আশিতে এসেও থামলেন না ‘এরকুল পোয়ারো’
আশিস পাঠক
বাঙালির মনে-গেঁথে-থাকা ফেলুদা বলতে যেমন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ব্যোমকেশ বলতে উত্তমকুমার বা রাজিত কাপুর, বিশ্ব-মনে তেমনই এরকুল পোয়ারো মানেই ডেভিড সুশে। আশিতে এলেন তিনি। কিন্তু থামলেন না। স্মৃতিতে ডুব দিয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাইলেন না। সুশে এ বার বেরিয়ে পড়লেন এক নতুন অভিযানে। তাঁর নতুন তথ্যচিত্র সিরিজ় ‘ট্রাভেলস উইথ আগাথা ক্রিস্টি অ্যান্ড স্যর ডেভিড সুশে’-র জন্য পাড়ি দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজ়িল্যান্ডে, খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই কিংবদন্তি রহস্য-সম্রাজ্ঞীর ফুটপ্রিন্ট।
‘আমি কখনও তারকা হতে চাইনি, চেয়েছিলাম ভালো অভিনেতা হতে,’ বলেন তিনি। সে নিছক কথার কথা নয়। তাঁর অভিনীত চরিত্রের সত্যটাকে ছুঁতে নইলে অমন গভীর সাধনা করেন কী করে তিনি! পোয়ারোকে জীবন দিতে, অথবা পোয়ারোর মধ্যে নিজের নতুন জীবন পেতে সুশে নিজস্ব গোপন ‘ডোসিয়ার’ তৈরি করেন। সেই আজব খাতায় পোয়ারোর জীবনের অন্তত নব্বইটি ছোটখাটো ডিটেল লিখে রাখতেন। যেমন, পোয়ারো চা বা কফিতে ক’চামচ চিনি নেন, তাঁর পকেটে ক’টি রুমাল থাকে, অগোছালো ঘর তাঁর অস্বস্তি কেমন বাড়ায়। তাঁর সেই বিখ্যাত দ্রুত ছোট-ছোট পায়ে হাঁটা রপ্ত করতে নিতম্বে একটি কয়েন রেখে হাঁটার অনুশীলন করতেন! পোয়ারো ছবির শুটিং চলাকালীন লাঞ্চেও পোয়ারোর গলাতেই কথা বলতেন, যাতে চরিত্রের সেই সূক্ষ্ম সুরটি কেটে না যায়। পোশাক তাঁর কাছে ছিল চরিত্রের অন্তরমহলে ঢোকার চাবি। থ্রি-পিস স্যুট, পকেট ঘড়ি আর সেই বিখ্যাত গোঁফটি যখনই তাঁর শরীরে উঠত, সুশে হয়ে উঠতেন বেলজিয়ান গোয়েন্দা এরকুল পোয়ারো।

১৯৮৯ থেকে ২০১৩— দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ৭০টি পর্বে সুশে পোয়ারো হয়েছেন। কিন্তু তাঁর বাইরেও দারুণ এক অভিনয়-জীবন তাঁর। ক্লাসিক্যাল থিয়েটারের এক স্তম্ভ তিনি। লন্ডন অ্যাকাডেমি অব মিউজ়িক অ্যান্ড ড্রামাটিক আর্ট থেকে প্রথাগত শিক্ষা শেষ করে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে যুক্ত হন ‘রয়্যাল শেকসপিয়র কোম্পানি’র সঙ্গে। ‘ওথেলো’র ইয়াগো, ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’-এর শাইলক বা ‘দ্য টেম্পেস্ট’-এর ক্যালিবান চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজ আদর্শ ধরা হয়। মঞ্চে চরিত্রের মনস্তত্ত্বকে যে ভাবে তিনি ব্যবচ্ছেদ করতেন, পরে তা পর্দার অভিনয়েও অনন্য গভীরতা এনেছিল। সুশে মনে করেন, মঞ্চ অভিনেতার জিমন্যাসিয়াম, রোজের অভ্যাসে সেখানে চরিত্রের পেশিগুলো তৈরি হয়।

১৯৪৬-এ লন্ডনে জন্ম তাঁর। মা জোন প্যাট্রিসিয়া ছিলেন মঞ্চ অভিনেত্রী। সেই সূত্রেই হয়তো অভিনয়ের প্রতি তাঁর রক্তের টান। ১৯৮৮-তে ‘ফ্রয়েড’ মিনি-সিরিজ়ে ফ্রয়েডের চরিত্রে অভিনয় করেন। ব্রিটিশ মিডিয়া টাইকুন রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের চরিত্রে তাঁর অভিনয় আন্তর্জাতিক এমি পুরস্কার এনে দেয় তাঁকে। অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য ইম্পর্ট্যান্স অব বিয়িং আর্নেস্ট’-এ ‘লেডি ব্র্যাকনেল’-এর চরিত্রে তাঁর অভিনয় ইতিহাস হয়ে আছে। সুশে জানান, সে নাটক বহু বার দেখেছেন তিনি। কিন্তু যখন অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়ে স্ক্রিপ্ট তাঁর কাছে আসে, নতুন করে পড়তে শুরু করেন তিনি। বুঝতে পারেন ব্র্যাকনেল আসলে জন্মসূত্রে কোনও অভিজাত বংশের নারী নন, একজন ‘নুভো রিশ’ বা নতুন ধনী। ব্র্যাকনেলের এই মনটাকে বুঝতে চেয়েছিলেন সুশে। আর তাই নারী চরিত্রে অভিনয়ের চ্যালেঞ্জটাও নিলেন। সুশে এবং তাঁর সহ-অভিনেতারা রিহার্সালের শুরুতেই বুঝেছিলেন যে, ওয়াইল্ডের ওই যতিচিহ্নগুলোকে প্রায় সঙ্গীতের নোটেশনের মতো নিখুঁত অনুসরণ করলে কথার সাধারণ বাস্তবতা থেকে এক ধরনের সুরের বাস্তবতায় পৌঁছনো যায়। সুশের সংলাপে সেই ছন্দ এবং সুরের খেলা লেডি ব্র্যাকনেলের প্রতিটি ব্যঙ্গাত্মক বাক্যকে আরও শাণিত করত। অভিনয়শিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য ‘নাইটহুড’ পেয়ে ডেভিড সুশে স্যর ডেভিড সুশে হয়েছেন। সে নিছক আলংকারিক। সে-সবে ভোলেন না সুশে। আজ আশির কোঠায় পৌঁছেও নতুন চরিত্রে অভিনয় করতে চান। আসলে যে তিনি অনন্ত চরিত্রের সন্ধানে একটি চিরতরুণ চরিত্র।