অ্যাপে বুক হচ্ছে কৃষি ড্রোন, চাষাবাদে বড় বদল আনছে নতুন প্রযুক্তি - 24 Ghanta Bangla News
Home

অ্যাপে বুক হচ্ছে কৃষি ড্রোন, চাষাবাদে বড় বদল আনছে নতুন প্রযুক্তি

Spread the love

কলকাতা: ভারতের কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় অংশ হয়ে উঠছে কৃষি-ড্রোন (Agriculture Drone)। কীটনাশক ও সার ছড়ানো থেকে শুরু করে মাটি পরীক্ষা, ফসল পর্যবেক্ষণ এবং জমির ছবি তোলার মতো একাধিক কাজে এখন ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কৃষকদের আর সবসময় নিজের ড্রোন কিনতে হচ্ছে না। অ্যাপ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রোন পরিষেবা ভাড়া নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

শিল্প মহলের মতে, এই মডেলকে অনেকটা ‘উবারাইজেশন অফ ড্রোনস’ বলা যায়। অর্থাৎ গাড়ি কেনার বদলে যেমন অ্যাপের মাধ্যমে প্রয়োজনের সময় গাড়ি বুক করা যায়, তেমনই কৃষকরাও প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রোন পরিষেবা বুক করতে পারবেন। এর ফলে ড্রোন প্রযুক্তি ছোট ও মাঝারি কৃষকদের কাছেও আরও সহজলভ্য হয়ে উঠতে পারে।

অ্যাপেই ড্রোন বুক করার সুযোগ

ড্রোন ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশে কৃষিক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে ড্রোন পরিষেবা দেওয়ার নেটওয়ার্ক তৈরি করছে ড্রোগো ড্রোনস, মারুট ড্রোনস, আইওটেকওয়ার্ল্ড, জেনারেল অ্যারোনটিক্স, ড্রোন ডেস্টিনেশন-সহ একাধিক সংস্থা। বিভিন্ন রাজ্য সরকারও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অন্ধ্রপ্রদেশ প্রথম রাজ্য হিসেবে কৃষকদের অনলাইনে ড্রোন পরিষেবা বুক করার সুযোগ চালু করে। এ জন্য এপি ড্রোন মার্ট পোর্টাল ব্যবহার করা হচ্ছে, যা এপি ড্রোন কর্পোরেশন পরিচালনা করছে।

দেশে ড্রোন ব্যবস্থার পরিকাঠামোও বাড়ছে

ভারতের ড্রোন ব্যবস্থাও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে মোট ৩৮,৫০০টি নিবন্ধিত ড্রোন, ৩৯,৮৯০-এর বেশি প্রশিক্ষিত ও সার্টিফায়েড পাইলট এবং ২৪৪টি অনুমোদিত প্রশিক্ষণ সংস্থা রয়েছে।

কৃষিতে ব্যবহৃত ড্রোনের সাহায্যে কীটনাশক ছড়ানো, মাটি পরীক্ষা, সার প্রয়োগ, গবাদি পশুর নজরদারি, আকাশপথে ফসলের ছবি তোলা এবং সেন্সরের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে জমির মানচিত্র তৈরি, ফসলের অবস্থা বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট জায়গায় সার বা কীটনাশক প্রয়োগের কাজও আরও নির্ভুলভাবে করা যায়।

৮ ঘণ্টার কাজ মাত্র ১০ মিনিটে

কৃষিক্ষেত্রে ড্রোনের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলির একটি হল সময় সাশ্রয়। শিল্প সংস্থাগুলির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যে কাজে প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রায় ৮ ঘণ্টা ম্যানুয়াল শ্রম প্রয়োজন হয়, ড্রোন সেটি প্রায় ১০ মিনিটে করতে পারে।

জল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে কীটনাশক বা অন্যান্য কৃষি উপকরণ ছড়াতে প্রতি একরে প্রায় ১০০-২০০ লিটার জল প্রয়োজন হতে পারে। ড্রোন ব্যবহারে তা কমে প্রায় ১০ লিটার প্রতি একর হতে পারে। অর্থাৎ জল ব্যবহারে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব বলে শিল্প মহলের দাবি। আর ড্রোন পরিষেবার জন্য কৃষকের খরচও তুলনামূলকভাবে কম রাখা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি একরে ড্রোন ভাড়া নেওয়ার খরচ প্রায় ৫০০-৬০০ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ২০ লক্ষ কৃষকের কাছে পৌঁছচ্ছে পরিষেবা

