‘বেয়াড়া ক্লাসরুম’! দর্শনার্থীদের দেখলেই গালিগালাজ-অট্টহাসি, ৫ তোতাকে আলাদা করল চিড়িয়াখানা
মানুষ দেখলেই দল বেঁধে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ। আর তার পরেই সকলে মিলে হো হো করে অট্টহাসি। খাঁচায় থাকা ৫টি আফ্রিকান তোতাপাখির এমন আচরণে অতিষ্ঠ ইংল্যান্ডের লিঙ্কনশায়ার ওয়াইল্ডলাইফ পার্ক কর্তৃপক্ষ। সেই কারণে বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের আলাদা করে দিলেন চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। ২০২০ সালে চিড়িয়াখানায় একসঙ্গে রাখা হয়েছিল এই পাঁচ তোতা পাখিকে। বিশ্বের অন্যতম বুদ্ধিমান পাখি হিসেবে পরিচিত আফ্রিকান গ্রে প্যারট কেবল মানুষের গলার নকলই করতে পারে না, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, গলার সুর এবং সামাজিক ইঙ্গিতও দারুণ বোঝে। কিন্তু সেই বুদ্ধিই কাল হলো চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের জন্য। শেষে দল ভেঙে তাদের আলাদা খাঁচায় পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।
এক খাঁচায় পাঁচ তোতা, টার্গেট দর্শনার্থীরাই
চিড়িয়াখানায় আসার পরে খুব কম সময়ের মধ্যেই পাখিদের অদ্ভুত এই কীর্তি লক্ষ্য করেন কর্মীরা। একজন শুরু করলেই মুহূর্তে বাকিরা যোগ দিত। মুহূর্তের মধ্যে পুরো খাঁচা ভরে উঠত অশ্রাব্য গালিগালাজ এবং জোরালো অট্টহাসিতে। কোনও পরিবার বা দর্শক খাঁচার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই তারা আসরে নামত। মানুষের চমকে যাওয়া বা অপ্রস্তুত হয়ে হেসে ফেলা যেন তাদের উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দিত। চিড়িয়াখানার কর্মীরা জানিয়েছেন, এক তোতা নিচু গলায় গালি দিলে আর একজন গলা চড়িয়ে সেটাই আওড়াত। আর দর্শকরা তাকানো মাত্রই সকলে মিলে এমন ভাবে হাসত, যেন নিখুঁত টাইমিংয়ে সেরা রসিকতাটি তারাই করেছে।
বেয়াড়া ক্লাসরুম ও গালিগালাজের প্রতিযোগিতা
পাখিদের মধ্যে রীতিমতো টেক্কা দেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। দর্শনার্থীদের বেশি চমকে দিতে একজন চেঁচিয়ে গালি দিলে, অন্যজন তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। আর বাকিরা তখন একসঙ্গে হেসে তাকে সমর্থন জানাত। চিড়িয়াখানার কর্মীরা এই দৃশ্যের তুলনা করেছেন ক্লাসরুমের দুষ্টু বাচ্চাদের সঙ্গে। এমনকী, দর্শনার্থীরা অস্বস্তিতে পড়ে পিছন ফিরলে পাখিরা আবার খিলখিলিয়ে হাসত, যেন পিছু হটা মানুষদের তারা ব্যঙ্গ করছে। তবে খাঁচার সামনে কেউ না থাকলে তারা চুপচাপ থাকত।
চিড়িয়াখানা বাঁচাতে কঠোর পদক্ষেপ
অনেক দর্শক তাতে মজা পেলেও, ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আসা পরিবারগুলোর জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি হয়ে উঠছিল। পাখিদের এই আচরণ কেবল অন্ধ অনুকরণ ছিল না। একে অন্যকে দেখে তারা বিষয়টি বেশ রপ্ত করেছিল। তাই কোনও শাস্তি নয়, বরং ‘খারাপ সঙ্গ’ বা কু-অভ্যাসের চক্র ভাঙতেই পাঁচ তোতাকে আলাদা খাঁচায় সরিয়ে দেওয়া হয়। কর্মীরা মজা করে তোতাপাখিদের খাঁচাটিকে চিড়িয়াখানার সবচেয়ে ‘অভদ্র ক্লাসরুম’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন।
বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ ও পরবর্তী পদক্ষেপ
খবরটি দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং তোতাগুলোকে নিয়ে অসংখ্য মিম তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ‘অ্যানিমাল কগনিশন’ জার্নালের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আফ্রিকান গ্রে তোতারা ১০০টিরও বেশি শব্দ শিখতে পারে। তারা শুধু মানুষের থেকেই নয়, সহপাঠী পাখিদের থেকেও দ্রুত শেখে। পরবর্তীকালে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এই পাঁচজনকে অন্য বড় পাখির দলের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। যাতে গালিগালা না জানা সাধারণ পাখিদের সান্নিধ্যে এসে তাদের এই কু-অভ্যাস ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। মানুষের মতোই পশু-পাখিদের জগতেও সঙ্গদোষ যে কতটা সত্যি, এই ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।