তোলাবাজি বন্ধে শমীকের ১৫ দিন, ‘কিছু নেতা মধুতে আসক্ত’, আসরে দিলীপও
এই সময়: তোলাবাজি নিয়ে উষ্মা আরও বাড়ল পদ্ম ব্রিগেডে। দলের মধ্য থেকে যাঁরা তোলাবাজি করছেন, তাঁদের আগেই সতর্ক করেছিলেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। এ বার তাঁদের শুধরে যাওয়ার জন্য সময়সীমাও বেঁধে দিলেন তিনি। শমীকের কড়া হুঁশিয়ারি, ‘তোলাবাজির ক্ষেত্রে আমাদের সরকারের জি়রো টলারেন্স নীতি। আরও ১৫ দিন দেখব আমরা। তার পরে যা হবে, সবাই বুঝতে পারবেন।’
এই ইস্যুতে শমীককে যোগ্য সঙ্গত করতে আসরে নেমেছেন রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষও। তাঁর সাফ কথা, ‘আমাদের দলের কিছু নেতা তোলাবাজির মধুতে আসক্ত হয়ে পড়েছেন। পার্টি তাঁদের উপরে নজর রাখছে। পার্টির মধ্যে আলোচনা চলছে।’ তাঁর দাবি, ‘ছ’মাস যেতে দিন, তার পরে পার্টি সব হিসেব করবে। তোলাবাজির সংস্কৃতি বন্ধ হবে।’ অর্থাৎ, দিলীপের ছ’মাসের হোক অথবা শমীকের পনেরো দিনের সময়সীমা — তোলাবাজদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে কোনও ভিন্ন সুর নেই।
বিধানসভা ভোটের প্রচারে বিজেপির মূল হাতিয়ারই ছিল তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে লাগামছাড়া তোলাবাজির অভিযোগ। জেলায় জেলায় ঘুরে ‘তোলাবাজি মুক্ত’ বাংলা গড়ার ডাক দিয়ে মানুষের কাছে ভোট প্রার্থনা করেছিলেন শমীকরা। কিন্তু বাংলায় বিজেপির শাসন কায়েম হলেও তোলাবাজি বন্ধ হয়নি। শনিবার রাজারহাটে একটি অনুষ্ঠানে শমীক কবুলও করেছিলেন, ‘তোলাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিচ্যুতি আছে। আমাদের দলের কেউ কেউ এর সঙ্গে জড়িত।’
দিলীপ অবশ্য মনে করছেন, এত সহজে বাংলা থেকে তোলাবাজি সংস্কৃতি দূর করা যাবে না। রবিবার তিনি বলেন, ‘তোলাবাজির সংস্কৃতি এত সহজে নির্মূল হবে, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই। পুলিশকে বলা হয়েছে তোলাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। বিজেপির কেউ কেউ বিধায়ক হয়ে হঠাৎ ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন। যাঁরা এত দিন ক্ষমতায় থেকে পয়সা কামিয়েছেন, তাঁরা আমাদের কিছু বিধায়কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চাইছেন। এ সব খবর আমাদের কাছে আছে।’ এর পরেই তিনি বলেন, ‘ছ’মাস যেতে দিন। তার পরে পার্টি সব হিসেব করবে। তোলাবাজি সংস্কৃতি বন্ধ হবে।’
শমীক অবশ্য তোলাবাজদের ছ’মাসও দলে বরদাস্ত করতে রাজি নন। তিনি চান দ্রুত পদক্ষেপ। শনিবার একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তোলাবাজির বিরুদ্ধে আমরাও দলের পক্ষ থেকে সাংগঠনিক ভাবে যা করার করছি। বিচ্যুতি কিছু জায়গায় আছে। কিন্তু কোনও বিচ্যুতিকে দীর্ঘদিন বরদাস্ত করা হবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতি জি়রো টলারেন্স। আরও ১৫ দিন দেখব আমরা। তার পরে যা হবে বুঝতে পারবেন।’ তাঁর সংযোজন, ‘আমাদের দলের নাম নিয়ে কিছু মানুষ বিভিন্ন জায়গায় তোলাবাজির চেষ্টা চালাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কঠোর হাতে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।’
রবিবার দিল্লি যাওয়ার আগেও তিনি বলেন, ‘কিছু জায়গায় বিচ্যুতি আছে। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের সংশোধিত হতে বলা হয়েছে। আমাদের পার্টির কর্মীরাই তাঁদের সংশোধন করে দেবেন।’ তোলাবাজি ইস্যুতে শমীক–দিলীপের কড়া অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের বক্তব্যেও — ‘তোলাবাজি আমরা কিছুতেই বরদাস্ত করব না। পশ্চিমবঙ্গে এই সংস্কৃতির পরিবর্তন করতেই হবে। আমাদের দলের কারও বিরুদ্ধে তোলাবাজির নির্দিষ্ট অভিযোগ এলে শুধু দলীয় স্তরে নয়, প্রশাসনিক স্তরেও ব্যবস্থা নেওয়া চলছে।’
বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, এক রাশ প্রত্যাশা নিয়ে বাংলায় রাজনৈতিক পালাবাদল ঘটিয়েছেন সাধারণ মানুষ। সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই এই মুহূর্তে দলের প্রধান লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যপূরণের ক্ষেত্রে দলের কেউ বিঘ্ন ঘটালে তাঁকে যে কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না, সেটাও বিজেপির সর্বস্তরের নেতা–কর্মীদের দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন শমীক। কেন বিজেপিকে বাংলার মানুষ ক্ষমতায় এনেছে, তা স্পষ্ট করতে গিয়ে বিজেপি রাজ্য সভাপতি এ দিন বলেন, ‘শুধু জামার পরিবর্তন নয়, জামার ভিতর মানুষটাকে পরিবর্তন করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এ বার ভোট দিয়েছেন। আমাদের এটা ভুলে গেলে চলবে না।’ এ প্রসঙ্গে বিজেপি নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে দিলীপের বার্তা, ‘যে লক্ষ্য নিয়ে বাংলার মানুষ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, সেই উদ্দেশ্য যেন আমরা ভুলে না যাই।’
কালীঘাট তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের কটাক্ষ, ‘তিন মাস হতে চলল একটা সরকার এসেছে, এর মধ্যেই দলের শীর্ষ নেতাদের বলতে হচ্ছে, দুর্নীতি চলছে। শমীক ভট্টাচার্য, দিলীপ ঘোষদের কথায় স্পষ্ট, তিন মাসেই বিজেপি সরকার তোলাবাজির ভাইরাসে ভরপুর আক্রান্ত।’