মারুট ড্রোনসের প্রতিষ্ঠাতা প্রেম কুমার বিশ্বনাথ জানিয়েছেন, তাঁদের প্রায় ৮০০ জন মাইক্রো-উদ্যোক্তা ড্রোন কিনে পরিষেবা দিচ্ছেন। তাঁদের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২০ লক্ষ কৃষক পরিষেবা পাচ্ছেন।

মারুট ড্রোনসের কার্যক্রম মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, ওড়িশা এবং গুজরাটে ছড়িয়ে রয়েছে। সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রায় ২০ লক্ষ কৃষক বিভিন্ন কৃষিকাজের জন্য বছরে ৩,০০০-৫,০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করেন।

কৃষকের ড্রোন কেনার প্রয়োজন নেই

ড্রোন ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট স্মিত শাহের মতে, কৃষকদের নিজেদের ড্রোন কিনতে, রক্ষণাবেক্ষণ করতে এবং প্রশিক্ষিত পাইলট নিয়োগ করতে হলে প্রায় ৫-১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। পরিষেবা হিসেবে ড্রোন ব্যবহার করলে সেই বড় প্রাথমিক খরচ এড়ানো সম্ভব।

কৃষক শুধু নিজের জমির প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষেবা নেবেন এবং জমির পরিমাণ অনুযায়ী টাকা দেবেন। এই মডেল ড্রোনের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রোন অপারেটর, কাস্টম হায়ারিং সেন্টার এবং মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগও তৈরি করতে পারে।

১,২০০ গ্রামীণ কৃষি দোকানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ড্রোন পরিষেবা

ধাকশা ড্রোনস তাদের পরিষেবা করোম্যান্ডেল ইন্টারন্যাশনালের ১,২০০-র বেশি গ্রামীণ কৃষি খুচরো দোকানের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি দোকানে প্রশিক্ষিত স্নাতক ড্রোন পাইলট থাকবেন। কৃষক দোকানে গিয়ে বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিষেবা বুক করতে পারবেন। করোম্যান্ডেল ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শঙ্করসুব্রহ্মণ্যম এস জানিয়েছেন, তাঁদের খুচরো নেটওয়ার্ক সরাসরি ৫০ লক্ষের বেশি কৃষকের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই পরিষেবা দ্রুত আরও বেশি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে

ড্রোনের ব্যবহার বাড়লেও কিছু সমস্যা রয়ে গিয়েছে। শিল্প মহলের মতে, দেশে নিবন্ধিত ড্রোনের পাশাপাশি অনেক অনিবন্ধিত ড্রোনও কৃষিক্ষেত্রে পরিষেবা দিচ্ছে। কম দামের বিদেশি ড্রোন ব্যবহার করেও কিছু ব্যক্তি কৃষকদের পরিষেবা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই কারণে প্রশিক্ষিত পাইলট, অনুমোদিত ড্রোন এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ডের পরিষেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সরকারি উদ্যোগে আরও গতি

কৃষিক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিষান ড্রোন কর্মসূচির পর অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের ড্রোন রুলস, ২০২১ কৃষিক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য কাঠামো তৈরি করেছে। এছাড়া নমো ড্রোন দিদি কর্মসূচির আওতায় ২০২৪-২৫ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত ১,২৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে ১৫,০০০টি ড্রোন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ড্রোন ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া মনে করছে, পরবর্তী ধাপে রাজ্যভিত্তিক এমন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে কৃষক কাছাকাছি অনুমোদিত ড্রোন অপারেটর খুঁজে পাবেন, পরিষেবার স্বচ্ছ দাম দেখতে পারবেন এবং অনলাইনে বুকিং করতে পারবেন।

মারুট ড্রোনসের প্রতিষ্ঠাতার অনুমান, আগামী পাঁচ বছরে কৃষিক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার এতটাই বাড়তে পারে যে ট্রাক্টরের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই প্রযুক্তি। তাঁর মতে, ওই সময়ের মধ্যে শিল্পে প্রায় ৫ লক্ষ ড্রোন বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ভারতের কৃষিতে ড্রোন শুধু প্রযুক্তির নতুন সংযোজন নয়, ধীরে ধীরে পরিষেবা-ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *