ধাক্কা লাগতেই আগুনের বিশাল গোলা! এলপিজি ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনায় কেন তৈরি হয় ভয়ঙ্কর ‘ফায়ারবল’?

কয়েক দিন আগে উত্তরপ্রদেশের কৌশাম্বীতে টোল প্লাজ়ার কাছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডিভাইডারে ধাক্কা মারে এলপিজি (LPG) ভর্তি ট্যাঙ্কার। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের বিশাল গোলা তৈরি হয়। ঘটনায় পাঁচ জনের মৃত্যু হয়। এর আগে বিশ্বের একাধিক জায়গায় এলপিজি বহনকারী ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনার পরে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা সামনে এসেছিল। প্রশ্ন একটাই—ধাক্কা লাগলেই এমন বিশাল আগুনের গোলা কেন তৈরি হয়?

প্রথমেই একটি বিষয় জানা জরুরি। এলপিজি ট্যাঙ্কারের ভিতরে গ্যাস সাধারণ গ্যাসের মতো থাকে না। সেটিকে অত্যন্ত উচ্চচাপে তরল অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়। এতে কম জায়গায় অনেক বেশি এলপিজি বহন করা সম্ভব হয়। তাই ট্যাঙ্কারের গায়ে সামান্য ক্ষতিও বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

দুর্ঘটনার সময় যদি ট্যাঙ্কারের ভালভ বা পাইপলাইন ভেঙে যায়, তা হলে তরল এলপিজি দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই চাপ কমে যায়। তখন সেই তরল মুহূর্তের মধ্যে গ্যাসে পরিণত হয় এবং চারপাশে একটি বড় ভেপার ক্লাউড বা গ্যাসের মেঘ তৈরি করে।

এলপিজি বাতাসের চেয়ে ভারী। তাই গ্যাস উপরে উঠে যায় না। বরং মাটির কাছাকাছি ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তা, নালা, টোল প্লাজ়া বা নীচু জায়গায় জমে থাকতে পারে। এই সময় যদি আশপাশে সামান্য আগুন, বৈদ্যুতিক স্পার্ক, গরম ইঞ্জিন বা সিগারেটের আগুনও থাকে, তা হলে গ্যাস মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে উঠতে পারে।

অনেকেই এটিকে শুধু বিস্ফোরণ বলেন। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা এক রকম নয়। অনেক সময় গ্যাসের মেঘে আগুন লেগে বিশাল ফায়ারবল তৈরি হয়। আবার যদি ট্যাঙ্কার অতিরিক্ত গরম হয়ে চাপ সহ্য করতে না পেরে ফেটে যায়, তখন BLEVE (Boiling Liquid Expanding Vapour Explosion) নামে পরিচিত ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এতে আগুনের গোলা, তাপ ও বিস্ফোরণের চাপ—তিনটিই একসঙ্গে তৈরি হয়।

বিশ্বের একাধিক বড় এলপিজি দুর্ঘটনার তদন্তে দেখা গিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ হয়নি। প্রথমে গ্যাস লিক করেছে। তার পর সেই গ্যাস কোনও আগুনের উৎস পেয়ে জ্বলে উঠেছে। কেরালার চালা এলপিজি ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনাতেও এমন ঘটনাই ঘটেছিল।

তাই দুর্ঘটনার পর যদি কোনও এলপিজি ট্যাঙ্কার থেকে গ্যাস বের হতে দেখা যায়, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো দ্রুত এলাকা খালি করা। মোবাইল, গাড়ির ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক সুইচ বা যে কোনও স্পার্ক তৈরি করতে পারে এমন জিনিস ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে। নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

কৌশাম্বীর ঘটনায়ও প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ডিভাইডারে ধাক্কা লাগার পর ট্যাঙ্কার থেকে গ্যাস লিক করে এবং পরে তাতেই আগুন লাগে। ঠিক কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা জানতে তদন্ত চলছে।

তাই এলপিজি ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনায় যে বিশাল আগুনের গোলা দেখা যায়, সেটি কোনও রহস্য নয়। এর পিছনে রয়েছে উচ্চচাপে থাকা তরল গ্যাস, গ্যাসের দ্রুত প্রসারণ, বাতাসে মিশে দাহ্য মেঘ তৈরি হওয়া এবং আগুনের উৎসের সংস্পর্শে আসার মতো সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ। তাই এমন দুর্ঘটনায় কৌতূহল নয়, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।