিমতো আন্তর্জাতিক স্তরে যৌনব্যবসা ফেঁদে বসেছিল। এখন অবশ্য সেই দ্বীপটি বিক্রি হয়ে গেছে। সেখানে এবছর রিসর্ট গড়ে ওঠার কথা।