সমুদ্র সাঁতরে, সীমান্ত টপকে ২ দিনে ৬০ হাজার মানুষের ঢল স্পেনে, তার পরে কী হলো তাঁদের?
উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের স্বশাসিত অঞ্চল সিউটা (Ceuta)-তে মাত্র দু’দিনে প্রায় ৬০ হাজার শরণার্থী বেআইনি ভাবে ঢুকে পড়েছেন। শরণার্থীদের এই ঢলের কারণে এখন উদ্বেগে গোটা ইউরোপেই। সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োতে দেখা গিয়েছে মরক্কো থেকে সমুদ্রপথে সাঁতরে কিংবা সীমান্ত ঘুরে হাজার হাজার মানুষ সিউটায় ঢুকে পড়েছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে—এত মানুষ ঢোকার পরে তাঁদের কী হলো? স্পেন সরকার জানিয়েছে, অধিকাংশ অভিবাসী ইতিমধ্যেই মরক্কোয় ফিরে গিয়েছেন বা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনায় ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। একইসঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে শরণার্থীদের মানবিক সঙ্কট এবং অভিবাসন নীতি।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনা ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয় এবং মরক্কোর প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সরকারি হিসেবে, প্রায় অর্ধেক মানুষ প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যান। পরবর্তী সময়ে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে যায় এবং অধিকাংশ অভিবাসী আর সিউটায় থাকেননি।
বিধ্বস্ত সিউটা
এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ঢল সামলাতে গিয়ে সিউটার পরিকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো মুহূর্তে পূর্ণ হয়ে যায়। খাবার, পানীয় জল এবং চিকিৎসা পরিষেবার উপরে প্রবল চাপ তৈরি হয়। বহু দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়। স্থানীয় প্রশাসন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর সাহায্য নিতে বাধ্য হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই সীমান্ত পারাপারের সময়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছে। অধিকাংশই উত্তাল সমুদ্র সাঁতরে পেরোনোর সময়ে ডুবে মারা যান। মৃতদের মধ্যে কয়েকজন শিশুও ছিল বলে জানা গিয়েছে। উদ্ধারকারীরা জানান, অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতরে সিউটায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন।
সিউটাতেই কেন অনুপ্রবেশ?
তবে কেন এত মানুষ হঠাৎ সিউটার দিকে ছুটলেন? তদন্তে উঠে এসেছে, মানবপাচারকারী চক্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব বড় ভূমিকা নিয়েছিল। অনেককে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে একবার সিউটায় পৌঁছাতে পারলেই সহজে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে চলে যাওয়া যাবে এবং তাঁদের আর ফেরত পাঠানো হবে না। বাস্তবে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। স্পেনের সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায়কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে এই গুজব ছড়ানো হয়েছিল বলে দাবি করছে প্রশাসন।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই ঘটনাকে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হবে। একইসঙ্গে তিনি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। অন্যদিকে মরক্কোও সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়িয়ে নতুন করে অনুপ্রবেশ বন্ধ করার ব্যবস্থা করে।
এই ঘটনার জেরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যেও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। ইতালি সাময়িকভাবে স্পেনের সঙ্গে শেঙ্গেন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সীমান্ত পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। একাধিক ইউরোপীয় দেশ সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার দাবি তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিউটার এই ঘটনা শুধু একটি সীমান্ত সঙ্কট নয়, বরং উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপমুখী অভিবাসনের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার নতুন উদাহরণ। দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং উন্নত জীবনের আশায় হাজার হাজার মানুষ এখনও জীবন বাজি রেখে সমুদ্র পাড়ি দিতে প্রস্তুত। যদিও এবারের ঘটনায় অধিকাংশ অভিবাসীকেই শেষ পর্যন্ত মরক্কোয় ফিরে যেতে হয়েছে, তবুও এই সঙ্কট ইউরোপের অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে।