১৬ বছরেই সুপার-এজড হবে ভারত, মুডিজ়ের রিপোর্টে বড় সতর্কবার্তা
কলকাতা: ভারতের জনসংখ্যার বয়সের কাঠামোয় দ্রুত পরিবর্তন আসছে। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশ হিসেবে পরিচিত ভারত দ্রুত বয়স্ক (India Super Aged Society) সমাজের দিকে এগিয়ে যাবে। মুডিজ় রেটিংসের সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জনসংখ্যা সংক্রান্ত রিপোর্টে এমনই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
রেটিং এজেন্সির হিসাব অনুযায়ী, ভারত মাত্র ১৬ বছরের মধ্যে ‘এজড’ থেকে ‘সুপার-এজড’ সমাজে পরিণত হতে পারে। একই পরিবর্তনে আমেরিকার সময় লাগবে প্রায় ১৯ বছর এবং ইন্দোনেশিয়ার লাগবে প্রায় ২৯ বছর।
কীভাবে নির্ধারিত হয় ‘এজড’ ও ‘সুপার-এজড’ সমাজ?
মুডিজ় রেটিংসের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনও দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের অংশ ৭ শতাংশ হলে সেই সমাজকে ‘এজিং’ বলা হয়। এই অনুপাত ১৪ শতাংশে পৌঁছলে সেটি ‘এজড’ সমাজ এবং ২১ শতাংশে পৌঁছলে ‘সুপার-এজড’ সমাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারত প্রায় ২০২৪ সালেই ‘এজিং’ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মুডিজ়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশটি প্রায় ২০৪৯ সালে ‘এজড’ এবং প্রায় ২০৬৫ সালে ‘সুপার-এজড’ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ, একটি পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে যাওয়ার সময় ক্রমশ কমে আসছে। একসময় যে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন কয়েক প্রজন্ম ধরে ধীরে ধীরে ঘটত, ভারতে সেটি কয়েক দশকের মধ্যেই সম্পন্ন হতে পারে।
আমেরিকা ও ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় ভারতের পরিবর্তন দ্রুত
মুডিজ়ের হিসাব অনুযায়ী, আমেরিকা প্রায় ২০৩৩-৩৪ সালের মধ্যে ‘সুপার-এজড’ সমাজে পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে সময় লাগবে আরও বেশি। দেশটি আনুমানিক ২০৭৭-৭৮ সালের দিকে এই পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। এই তুলনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, উদীয়মান অর্থনীতিগুলির মধ্যে ভারতের জনসংখ্যার বয়সের পরিবর্তন তুলনামূলক দ্রুত হচ্ছে।
কম আয়ের স্তরেই বার্ধক্যের চাপ
মুডিজ় রেটিংসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা উদীয়মান অর্থনীতিগুলিকে এমন সময়ে বার্ধক্যের আর্থিক চাপ সামলাতে হবে, যখন তাদের মাথাপিছু আয় এখনও উন্নত দেশগুলির তুলনায় অনেক কম। বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেনশন, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার খরচ বাড়তে পারে। একইসঙ্গে কর্মক্ষম জনসংখ্যার বৃদ্ধিও ধীর হয়ে যেতে পারে। এর ফলে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতের জন্মহার ইতিমধ্যেই রিপ্লেসমেন্ট রেটের নিচে
মুডিজ় জানিয়েছে, ভারতের ফার্টিলিটি রেট বা প্রজনন হার ইতিমধ্যেই ২.১-এর রিপ্লেসমেন্ট রেটের নিচে নেমে গিয়েছে। এর অর্থ হল, দীর্ঘমেয়াদে আগের প্রজন্মের সমান সংখ্যক জনসংখ্যা ধরে রাখার জন্য যে হারে সন্তান জন্মানো প্রয়োজন, ভারতের বর্তমান প্রজনন হার তার নিচে রয়েছে। যদিও ভারতের জনসংখ্যা এখনও তুলনামূলকভাবে তরুণ, বয়সের কাঠামোয় পরিবর্তন ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এর প্রভাব শতাব্দীর পরবর্তী সময়ে আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে জানিয়েছে মুডিজ়।
কেন কমছে সন্তান জন্মের প্রবণতা?
মুডিজ়ের বিশ্লেষণে একাধিক কারণ উঠে এসেছে। শিক্ষার প্রসার এবং শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ার ফলে অনেক মানুষ পরিবার শুরু করার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি বাড়ির খরচ, শিশু পরিচর্যা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যয় বেড়ে যাওয়াও সন্তান পালনের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।
সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু গবেষকের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি কম সন্তান নেওয়ার প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। আবার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও পরিবারের আকার নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে বলে মুডিজ় জানিয়েছে।
ভারতের মহিলা শ্রমশক্তি অংশগ্রহণে বড় সুযোগ
মুডিজ়ের তুলনায় থাকা ১৯টি অর্থনীতির মধ্যে ভারতে মহিলা শ্রমশক্তি অংশগ্রহণের হার ৩২ শতাংশ, যা ওই তালিকায় সবচেয়ে কম। রেটিং এজেন্সির মতে, এখানেই ভারতের জন্য শ্রমশক্তি বাড়ানোর একটি বড় সুযোগ রয়েছে। জনসংখ্যার বয়স বাড়ার ফলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে আরও বেশি মানুষকে শ্রমবাজারে যুক্ত করা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কম কর্মী, কম ভোক্তা, বাড়বে উৎপাদনশীলতার গুরুত্ব
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের মতো দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। বেশি কর্মক্ষম মানুষ মানে বেশি উৎপাদন এবং বেশি ভোক্তা। কিন্তু জন্মহার কমে গেলে এই সমীকরণ বদলে যেতে পারে। কর্মীর সংখ্যা কমলে উৎপাদন ক্ষমতা সীমিত হতে পারে। একইসঙ্গে পরিবার এবং ভোক্তার সংখ্যা কমলে বাজারের চাহিদাতেও প্রভাব পড়তে পারে। মুডিজ়ের মতে, এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে দেশগুলিকে উৎপাদনশীলতার উপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চিনেও দ্রুত বদল
বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক জনসংখ্যার কাঠামো রয়েছে জাপানে। দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ ৬৫ বছরের বেশি বয়সি, যেখানে ১৫ বছরের নিচে বয়সিদের অংশ প্রায় ১১ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়াও একই ধরনের জনসংখ্যাগত কাঠামোর দিকে এগিয়েছে। চিনও দ্রুত সেই পথে এগোচ্ছে। বিশেষ করে ওয়ান-চাইল্ড পলিসির আগে জন্ম নেওয়া বড় প্রজন্ম অবসরের বয়সে পৌঁছনোর ফলে চিনে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
ব্যবসা ও আর্থিক বাজারেও প্রভাব পড়বে
জনসংখ্যার বয়স বাড়ার প্রভাব শুধু সরকার বা শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্যবসার ক্ষেত্রেও ভোক্তাদের পছন্দ বদলাতে পারে। বয়স্ক পরিবারগুলির খরচের ধরন এবং আর্থিক ক্ষমতা ভবিষ্যতের বাজারকে প্রভাবিত করবে। একইসঙ্গে বয়স্ক প্রজন্মের হাতে থাকা বিপুল সম্পদ পরবর্তী সময়ে উত্তরাধিকারী, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সুবিধাভোগীদের মধ্যে স্থানান্তরিত হবে। এর ফলে আর্থিক বাজারেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে মুডিজ় জানিয়েছে।
এখন থেকেই নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজন
মুডিজ়ের মতে, প্রযুক্তি এবং সরকারি নীতি বয়স্ক সমাজে রূপান্তরের চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে এগুলি জনসংখ্যাগত প্রবণতাকে পুরোপুরি উল্টে দিতে পারে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে শ্রমশক্তির বৃদ্ধি ধীর হবে এবং সরকারি অর্থব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর চাপ বাড়বে। তাই ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও ক্রেডিট পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে শ্রমশক্তি বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে করা যায় তার উপর।
পেনশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সরকারি আর্থিক কাঠামোকে সময়মতো বদলানো তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মুডিজ়ের বক্তব্য, যে দেশগুলি আগে থেকেই এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেবে, তারা জনসংখ্যাগত চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবে।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business.