Birinchi Baba: সোশাল মিডিয়ায় হঠাৎ ভাইরাল সত্যজিতের 'মহাপুরুষ', জানেন কে এই 'বিরিঞ্চিবাবা'? | Birinchi baba satyajit ray mahapurush actor charu prakash ghosh - 24 Ghanta Bangla News
Home

Birinchi Baba: সোশাল মিডিয়ায় হঠাৎ ভাইরাল সত্যজিতের ‘মহাপুরুষ’, জানেন কে এই ‘বিরিঞ্চিবাবা’? | Birinchi baba satyajit ray mahapurush actor charu prakash ghosh

Spread the love

ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে স্মিতহাস্যে ভক্তদের উদ্দেশে সন্দেশ ছুঁড়ে দিচ্ছেন এক সাধু। হাতে তাঁর একগোছা গোলাপ ফুল। সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর একমাত্র শিষ্য। ভক্তকুলের আতিশয্যে ট্রেনের চাকা স্তব্ধ, স্টেশন মাস্টার থেকে ড্রাইভার—সবাই ভক্তিরসে আপ্লুত। তারপর হঠাৎ সেই সাধুর ইশারাতেই ট্রেন ছাড়ল প্ল্যাটফর্ম। ট্রেনের চাকা চললেও, ভক্তি থামে না। চলন্ত ট্রেনের দরজা দিয়ে বের করা সাধুর ডান পায়ের বুড়ো আঙুল স্পর্শ করতে ব্যস্ত সাধারণ মানুষ। তারপর কাট টু! কামরায় বসেই তাঁর অম্লান ঘোষণা, “ওঠ্, ওঠ্!”—ডাক শুনে জানলা দিয়ে সকালের সূর্য উঠতেই নির্বিকার উত্তর, “নিশ্চিন্ত হওয়ার জো নেই, রোজ সকালে ব্যাটাকে ঘুম থেকে ডেকে দিতে হয়।” এই দৃশ্য কোন ছবির তা নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বাঙালি সিনেপ্রেমীদের। হ্য়াঁ, সত্যজিৎ রায়ের কাপুরুষ-মহাপুরুষের, ‘মহাপুরুষ’ পর্বের বিখ্যাত দৃশ্য। আর সাধু হলেন ‘বিরিঞ্চিবাবা’।

সম্প্রতি সোশাল মিডিয়ায় সত্যজিৎ রায়ের ১৯৬৫ সালের ছবি ‘মহাপুরুষ’-এর এই ‘বিরিঞ্চিবাবা’ নতুন করে ভাইরাল। বাঙালি সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ভণ্ড সাধুদের মুখোশ উন্মোচনে পরশুরাম (রাজশেখর বসু) এবং সত্যজিৎ রায়ের যুগলবন্দি যে কতটা নির্মম ও তীক্ষ্ণ ছিল, এই ছবিটি যেন তাঁর জলজ্যান্ত প্রমাণ।

১৯৫৮ সালে ‘পরশ পাথর’-এর সাফল্যের পর রাজশেখর বসুর ‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন ‘মহাপুরুষ’। ১৯৬৫ সালে ‘কাপুরুষ’-এর সঙ্গে যৌথভাবে ছবিটি মুক্তি পেলেও ব্যবসায়িক ও গুণগত বিচারে ‘মহাপুরুষ’ সাধারণ দর্শককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। বিশেষ করে বিরিঞ্চিবাবার চরিত্রে অভিনেতা চারুপ্রকাশ ঘোষের অসাধারণ অভিনয় চমকে দিয়েছিল বাঙালি সিনেপ্রেমীদের।

ছবিটির শুরুর ট্রেনের দৃশ্যটি অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ চাবুক। স্টেশনে ভক্তদের আকুলতা, বিরিঞ্চিবাবার নির্দেশে ট্রেনের প্রস্থান পিছিয়ে যাওয়া কিংবা চলন্ত ট্রেন থেকে তাঁর বুড়ো আঙুল ছুঁতে সাধারণ মানুষের ব্যস্ততা—সবটাই অন্ধভক্তির নির্মম সত্যকে উন্মোচিত করে। জানলা দিয়ে সূর্যকে ‘ঘুম থেকে তোলার’ দৃশ্যটি শুধুই কৌতুক নয়, বরং বিজ্ঞানের যুগেও মানুষের অহেতুক অলৌকিকতার প্রতি দাসত্বকে চিহ্নিত করে। আর এই অবিশ্বাস্য অবাস্তব ঘটনাকে যিনি অবিচল আত্মবিশ্বাসে সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তিনি অভিনেতা চারুপ্রকাশ ঘোষ।

কে এই চারুপ্রকাশ ঘোষ?

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, শান্ত অথচ গম্ভীর চোখ আর নিখুঁত বাচিক অভিনয়ে যিনি বিরিঞ্চিবাবাকে চিরস্মরণীয় করে তুলেছিলেন, সেই অভিনেতা আসলে কে? ১৯১২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর কলকাতায় জন্ম হয় চারুপ্রকাশ ঘোষের। একেবারেই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। তিনি পেশায় ছিলেন একজন সরকারি কর্মচারী। তবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত এক নাম। ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ (IPTA)-এর উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে তিনি গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। তাই কাজের পাশাপাশি, তাঁর একটাই নেশা ছিল নাটকের মঞ্চে অভিনয়। সত্যজিৎ রায় তাঁর জহুরি চোখ দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে বিরিঞ্চিবাবাকে কোনওভাবেই সস্তা বা ভাঁড় হিসেবে দেখানো যাবে না। কারণ চরিত্রটি প্রথম দেখাতেই ধূর্ত মনে হলে আলিপুর আদালতের প্রবীণ আইনজীবী গুরুপদ মিত্রের মতো শিক্ষিত মানুষ তাঁর চরণে নিজেকে সঁপে দিতেন না। তখনই সত্যজিতের নজরে আসেন চারুপ্রকাশ ঘোষ। যাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর, অনন্য বাচিক অভিনয়, মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি এবং থিয়েটারের অভিজ্ঞতাই এই চরিত্রটিকে এক সম্মোহনী করে তোলে। তবে শুধুই মহাপুরুষের বিরিঞ্চিবাবা নয়, ‘অভিযান’ (১৯৬২) ছবির ধূর্ত ব্যবসায়ী ‘সুখনরাম’, ‘অপরাজিত’ (১৯৫৬)-এ অপুর বেনারস জীবনের ‘নন্দ’, কিংবা সত্যজিতের চিত্রনাট্যে তৈরি ‘বাক্স বদল’ (১৯৭০)-এর ‘মামা’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও প্রশংসিত। পরবর্তীতে মৃণাল সেনের কান চলচ্চিত্র উৎসব জয়ী ছবি ‘খারিজ’ (১৯৮২)-এ একজন আইনজীবীর ছোট চরিত্রেও তিনি নিজের ছাপ রেখেছিলেন। তবে ‘মহাপুরুষ’-এর বিরিঞ্চিবাবাই তাঁর অভিনয় জীবনের শ্রেষ্ঠ সিগনেচার পারফরম্যান্স।

উল্লেখ্য, ১৯৫৮ সালে ‘পরশ পাথর’-এর সাফল্যের পর ১৯৬৫ সালে পরশুরামের কালজয়ী গল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ তৈরি করেন ‘মহাপুরুষ’। স্ত্রীবিয়োগে বিষাদগ্রস্ত আইনজীবী গুরুপদ মিত্রকে (প্রসাদ মুখোপাধ্যায়) অতীত ও ভবিষ্যতের অদ্ভুত যুক্তিতে বিভ্রান্ত করে বিরিঞ্চিবাবা ও তাঁর চতুর শিষ্য কৃপানন্দ (রবি ঘোষ)। কিন্তু গুরুপদবাবুর মেয়ে মিতালীকে (গীতালী রায়) কেন্দ্র করে তাঁর প্রেমিক সত্য (সতীন্দ্র ভট্টাচার্য) ও তাঁর বন্ধুরা এই ভণ্ড সাধুর মুখোশ খোলার সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত সত্যর বিজ্ঞানী বন্ধু নিতাইয়ের (সন্তোষ দত্ত) তৈরি রাসায়নিক ধোঁয়ায় অগ্নিকাণ্ডের ভীতি তৈরি হতেই প্রাণভয়ে পালান ‘মহাপুরুষ’। বিজ্ঞানের যুক্তিবাদ জয়ী হয়ে রক্ষা করে একটি পরিবারকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *