আমিষ–বিতর্ক বিধানসভাতেও, গ্রেপ্তারির নির্দেশ শুভেন্দুর
এই সময়: পুজোর সময়ে আমিষ খাওয়া নিয়ে বাগেশ্বর বাবার (ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী) বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর থানার সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন কংগ্রেস কর্মীরা। অভিযোগ, সেখানে ওই সাধুর ছবি পোড়ানো হয়। এ বার ওই কংগ্রেস কর্মীদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার বিধানসভা অধিবেশন থেকেই তিনি এই নির্দেশ দেন কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে। তাঁর এই নির্দেশ থেকে স্পষ্ট, সাধু–সন্তদের অপমান বিজেপি–শাসিত বাংলায় কোনও ভাবেই বরদাস্ত করবে না সরকার।
সম্প্রতি হাওড়ার লিলুয়ায় একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন বাগেশ্বর বাবা। পুজোর সময়ে যাঁরা আমিষ খান, তাঁদের ‘পাখণ্ডি’ (পাষণ্ড) বলে চিহ্নিত করে গিয়েছেন তিনি, যা নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বঙ্গ–রাজনীতি। বাগেশ্বর বাবা আর বিজেপিকে এক বন্ধনীতে ফেলে পদ্ম–নেতাদের গায়ে বাঙালি বিরোধী তকমা সাঁটতে শুরু করে দিয়েছেন বিভিন্ন শিবিরের বিরোধীরা। বাঙালির ‘আমিষ ভাবাবেগে’ আঘাত লাগার আশঙ্কায় বিজেপি রাজ্য নেতৃত্ব সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন এই ইস্যুতে। বাগেশ্বর বাবার আমিষ–নিরামিষ সংক্রান্ত পরামর্শের সঙ্গে যে বিজেপি কোনও ভাবেই সম্পৃক্ত নয়, সেটা ঘটনার দু’দিনের মাথায় সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি নবমীর দিন পাঁঠার মাংস খাওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন। একই ভাবে নিজেদের আমিষপ্রীতির জানান দেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, সুকান্ত মজুমদারের মতো শীর্ষ বিজেপি নেতা–নেত্রীরা, এমনকী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অন্যতম অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যাল। তাঁদের এই অবস্থানকে কার্যত ‘চাপের মুখে নতিস্বীকার’ বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার শুরু করেছে বিরোধীরা। সেই অস্ত্র ভোঁতা করতে এ বার আসরে নামলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
বৃহস্পতিবার বিধানসভা অধিবেশনে বিবৃতি দিতে গিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাগেশ্বর বাবার পরামর্শ কারও উপরে চাপিয়ে দেওয়া যেমন হবে না, তেমনই তাঁকে সামনে রেখে ঘোলা জলে বিরোধীরা মাছও ধরতে পারবে না। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘লিলুয়ায় একজন সাধু এসেছিলেন। তিনি দেশপ্রেমের কথা, রাষ্ট্রবাদের কথা, অখণ্ড ভারতের কথা বলেছেন। ভারতের ঐতিহ্য, সংস্কৃতির কথা তাঁর মতো করে তিনি বলেছেন। যাঁরা সে সব গ্রহণ করতে চান, করবেন। যাঁরা চান না, করবেন না। তিনি কারও উপরে কিছু চাপিয়ে দিতে চাননি।’ এরপরে নাম না–করে মুখ্যমন্ত্রী নিশানা করেন কংগ্রেসকে। ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেন, বাগেশ্বর বাবার পরামর্শ না–মানার অধিকার অবশ্যই আছে, কিন্তু তাঁর ছবি পোড়ানো সমর্থনযোগ্য নয়। মুখ্যমন্ত্রীর হুঙ্কার, ‘আমি কতগুলি লোককে দেখলাম, ভবানীপুর থানার সামনে ছবি পোড়াচ্ছে। আমি এখান থেকে সিপিকে (কলকাতার সিপি অজয় নন্দ) বলছি, ওই লোকগুলিকে গ্রেপ্তার করতে হবে। এ রাজ্যে এ সব চলবে না।’
বিজেপির একাংশের ব্যাখ্যা, সংখ্যালঘু ভোটারদের খুশি করতেই প্রকাশ্যে বাগেশ্বর বাবার ছবি পোড়ানো হয়েছে। বিধানসভায় বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৃণমূলের উদ্দেশেও শুভেন্দুর সতর্কবার্তা, ‘অনেক করেছেন এ সব। তোষণের রাজনীতি অনেক হয়েছে। এই তোষণের রাজনীতি করেছেন বলেই আপনাদের সংখ্যা কমে এখানে দাঁড়িয়েছে। তার মধ্যেও আবার চারটি ভাগ। আর আমাদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন ২০৭।’ যদিও মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে কালীঘাট–তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের মন্তব্য, ‘বাগেশ্বর বাবা বাংলা ও বাঙালিকে যে অপমান করেছেন, তাঁদের থেকে আমরা দুর্গাপুজো শিখব না। আমরা এক এক দল এক এক ভাবে এর প্রতিবাদ করছি। সেখানে যারা একটি থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী তাঁদেরই গ্রেপ্তারির নির্দেশ দিয়েছেন। এটা অনভিপ্রেত।’ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেন, ‘বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, যাঁরা বাগেশ্বর বাবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে। এর মধ্যে দিয়ে রাজ্যে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ আরও বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে।’
সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলমালের পরে সংবাদমাধ্যমের একাংশে ‘গেরুয়া’ শব্দকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ দিন বিধানসভায় সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীদের হুইপ আখরুজ্জামান সাহেব বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী গেরুয়া ধারণ করেছেন। স্পিকার সেটা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দিয়েছেন।’ শুভেন্দুর মতে, গেরুয়া সম্পর্কে এ হেন তাচ্ছিল্যের মনোভাবের কারণেই গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবি হয়েছে। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘সামনে উপনির্বাচন আর কর্পোরেশন ভোট আছে, এখানেও আপনাদের অবস্থা গেরুয়াধারীরা কী করেন, দেখতে পাবেন।’ মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘গেরুয়া কোনও রাজনৈতিক দল নয়। গেরুয়া জাতীয় পতাকার সব থেকে উপরে থাকে। গেরুয়া বিবেকানন্দ, চৈতন্যের বসন ছিল। আপনারা যেটা করছেন, তাতে আমাদের সুবিধে হচ্ছে। গেরুয়া শব্দের অপমান করার আগে পাঁচবার ভাববেন।’