সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্টিশীল জীবন: শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার
শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকারে আবাহন দত্ত
আবাহন দত্ত: সৌমিত্রদাকে যেমন দেখেছি। এই কথাটুকু বললে আপনার কী মনে হয়, সেটা খানিকটা অ্যানেকডোট-এর মধ্যে দিয়ে জানতে চাইব। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অনেকগুলো পরিচয়: অভিনেতা, নাট্যকার, কবি, গদ্যকার, আবৃত্তিশিল্পী। আপনি সবগুলো পরিচয়কেই নিবিড় ভাবে ছুঁয়ে ছিলেন, এবং দীর্ঘ দিন ধরে। তাই ব্যক্তিগত ইতিহাস রোমন্থনের জায়গা থেকেই জানতে চাইব। তাতেই সম্ভবত সময়ের প্রেক্ষিতে মানুষটিকে বোঝা যাবে।
শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়: সৌমিত্রদা এবং আমার এক দাদা সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় সমকালীন ও বন্ধু। ফলে, সৌমিত্রদা আমাদের বাড়িতে আসতেন। সেখান থেকে আমার সঙ্গে পরিচয়। ওঁরা আমার চেয়ে বছর চার-পাঁচেক বড়। কাজের জায়গায় বললে, প্রথম ‘এক্ষণ’ যখন বেরোতে শুরু করল, তখন সৌমিত্রদা আমাকে শেক্সপিয়রের ওপর একটা বড় প্রবন্ধ লিখতে বললেন। সময়টা সম্ভবত ১৯৬৪— শেক্সপিয়রের চতুঃশতবর্ষ। তার একটু আগে, ১৯৫৮ সালে একটা ছোট সংগঠন তৈরি হয় কলেজ স্ট্রিট পাড়ায়— নব্য বাংলা নাট্য পরিষদ। ‘গ্রন্থজগৎ’ বলে এক প্রকাশনার দায়িত্বে ছিলেন দেবকুমার বসু। ওখানে শিশিরকুমার ভাদুড়ী আসতেন। দেবুদাকে চিনতাম, তাঁরই আহ্বানে গ্রন্থজগতে নব্য বাংলা নাট্য পরিষদের আড্ডায় শিশিরবাবুর জন্মদিনে, ২ অক্টোবর প্রথম কাছ থেকে দেখলাম। সপ্তাহে দু’দিন করে উনি আসতেন। ওঁর বিখ্যাত নাটকগুলো পড়তেন, সেগুলো ঘিরে কথাবার্তা হত। তাতেই নিয়মিত যোগ দিতেন সৌমিত্রদা। তাঁর সঙ্গে ওখানে দেখা হত, কথাও হত, কারণ দাদার সূত্রে তখন চিনে গেছি। এক দিকে, বৈঠকে শিশিরবাবুর বন্ধুস্থানীয় চার-পাঁচজন আসতেন। আর এক দিকে কমবয়সিদের মধ্যে সৌমিত্রদারা, আমি সর্বকনিষ্ঠ। একটু পিছনের দিকে ওঁর কাছাকাছি গিয়ে বসেছিলাম। ওখানেই শিশিরবাবু ঠিক করেন ‘মালিনী’ নাটকটা করবেন। মহলা শুরু করেন, সে জন্য দু’দিন বাদ দিয়ে তৃতীয় একটা দিন আসতেন, তাতে সৌমিত্রদা এবং আমার বৌদি করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনয় করছিলেন। শিশিরবাবুর অসুস্থতা ও অভাবের কারণে শেষ অবধি অবশ্য ওটা হয়ে ওঠেনি। এই প্রথম সন্ধ্যায় আর এক দেবুদা— বড় দেবুদা— শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায় আমাকে শিশিরবাবুর কাছে নিয়ে গেছিলেন। প্রণাম করতেই বললেন, ‘তোমরাই সব। We are drying up.’ এই স্পর্ধা আমি ৮৫ বছরের জীবনে কোনও বড় মানুষের কাছে শুনিনি। ওই সবটার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন সৌমিত্রদা।
এর পর সৌমিত্রদার সঙ্গে নানা সূত্রে দেখা হতে থাকে, কথা হতে থাকে, প্রায় পারিবারিক বন্ধুর মতোই হয়ে ওঠেন। কিন্তু শেষ বছর দশ-বারো, যখন উনি নাটকে ফিরছেন, তখন যোগাযোগ বাড়ে। ওঁর নাট্যজীবনের এক দিকে ছিল পেশাদারি থিয়েটার। তার মধ্যে অসাধারণ কাজ ‘ফেরা’। তবে, শেষ ওই দশ-বারো বছর একটা ভিন্ন পর্ব, যখন উনি ঠিক করেছেন যে গ্রুপ থিয়েটার ফর্ম্যাটেই কাজ করবেন। তখন চ্যালেঞ্জিং নাটক করছেন, বেপরোয়া ভাবে করছেন, নিজে লিখছেনও। সেই পর্বেই ‘হোমাপাখি’, ‘তৃতীয় অঙ্ক, অতএব’, এবং ‘রাজা লিয়র’। তখনই আমায় নাটকগুলো শুনিয়েছেন, আলোচনা করেছেন। বারবার ডেকে পাঠিয়েছেন, আমিও গেছি প্রশ্ন নিয়ে।
মনে আছে, ওঁর ৮০ বছরের জন্মদিনে দূরদর্শনে একটা সাক্ষাৎকার নিলাম। তার আগে প্রায় ছ’মাস উনি বিলেতে ছিলেন। ক্যান্সার ধরা পড়েছিল, সম্পূর্ণ চিকিৎসা করতে গেছিলেন। ডাক্তার বলেই দিয়েছিল, বেশি হলে চার বছর মেয়াদ। কিন্তু সাক্ষাৎকারের পর ফেরার সময়ে গাড়িতে বললেন, ‘একটা দারুণ নাটক দেখে এসেছি। সেটা এবার করব।’ নাটকটার কথা বলতে বলতে এলেন। ‘তৃতীয় অঙ্ক, অতএব’-এ যে দুঃসাহসে তিনি নিজের মারণব্যাধির অঙ্গীকারে নিজের জীবনকে তুলে ধরেন, আর দু’জন অভিনেতা-অভিনেত্রীকে সঙ্গী করে, তাতে আমি অভিভূত হয়ে যাই। ‘গোস্টস’ নাটকের প্রস্তুতি-পর্বে আমাদের প্রতিনিয়ত কথাবার্তা শুরু হল। উনি থিয়েটারে প্রথম স্বাধীন ভাবে যে কাজগুলো করেছেন, তার একটা ‘গোস্টস’। সেবার নীলিমা দাস ওঁর সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। অভিনেতৃ সঙ্ঘের প্রযোজনা, ‘বিদেহী’ নামে হয়েছিল। এবার নতুন করে ‘গোস্টস’ করবেন ভাবছেন। ইতিমধ্যে আমার ‘গোস্টস’ নিয়ে অন্য আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। নাটককার হেনরিক ইবসেনের মৃত্যুর পর জার্মান পরিচালক ম্যাক্স রাইনহার্ড ‘গোস্টস’ করবেন ঠিক করেন, এবং ইবসেনের বন্ধু চিত্রশিল্পী এডভার্ড মুন্শ-এর শরণাপন্ন হন। মুন্শকে বলেন, মুন্শ যে ভাবে নাটকটাকে দেখেন, সে ভাবে এক সেট স্কেচ করতে। এই স্কেচগুলো আমার সংগ্রহে ছিল। সৌমিত্রদাকে ছবিগুলোর কথা বলি, কপি করে দিই। সৌমিত্রদা তার পর নাটকটা নতুন করে অনুবাদ করেন। কিন্তু দুঃখের কথা, একটাই শো হয়েছিল। প্যাস্টর ম্যান্ডর্স-এর ভূমিকায় সৌমিত্রদা ছিলেন, অসওয়াল্ড অ্যালভিংয়ের ভূমিকায় ওঁর নাতি। তার পরেই নাতির দুর্ঘটনা। নাটকটা আর হয়নি। শুরু থেকে শেষ, দীর্ঘ একটা কালপর্ব, এতটাই ঢেউ সৌমিত্রদার জীবনে।