এক ভোটে আমেরিকার কতখানি শুশ্রূষা সম্ভব - 24 Ghanta Bangla News
Home

এক ভোটে আমেরিকার কতখানি শুশ্রূষা সম্ভব

Spread the love

লিখছেন আবাহন দত্ত

ন যযৌ ন তস্থৌ। স্বদেশে মধ্যপর্বের নির্বাচনের আগে দোদুল্যমান অবস্থায় পড়ে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এগোতে পারছেন না, পারার কথাও নয়, গত এক শতকে মধ্যপর্বের নির্বাচনে ৯০% মার্কিন প্রেসিডেন্টই দলকে জিতিয়ে আনতে পারেননি। ১৯৪৬ থেকে ১৮বার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল পরাভূত হয়েছে। জিতেছে দু’বার— ১৯৯৮ সালে ডেমোক্র্যাট বিল ক্লিন্টন, আর ২০০২ সালে রিপাবলিকান জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে। ক্লিন্টনকে ইমপিচ করার ব্যর্থ চেষ্টার পর রিপাবলিকানদের ধুয়ে দিয়েছিল দেশবাসী, আর ৯/১১-র কালান্তক দুর্ঘটনায় ভর করে বুশের তরী পাল তুলেছিল। ট্রাম্পের তেমন কিছু নেই। গত মেয়াদে, ২০১৮ সালের মধ্যপর্বেও রিপাবলিকানরা হেরেছিল। কিন্তু, ট্রাম্প পিছোতেও পারছেন না। সে তাঁর ধাতে নেই। যিনি নিজেকে সেরার সেরা ভাবেন এবং প্রতিনিয়ত বুক বাজিয়ে বলেন, তাঁর নেতৃত্ব কি প্রশ্নার্হ হতে পারে?

কিন্তু, ট্রাম্পীয় কল্পজগৎ মেনে ভোট হয় না। যতই তিনি খুনের প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে ফেরার দৈবকাহিনি শোনান, প্রাচীন যুগের রাজারাজড়াদের নিজের তুলনা টেনে আনুন, নিজেকে দর কষাকষির বীরপুরুষ বলে গলা তুলুন, চিন্তাচর্চাকে হেয় করুন, নিজেকে নিষ্প্রশ্ন দেখান, তবু নির্বাচনী বাক্সে জনতা পাওনাগণ্ডা বুঝে নেয়। জনমত সমীক্ষা বলছে, খাদ্যপণ্য, আবাসন, জ্বালানি ও চিকিৎসার মূল্যবৃদ্ধিতে জনগণ জর্জরিত। ইরানের যুদ্ধ কাঠিন্য বাড়িয়েছে, প্রায় অভূতপূর্ব ভাবে অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে অনপনেয় ছাপ ফেলেছে প্রেসিডেন্টের বিদেশনীতি। কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধ মিটে যাবে, ট্রাম্প কথা দিয়েছিলেন। আট মাস পেরিয়ে গেছে, সুড়ঙ্গের শেষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অতএব ৫৭% ভোটার এই যুদ্ধকে ভ্রান্তি বলছেন, দুই-তৃতীয়াংশ দেশকে সে নাগপাশ থেকে মুক্ত দেখতে চাইছেন। গ্যাস-জ্বালানির মূল্য যে অন্যথায় নাগালে আসবে না, তাঁরাও জানেন। অভিবাসনের প্রশ্নটিও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পক্ষে আর সুখকর হচ্ছে না।

‘আইস’ (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) নামে যে বাহুবল সংস্থাকে আড়েবহরে বাড়িয়ে তিনি অভিবাসীদের মেপেজুপে রাখতে চেয়েছিলেন, তারা তাঁর মতোই নিয়মিত লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করে সাধারণ নাগরিকদের শিরঃপীড়ার কারণ হচ্ছে। অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধির আশায় ল্যাটিনো জনগোষ্ঠী দু’বছর আগে ট্রাম্পকে ঢেলে ভোট দিয়েছিল। ছেলেরা বেশি, মেয়েরা কম, তবু শ্রেণিস্বার্থে তাঁরা সমর্থন দিয়েছিলেন। আশা করেছিলেন, ট্রাম্প বৈদেশিক বাণিজ্যকে শিক্ষা দেবেন, আর তার সুফল ফলবে অভ্যন্তরীণ চাকরি-বাজারে। ভুলে গেছিলেন, অভিবাসনে ডাইনি খোঁজা শুরু হলে, বহু কাল ধরে মিশ্র পরিবারে ঘনসংবদ্ধ হয়ে বাস করা ল্যাটিনোরা আর নিরাপদ থাকবেন না, থাকতে পারেন না। তা হলে কি রিপাবলিকানরা হেরেই যাবে? সম্ভবত যাবে, অন্তত অক্টোবরের গোড়ার সমীক্ষায় ডেমোক্র্যাটরা ৮.২ পয়েন্ট এগিয়ে। রিপাবলিকানদের পক্ষে নিরাপদ প্রদেশগুলিতেও ট্রাম্প বাধ্যত প্রচারে গেছেন। তবুও নির্বাচনী হিসেব যে হেতু নিতান্ত পাটিগণিত নয়, তার যোগ-বিয়োগে রসায়ন থাকে, অতএব ২+২=৪ কখনও ৬-ও হয়ে যায়। প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় যোগাযোগ, দোদুল্যমান ভোটারদের প্রতি আবেদনের ক্ষমতা বা দূরদর্শনে বিজ্ঞাপনী মনমোহন অনেক সময়েই দলের জাতীয় ভাবমূর্তিকে ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে।

আর একটা রাজনৈতিক প্রশ্নও এর সঙ্গে অনিবার্য ভাবে জুড়ে গেছে— ট্রাম্পবাদ। ট্রাম্প রক্ষণশীল রিপাবলিকান পার্টিকে আরও দক্ষিণপানে ঠেলেছেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক যাবতীয় সমস্যার প্রত্যুত্তর দিয়েছেন জাতীয়তাবাদের শরণে। অভিবাসনে লাগাম পরানো, বাণিজ্যকে রক্ষা করা, অবশিষ্ট দু‌নিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিরোধিতা করা তার অভিজ্ঞান। প্রতিক্রিয়াও, অতএব, আরও বাঁ দিক ঘেঁষে উঠে আসছে। এক দশক আগেও যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীরা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রায় প্রান্তিক ছিলেন, তাঁরা আজ রীতিমতো স্বর খুঁজে পেয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের প্রচারের কেন্দ্রে তাই ডেটাসেন্টার আর এআই-সঞ্জাত সঙ্কট, শুল্ক ও বাণিজ্যে ট্রাম্পের নাজেহাল দশা, গর্ভপাতের অধিকার, ভোটদানের অধিকার এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ। ডেমোক্র্যাটদের বহু প্রাইমারিতে গণতা‌ন্ত্রিক সমাজতন্ত্রীরা জিতে প্রার্থী হয়েছেন। ‘রয়টার্স’-এর তথ্য বলছে, রাজনৈতিক মেরুকরণে ৪০-৫০টা আসন দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখবে। মধ্যপর্বের নির্বাচন আসলে প্রেসিডেন্টের পক্ষে এক দুর্ভেদ্য প্রহেলিকা। দল হারলেও ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকবেন, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জমি বন্ধুর হয়ে উঠবে। প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মধ্যপর্বে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচন বস্তুত তাঁর কর্মকাণ্ডের উপর গণরায়। ট্রাম্প স্বভাবোচিত ভাবে নিজের কোলে ঝোল টানতে গিয়ে তাকে আরও কড়া করে তুলেছেন: ‘ধরে নিন আমিই ব্যালটে আছি।’ ডেমোক্র্যাটরাও যথারীতি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে রণাঙ্গনে নেমেছে। আর ট্রাম্প-বিরোধী স্বাভাবিক জাড্যে নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস তো বটেই, উচ্চকক্ষ সেনেট দখ‌লেরও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে বিরোধীরা। স্বপদে বহাল থাকার সুস্থ ভাবনাকে অহমিকাগ্রস্ত হয়ে মর্যাদারক্ষার লড়াইয়ে উন্নীত (না কি পর্যবসিত?) না করলে হয়তো স্বখাত সলিলে এ ভাবে সমাহিত হওয়ার আশঙ্কা ট্রাম্পের তৈরি হতো না। তাঁকে তাই চক্রান্ত-তত্ত্বে ফিরতে হচ্ছে। ভোটার নথিভুক্তি থেকে জয়ের শংসাপত্রের মতো নিয়মমাফিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তিনি সংশয়ের জাল বিছিয়েছেন। নির্বাচনী অধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন, হেরে গেলে হয়তো সদলবলে ফলকে আইনি প্রশ্নের মুখে তুলবেন তিনি, ক্ষমতার হস্তান্তর মসৃণ না-ও হতে পারে। ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল দাঙ্গায় ঘরপোড়া যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্পের পরাজয়ের সিঁদুরের মেঘে ডরায়।

প্রশ্ন হলো, যা ভাবা হচ্ছে, তা-ই যদি হয়? অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটেরা পুরোপুরি জয় হাসিল করে নেয়? ট্রাম্প তা হলে আর ঘরোয়া নীতি নিয়ে বেশি পা ফেলতে পারবেন না, পড়ে থাকবেন ‘খোঁড়া হাঁস’ হয়ে— ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্ট। সম্ভবত তাঁর প্রশাসন তদন্তের মুখে পড়বে, নথি ও সাক্ষ্য দাবি করা হবে, প্রবীণ আধিকারিকেরা কংগ্রেসের (সংসদ) যাচাইয়ের সামনেও আসবেন, আর ডেমোক্র্যাট সমর্থকেরা নির্ঘাত ট্রাম্পকে আর একবার ইমপিচ করার দাবি জানাবেন। তদুপরি, ট্রাম্পের একাধিক নিয়োগ হয় আটকে যাবে, নয়তো বিলম্বিত হবে। তবে হোয়াইট হাউসকে যখন আইন পাশ করাতে কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে দর কষাকষি করতে হবে, তখন ট্রাম্প কী করবেন, তা-ই লক্ষণীয়। শেষ প্রশ্ন তাই জরুরিতম। ৩ নভেম্বর মিডটার্ম ইলেকশনের গতিপ্রকৃতি বুঝতে কোন দিকে নজর রাখতে হবে? হাউসের সব (৪৩৫) আসন, সেনেটের ৩৫ আসন, ৩৯টি প্রদেশের গভর্নরশিপ ও প্রাদেশিক আইনসভাগুলির কয়েক সহস্র আসন দ্বন্দ্বক্ষেত্র হলেও সর্বত্র মন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মিশিগান থেকে সেনেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ডাক্তার আবদুল এল-সায়েদ সম্ভবত নাম-ভূমিকার কারণে সর্বাধিক আলোচিত। বর্তমান সেনেটর গ্যারি পিটার্স যখন পুনঃমনোনয়নের সিদ্ধান্ত নিলেন না, তখন তাঁর আসনে লড়তে এলেন এল-সায়েদ। তিনি পুঁজিবাদে আস্থাবান, অপর পক্ষে প্রগতিশীল, জিতলে তিনি প্রথম মুসলমান হিসেবে সেনেটে প্রবেশ করবেন। ট্রাম্প স্বভাবত তাঁর উপর প্রসন্ন নন। তাঁকে ঘিরে আকছার কুবচনের মণিমুক্তো ছড়িয়েই চলেছেন। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সেনেটর জন অসফ প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে থাকলেও রিপাবলিকান মাইক কলিন্সও ফেলনা নন। মেইনে দু’বছর আগে কমলা হ্যারিস জেতেন।

রিপাবলিকান সেনেটর সুজ়ান কলিন্স এ বার ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসনের বিরুদ্ধে আসন ধরে রাখতে পারেন কি না, তা দেখার। ওহায়োতে রিপাবলিকান জন হাস্টেডের বিরুদ্ধে লড়ে সেনেটে ফিরতে চাইছেন ডেমোক্র্যাট শেরড ব্রাউন। তবে, টেক্সাসের মতো মশলাদার নির্বাচন কমই হচ্ছে। প্রদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল তথা দুর্নীতিবিদ্ধ কেন প্যাক্সটনকে জেতাতে ২১০ মিলিয়ন ডলার খসিয়ে ফেলেছে রিপাবলিকানেরা। কারণ ১৯৯৪ সালের পর ডেমোক্র্যাটরা কখনও পুরো টেক্সাস জেতেনি, ট্রাম্প গতবার প্রায় ১৪ পয়েন্টে জেতেন। তবে অ্যালাস্কা, ক্যানসাস, আয়ওয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা আর নিউ হ্যাম্পশায়ারের জয়ী-বিজয়ীর উপর চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে। জনমত সমীক্ষা ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকে, কেননা মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা আর ক্যানসাসে তারা এগিয়ে, আলাস্কা আর ওহায়োতে যা খুশি হতে পারে। অপর পক্ষে নিউ ইয়র্ক, টেক্সাস আর আয়ওয়ায় আসন রক্ষা করতে ঘাম ঝরছে রিপাবলিকানদের।

সমস্যা আসলে ট্রাম্পই বাঁধিয়েছেন। প্রথম বিজয় বক্তৃতায় বারাক ওবামা বলেছিলেন, ‘যুবক ও বৃদ্ধ, ধনী ও দরিদ্র, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান, কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, হিস্পানিক, নেটিভ আমেরিকান, সমকামী, বিষমকামী, প্রতিবন্ধী, যাঁরা প্রতিবন্ধী নন— এই মার্কিন দেশীয়রা পৃথিবীর কাছে সংবাদ দিলেন যে, আমরা কখনওই কিছু ব্যক্তির সমষ্টি নই, লাল প্রদেশ ও নীল প্রদেশের সমষ্টিও নই। আমরা সর্বদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।’ কিন্তু ট্রাম্প যে ভাবে ‘ক্রুকেড হিলারি/জো’, ‘কমরেড কমলা’, ‘ভার্মিন’ ইত্যাদি বলে অপর পক্ষকে নিরন্তর কটুকাটব্য করেন, তাতে লালে-নীলে মিলেমিশে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাবনাটি আর বেঁচে নেই, তার স্মরণলেখ ট্রাম্পের শপথগ্রহণের ক্ষণেই রচিত হয়ে গেছে। সেবার সময় ট্রাম্পের সঙ্গে ছিল। তিনি চুটিয়ে ক্ষমতা উপভোগ করেছেন। এ বার বাণ ঘুরে গেলে তিনিই যদি বধ হয়ে যান, তা হলে সান্ত্বনা দেওয়ার মতোও ক’জন বাকি থাকবে, সেটুকুও নজর করার। শুধু যে হতভাগ্য আমেরিকা মেরুকরণে বিষিয়ে গেল, তার শুশ্রূষা যে দূর অস্ত্, সেটুকু নিঃসংশয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *