যে মেয়ের নামে সকলে বেড়া দিতে চেয়েছেন - 24 Ghanta Bangla News
Home

যে মেয়ের নামে সকলে বেড়া দিতে চেয়েছেন

Spread the love

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে যখন রানির হাতে ক্ষমতা ‘ট্রান্সফর’ হলো, তারও বেশ কিছু দিন পরে, ১৮৭২-এ ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা প্রকাশের পর বঙ্কিমচন্দ্র ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ লিখতে বসলেন। কমলাকান্ত নামটিও বেশ, তবে এই কমলাকান্ত কালীসাধক ভট্টাচার্য নন। ইনি আফিমখোর কমলাকান্ত চক্রবর্তী। আফিমের মারণ ব্যবসায় ইংরেজরা সিদ্ধহস্ত। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘চীন কাঁদিয়া কহিল, “আমি অহিফেন খাইব না।” ইংরাজ বণিক কহিল, “সে কি হয়?” চীনের হাত দুটি বাঁধিয়া তাহার মুখের মধ্যে কামান দিয়া অহিফেন ঠাসিয়া দেওয়া হইল; দিয়া কহিল, “যে অহিফেন খাইলে তাহার দাম দাও।”’ বঙ্কিমের কমলাকান্ত অতি সরেস। আফিম খেয়েই সাহেবদের বিরোধিতা করেন। মাসকাবারের পে-বিলে সাহেব-বিরোধী কার্টুন আঁকেন। মাঝে মাঝে শেক্সপিয়রের পদ ‘কোট’ করেন। ফলে তাঁর চাকরি যায়।

আগের শতকে রামপ্রসাদ সেনের বিত্তশালী ঘোষাল তো সাহেব বেনিয়া নয়, গুণগ্রাহী মানুষ। রামপ্রসাদের পদে তিনি মজলেন। বুঝলেন এ চাকরির চাকর নয়, কবির আদর করা চাই। কালীসাধক কবির জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। সাধক কবি তাঁর পদে মনের কথা লেখেন, কালীকে ঘিরে তাঁর অভিজ্ঞতা-স্বপ্ন-কল্পনা পাক খায়। তিনি বেড়া বাঁধছেন। ছোট্ট একটি মেয়ে তাঁকে সাহায্য করছে। প্রসাদ আনমনে ভাবছেন, তাঁরই মেয়ে। পরে টের পেলেন, মা কালীই এসেছিলেন মেয়ে সেজে বেড়া দিতে। এ কি সত্য? এ কি গল্প? এ কি কল্পনা?

উনিশ শতকে দক্ষিণেশ্বরে আর একজন ছিলেন। রামকৃষ্ণদেব। তাঁর গুণগ্রাহী ভক্ত ‘বসুমতী’র উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁর সম্পাদনায় বঙ্গদেশের সাধারণ পাঠকদের জন্য প্রকাশ পেয়েছিল কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেনের গ্রন্থাবলি। নূতন কলিকাতা ইলেকট্রিক মেশিন যন্ত্রে ছাপা সে বইখানি বাঙালির ঘরে ঘরে সমাদৃত হোক, এ-ই ছিল উপেন্দ্রনাথের বাসনা। কালী নামের মেয়েটি রামপ্রসাদের বেড়া বাঁধায় হাত সত্যি দিয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন অবান্তর। রামপ্রসাদ তাকে দেখেছিলেন। রামপ্রসাদ গানে লিখেছিলেন, ‘কালী নামে দাও রে বেড়া/ ফসলে তছরূপ হবে না।’ অষ্টাদশ শতাব্দী তো বড় সুখের সময় নয়। কেন্দ্রীয় সুশাসনের অভাব। মানুষের জীবনে নিরাপত্তা নেই। জিনিসপত্রের দাম অনেক সময়ে তুঙ্গে। সুযোগ বুঝে বর্গীরা হামলা করছে। গঙ্গারাম লিখছেন, ‘কারু হাত কাটে কারু কাটে নাক কান।/ এ কি চোটে কারু বধএ পরাণ।।’ মানুষের জীবনের দাম তুচ্ছ। এই অসময়ে বেড়া না দিলে সবই যে তছরূপ হবে। যার নামে বেড়া দিচ্ছ, সে তো রণরঙ্গিনী। সেই রূপটি কেমন? ‘মরি ও রমণী কি রণ করে।/ রমণী সমর করে,/ ধরা কাঁপে পদ ভরে,/ রথ রথী সারথি তুরঙ্গ গরাসে’— এই রণমূর্তির শরণ নিলে বাঙালির আর ভয় নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *