মাকড়সার জালের বুনন থেকে ফ্যাশনের মঞ্চ, শতাব্দী পেরিয়েও অমলিন ‘কেন্টে’ ও ‘ফুগুর’ ঐতিহ্যের কাহিনি

আজকাল তো মেশিন বা পাওয়ারলুমে যে কোনও ডিজ়াইন, যে কোনও কাপড় খুব অল্প সময়ে নিঁখুত ভাবে তৈরি হয়। কিন্তু এমন কিছু পোশাক রয়েছে, যার ডিজ়াইন নাকি বোনা হয়েছিল মাকড়সার জালের নিখুঁত বুনন, মিহি জালের কাজ আর সূক্ষ্ণ কারিগরি দেখে।

ভাবতে অবাক লাগছে তো? কিন্তু আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ঘানা শুধু তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, সোনার খনি, কোকো উৎপাদন বা প্রাণবন্ত সংস্কৃতির জন্যই পরিচিত নয়, বরং এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকগুলির জন্যও বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয়।

এই পোশাকগুলির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি পোশাক হলো কেন্টে (Kente) এবং ফুগু (Fugu) বা বাটাকারি (Batakari)। এই দুই পোশাক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঘানার মানুষের কাছে একটা আলাদা পরিচয়ের অংশ হয়ে রয়েছে। কিন্তু কী এই কেন্টে?

কেন্টে হলো হাতে বোনা কাপড়। মূলত ঘানার দক্ষিণে আশান্তি (Ashanti) এবং এওয়ে (Ewe) জনগোষ্ঠীর মানুষ প্রথম এটি তৈরি করেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৭শ শতাব্দী নাগাদ কেন্টের প্রচলন শুরু হয়।

তবে কেন্টের উৎপত্তির পিছনে রয়েছে একটি অবাক করা কাহিনি। বহু যুগ আগে ঘানায় দুই ভাই জঙ্গলে একটি মাকড়সার জালের নিখুঁত বুনন দেখে এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে, সেই ডিজ়াইন অনুসরণ করেই প্রথম হাতে বোনা শুরু হয় কেন্টের।

শুরুর দিকে কেন্টে ছিল রাজপরিবারের পোশাক। আশান্তি রাজা বা ‘আসান্তেহেনে’ পরিবারের সদস্যরাই মূলত এই কাপড় পরতেন। কারণ সেই সময়ে কেন্টে ক্ষমতা, সম্পদ, নেতৃত্ব এবং মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কেন্টে পুরো ঘানার জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। দেশের সব শ্রেণির মানুষই এখন এটি পরেন। এতে এখন ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়াও লেগেছে।

কাঠের তৈরি বিশেষ ধরনের তাঁতে দক্ষ কারিগরেরা সরু সরু রঙিন কাপড়ের ফিতে সেলাই করে এই পোশাক তৈরি করেন। প্রতিটি ফিতেয় থাকে ভিন্ন ভিন্ন জ্যামিতিক নকশা।

একটি বড় কেন্টে কাপড় তৈরি করতে কখনও কখনও কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই কারণেই আসল হাতে বোনা কেন্টের মূল্যও অনেক বেশি হয়।

এই পোশাকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর উজ্জ্বল রঙ। এর মধ্যে সাধারণত সোনালি বা হলুদ রঙ, সবুজ, নীল ও লাল রঙের মিশেলে এই পোশাক বানানো হয়। তবে শুধু রঙ নয়, কেন্টের প্রতিটি নকশারও একটি নির্দিষ্ট নাম এবং অর্থ রয়েছে। কোনও ডিজ়াইন ঐক্যের প্রতীক, কোনওটি সাহসের, আবার কোনওটি হয়তো নেতৃত্বের।

ঘানায় কেন্টে বিয়ে, নামকরণ অনুষ্ঠান, রাজকীয় সভা, ধর্মীয় উৎসব, স্বাধীনতা দিবস, উৎসব, রাষ্ট্রীয় কোনও অনুষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে এটি পরা হয়।

তবে শুধু কেন্টে নয়, ঘানার আরেকটি ঐতিহ্যবাহী পোশাক হলো ফুগু, যা বাটাকারি বা নর্দার্ন স্মক (Northern Smock) নামেও পরিচিত।

এই পোশাকের উৎপত্তি ঘানার উত্তরের প্রদেশগুলিতে। ডাগোম্বা, মামপ্রুসি, নানুম্বা, গঞ্জা এবং উত্তর ঘানার আরও অনেক জাতিগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ফুগু ব্যবহার করে আসছেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, ফুগুর ইতিহাসও কয়েক শতাব্দী পুরোনো। তবে এটি সেই সময়ে স্থানীয়দের পোশাক ছিল না। মূলত যোদ্ধা, শিকারি ও এলাকার প্রধানরা এই পোশাক পরতেন। পরবর্তীতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা সাধারণের পোশাক হয়ে ওঠে।

ফুগু তৈরির পদ্ধতিও বেশ আলাদা। এটি বানানো হয় সেখানকার এক বিশেষ তুলোর সুতো দিয়ে। এরপর তাঁতে প্রথমে আলাদা আলাদা করে কাপড়ের খণ্ড। পরে সেই কাপড়ের খণ্ডগুলিকে একসাথে করে হাতে সেলাই করা হয়।

এই পোশাকটির গলার অংশে থাকে বেশ জমকালো ডিজ়াইন। ফুগু সাধারণত ঢিলেঢালা, ছোট হাতাযুক্ত এবং হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হয়। এটি গরম আবহাওয়ার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আগে সাদা, ধূসর, বাদামি বা নীল রঙের সাধারণ ডিজ়াইনের ফুগু তৈরি হতো, তবে বর্তমানে আধুনিক ফ্যাশনের ফুগুও বানানো হয়।

বর্তমানে কেন্টে ও ফুগু শুধু ঐতিহ্যবাহী পোশাক হিসেবেই নয়, বরং ব্লেজার, স্যুট, গাউন, শার্ট, স্কার্ট, জ্যাকেট, ব্যাগ, জুতো, টাই, টুপি এবং নানা ধরনের ফ্যাশন অ্যাক্সেসরিজ় তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন উইক, আফ্রিকান ফ্যাশন প্রদর্শনী সব জায়গায় এটি পরা হয়।