অবসরেও কেন মন অস্থির থাকে?
অবসর যাপনেও কেন অস্থিরতা?
অবসর যাপনেও মনে কেন এতো অস্থিরতা! ‘মিটাইম’ কে কেন উপভোগ করা যাচ্ছে না? এ বিষয়ে মূল্যবান মতামত ভাগ করে নিলেন, জেনারেল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল। তাঁর কথায়, এ বিষয়টা আসতে পারে ছোট থেকে বড় হওয়ার ধরন বা পরিবেশের উপরেও। তিনি বলছেন, ‘ছোট থেকে বড় হওয়ার সময় যে প্রেশারটা (প্রেশার টু পারফর্ম, প্রেশার টু সাকসিড) সবার মধ্যে থাকে, সমাজের সবার মতো হতে হবে। অর্থাৎ সমাজের যাঁরা সফল, আদর্শ মানুষ, তাঁদের মতো সব মিলিয়ে জীবনে একটা উচ্চতায় পৌঁছতে হবে, এই চাপটা তো থাকে। People define their life according to their work।’
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এটাই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে যে, মানুষের মূল্য নির্ভর করে তাঁরা কী কাজ করছে তার উপর। এর ফলে মানুষ হিসেবে তাঁর নিজের কাছেই নিজের মূল্য কমে যাচ্ছে। একজন মানুষ হিসেবে আমি যে যথেষ্ট, এটাই সে বিশ্বাস করতে পারছেন না অনেকে। আমার সামাজিক অবস্থান (Social standing) দাঁড়িয়ে রয়েছে, আমি কি করছি তার উপর। সাকসেস-এর এর উপর সবকিছু নির্ভর করছে। ফলে যখন কাজ থাকে না, তখন মনে হয় আমি একেবারেই মূল্যহীন’। এর ফলে মানুষের অবসর উপভোগ করার ক্ষমতাটাই চলে যাচ্ছে। আর এই সব কিছুই কোনো মানুষের বেড়ে ওঠা, তার শিক্ষা, তার সামাজিক অবস্থান, তার বর্তমান অবস্থান, এ সবের উপর নির্ভর করে।
গ্রোথ অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি
বর্তমান আধুনিক ইকনমিক স্ট্রাকচারে সবকিছু কে প্রোডাক্টিভিটি দিয়ে নির্ধারণ করা হয়। দেশের অর্থনীতি, ব্যক্তি মানুষের সফলতা, একটি প্রতিষ্ঠানের সফলতা, কর্পোরেট স্ট্রাকচার- এই সব কিছুই নির্ধারিত হয় ‘গ্রোথ অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি’ উপর।
ডাঃ পাল বলছেন, ‘আমাদের মনে হয়, Productivity equal to my work। এই মুহূর্তে আমি কোনও কাজ করছি না, তার মানে আমি মূল্যহীন। এই ভাবনাই অবসর যাপনের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকালে দেখা যায়, সব সময় একটা প্রোডাক্টিভিটি রয়েছে। কেউ হয়তো অনেক পুরস্কার পাচ্ছেন, কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এখানে ছবি বা দৃশ্যপটের অবিরাম একটা বর্ষণ (Continuous bombardment with images) হয়েই চলেছে। অর্থাৎ ১০০ জনের আপডেটে দেখা গেল ৫০ জনই কাজ করছেন। সে সময় নিজে কোনও কাজ করতে না পারায় একটা হীনমন্যতা তৈরি হচ্ছে। তখন মনে হতে পারে, ‘সবাই এত কাজ করছে, আমি কিছুই করতে পারলাম না।’ নিজেকে এক রকম মূল্যহীন মনে করা। সোশ্যাল মিডিয়া এই সামাজিক কাঠামো কে আরও শক্তিশালী করছে।
অস্তিত্ব বনাম উৎপাদনশীলতা
বর্তমানে আমাদের সামগ্রিক অস্তিত্ব উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ডাঃ পাল বলেন, ‘তুমি ক’টা ডিগ্রি নিয়েছ, তুমি সারাদিনে কতটা কাজ করেছ, তুমি কটা টার্গেট পূরণ করেছ, তুমি কটা অনলাইন কোর্স করে নিজেকে আপস্কিল করেছ, তোমার প্রোডাক্টিভিটি কে সমৃদ্ধ করছো— এত রকম ভাবনা চিন্তার মধ্যে অবসর বলে কিছু থাকছে না। স্বাভাবিক ভাবেই এত কিছু কারোর ভাবনায় থাকলে, তার অবসর মিলবে কী করে?’
বার্নিং ইস্যু
যবে থেকে ‘গ্রোথ এন্ড প্রোডাক্টিভিটি’ এই টার্ম গুলোর সঙ্গে সমাজ এবং হিউম্যান সোসাইটি জুড়ে গেছে, তবে থেকে সমস্যাগুলো গভীরতর হতে শুরু করেছে। কারণ অর্থনীতির সফলতা নির্ভর করে গ্রোথের ওপর। আসলে মানুষ, প্রতিষ্ঠান বা দেশের উন্নয়ন নির্ভর করছে তার উৎপাদনশীলতার ওপর। একজন মানুষের মধ্যে এই বিষয়গুলো প্রাধান্য পেতে শুরু করলে, তার এই পরিণাম অবশ্যম্ভাবী।
সমস্যার সমাধান
এই সমস্যার সমাধান তাড়াতাড়ি হয় না বলেই জানালেন, ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মচারীদের জন্য কর্পোরেট রিট্রিট এর ব্যবস্থা করে থাকে। যেমন: প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য অফিসের সাধারণ পরিবেশের বাইরে, কয়েকদিনের জন্য একটি বিশেষ ভ্রমণের আয়োজন করা। কোনও মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে, রিসর্টে বা অন্য কোনও শহরের অফ-সাইট লোকেশনে এমন আয়োজন করা হয়ে থাকে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো কর্মীদের কাজের একঘেয়েমি কাটানো। নতুন উদ্যমে কাজ করার জন্য মানসিক ভাবে তাঁদেরকে রিচার্জ করা।
‘এই অবস্থা থেকে নিস্তার পেতে গেলে, সামগ্রিক ভাবে পরিকাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন। মানুষকে বুঝতে হবে, একজন মানবিক মানুষ হিসেবে তার অস্তিত্বটাই যথেষ্ট। যতদিন এই বোধ বা উপলব্ধি না আসবে, ততদিন এই অবস্থায় পরিবর্তন সম্ভব নয়।’