ভোটচুরি ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’, জ্ঞানেশ–হটাও ডাক রামলীলা থেকে
সুদেষ্ণা ঘোষাল, নয়াদিল্লি
ভোটচুরির অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে রামলীলায় বিরোধী সমাবেশের ডাক তো দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতে কি ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের সব নেতানেত্রীদের একজোট করা যাবে? রবিবার দুপুর পর্যন্ত ছিল অনিশ্চয়তার মেঘ। বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ বেলা একটার মধ্যেই রামলীলা ময়দান ভরিয়ে ফেললেও আড়াইটে পর্যন্ত ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের প্রধান মুখদের দেখা মেলেনি। অবশেষে একসঙ্গেই ময়দানে এলেন রাহুল গান্ধী, অখিলেশ যাদব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা। আর তার পর রামলীলার ময়দান থেকে জ্ঞানেশ–বিরোধী স্বর গর্জে উঠল। আক্রমণ থেকে ছাড় পেলেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ–ও। বিজেপির অবশ্য দাবি, এটা বিরোধী শিবিরের লোকদেখানো নাটক ছাড়া আর কিচ্ছু নয়! এই ভাবে রাহুল ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও তা পূরণ হবে না বলে কটাক্ষ করতেও ছাড়েনি শাহ।
এ দিন সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা গিয়েছে সনিয়া–পুত্র রাহুলকে। রামলীলা ময়দান থেকে রাহুলের তোপ, ‘যে ভাবে ভোট চুরি করেছেন জ্ঞানেশ কুমার, তা কোনও সাধারণ চুরি নয়, এটা বিরলের মধ্যে বিরলতম অপরাধ৷ জ্ঞানেশ কুমারের সাহায্য ছাড়া নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী বা অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতেই পারতেন না!’ তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, আইনি মানদণ্ডে ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ অপরাধের ক্ষেত্রে ভারতের মতো দেশে সর্বোচ্চ সাজা বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে৷ তবে কি পরোক্ষে ‘ভোটচুরি’তে অভিযুক্ত সিইসি জ্ঞানেশের জন্য সেই সাজাই দাবি করছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা? রাজনৈতিক মহলে উঠছে প্রশ্ন। রামলীলা ময়দানে দাঁড়িয়ে রাহুল সেই প্রশ্নের জবাব না দিলেও দাবি করেন, ‘১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪–এর নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে আমাদের ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। অথচ এর পরেই ওরা ১৫ শতাংশ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে! জ্ঞানেশ কুমার জেলে যাবেন। উনি রাতে ঘুমোতে পারছেন না, কারণ সবচেয়ে বড় অপরাধটি করেছেন। জনগণের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করেছেন, দেশকে শ্বাসরোধ করে মারার চেষ্টা করেছেন।’ রাগার সংযোজন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ—কেউই ঘুমোতে পারছেন না। অমিত শাহজি বলেছিলেন, নরেন্দ্র মোদী কোথাও যাবেন না। আদতে যদি মোদী যেতেও চান, আমরা তাঁকে যেতে দেব না। জ্ঞানেশ কুমারের পরে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হবে।’ রাহুলের এই আক্রমণের পাল্টা চুপ নেই বিজেপিও। এ দিন হরিয়ানার রোহতকে ‘লোকতন্ত্র বচাঁও, অরাজকতা হটাও’ পদযাত্রা থেকে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনের তোপ, ‘দেশের ১৪০ কোটি মানুষের উপরে কংগ্রেসের বিশ্বাস নেই? ৩ কোটি অনুপ্রবেশকারীদের ভোটের উপরে আপনারা নির্ভরশীল? সেই কারণেই গণতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করছেন?’ আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহের কটাক্ষ, ‘রাহুলজি, মক পার্লামেন্টে আপনি প্রধানমন্ত্রী হতেই পারেন, কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন আপনার পূর্ণ হবে না!’ প্রসঙ্গত, রবিবারই, ১ নভেম্বর শিখ দাঙ্গার বর্ষপূর্তি ছিল। একদিকে যখন রামলীলায় বিরোধী সমাবেশ চলছে, তখন রবিবার দিল্লির শিখ প্রধান এলাকা হরিনগর বাস ডিপো থেকে তিলকনগর মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করেছিল বিজেপি৷ ছিলেন ৮৪’র শিখ দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরাও৷ সেই মিছিল থেকে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর প্রশ্ন, ‘গোটা দেশ যে দিন শিখ দাঙ্গায় মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছে, কংগ্রেস এবং বিরোধী শিবির কেন সে দিনই রামলীলা ময়দানে সভার আয়োজন করল? শিখদের প্রতি এই ভাবে অসম্মান প্রদর্শনের অধিকার কংগ্রেসকে কে দিয়েছে?’ রবিবার চণ্ডীগড়ের একটি অনুষ্ঠান থেকে শাহও বলেন, ‘দিল্লিতে ১ নভেম্বর রাহুল গান্ধীর ‘জলসা’ শিখ-বিরোধী দাঙ্গার ক্ষতে নুনের ছিটে!’
তবে, বিরোধী আক্রমণে কান না দিয়ে এ দিন রামলীলার ময়দান থেকে রাহুলকে যোগ্য সঙ্গত করেছেন সমাজবাদী পার্টি (সপা)–র সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব। উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোট আসন্ন। তার আগে রামলীলার সমাবেশ থেকে সুকৌশলে নির্বাচনী প্রচারের কাজটাই সেরেছেন অখিলেশ। তাঁর কথায়, ‘অযোধ্যার রামমন্দিরের প্রণামী চুরি করেছে বিজেপি৷ ওদের সর্বনাশ হবেই৷ মনে রাখবেন, উত্তরপ্রদেশ দিয়েই দিল্লিতে ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি, এ বার উত্তরপ্রদেশ থেকেই বিদায় নেবে৷ রামলীলা ময়দান আজ ‘গণতন্ত্রের হলদিঘাটি’তে পরিণত হয়েছে, এখান থেকে পরিবর্তনের সূত্রপাত হবে।’ আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব আবার দাবি তোলেন, ‘দেশবাসীর সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা হওয়া উচিত৷ মোদীজি আদতে দশ নম্বরি প্রধানমন্ত্রী!’ রামলীলা সমাবেশ নজর কেড়েছেন বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও৷ সনিয়া গান্ধীকে নিজের ‘লিডার’ বলে বক্তব্য শুরু করে মমতা বলেন, ‘আমরা হারিনি, আমাদের হারানো হয়েছে। বাংলা ‘সার’-এর (ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন) সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। বিজেপি বাংলা লুট করেছে, ভোট লুট করে গণতন্ত্র হরণ করেছে। এদের ক্ষমতা থেকে সরাতেই হবে।’ জ্ঞানেশকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ কটাক্ষে বিঁধে মমতার ঘোষণা, ‘জীবন দিয়ে দেবো, কিন্তু ওদের ছাড়ব না।’ রবিবার রামলীলা ময়দানে উপস্থিত ছিলেন বাম সমর্থিত ছাত্র সংগঠন আইসার সভানেত্রী নেহা বোরাও৷ তবে, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এই সমাবেশকে সমর্থন জানালেও এ দিন তাদের কারও উপস্থিতি চোখে পড়েনি। রামলালীর সমাবেশে যোগ দেয়নি ডিএমকে, আম আদমি পার্টি (আপ), টিভিকের মতো বিরোধী দলগুলোও৷ ফলে, বিরোধী ঐক্যে কোথাও একটা বেসুর থেকেই গিয়েছে।
আর সেটাকেই হাতিয়ার করছে বিজেপি। বিজেপি সভাপতি নীতিনের তোপ, ‘যে দল নিজেদের ঘর ঠিক রাখতে পারে না, তারা আবার গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছে!’ রামলীলার সমাবেশে ১০ লাখ লোকের সমাগমের দাবি করেছিল কংগ্রেস৷ সেটাকে বিঁধে বিজেপির সম্বিত পাত্রের খোঁচা, ‘রামলীলা ময়দানের আয়তন ১০-১২ একর। তার ১৫ শতাংশ জুড়ে ছিল মঞ্চ, ৪০ শতাংশ এলাকা সম্পূর্ণ ফাঁকা!’ সম্বিতের আরও দাবি, রাহুলের কথা অনুযায়ী ২০২৪–এর লোকসভা নির্বাচন যদি অবৈধ হয়ে থাকে, একই যুক্তিতে বিরোধী দলনেতা হিসেবে তাঁর অবস্থানও অবৈধ।