Job Card e-KYC: ঠক বাছতে গাঁ উজাড়! একশো দিনের কাজে চাঞ্চল্যকর তথ্য রাজ্যের হাতে | Nearly 6 Lakh MGNREGA Job Cards Under Scanner in South 24 Parganas as e KYC Drive Uncovers Suspected Ghost Beneficiaries
ক্যানিং: তৃণমূল আমলে একশো দিনের কাজে দুর্নীতির অভিযোগে বারবার সরব হয়েছে বিজেপি। আবার একশো দিনের কাজে টাকা আটকে রাখার জন্য এতদিন কেন্দ্রকে নিশানা করেছে তৃণমূল। রাজ্যে পালাবদলের পর এবার বিস্ফোরক তথ্য সামনে এল দক্ষিণ ২৪ পরগনায়। একশো দিনের কাজে এই জেলায় প্রায় ৬ লক্ষ ‘ভূতুড়ে’ কার্ডধারীর খোঁজ পাওয়া গেল। জব কার্ডে ই-কেওয়াইসি নিয়ে কড়াকড়ি শুরু হতেই প্রায় ৬ লক্ষ জব কার্ড হোল্ডারের খোঁজ পাওয়া গেল না। বিজেপির অভিযোগ, ভুয়ো জব কার্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে তৃণমূল।
জব কার্ডে জেলায় আধার-ভিত্তিক ডিজিটাল ফিল্টারিং এবং e-KYC বাধ্যতামূলক করতেই একের পর এক তথ্য সামনে আসছে।স্ক্রুটিনির কড়া দাওয়াই শুরু হতেই জেলাজুড়ে এক ধাক্কায় চম্পট দিল প্রায় ৫.৮২ লক্ষ জব কার্ড হোল্ডার। বিডিওদের বারবার ডাকে দেখা নেই ওই জব কার্ড হোল্ডারদের। চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় মোট ২৯টি ব্লকে ২৩ লক্ষ ৪০ হাজার ৫০ জন জব কার্ড হোল্ডারের মধ্যে বর্তমানে ৫,৮২,৯৯৮ জব কার্ড হোল্ডারের e-KYC পেন্ডিং রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্লকের বিডিও (BDO)-রা একাধিকবার সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিলেও এই বিপুল সংখ্যক কার্ডধারীর কোনও হদিশ মেলেনি। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে। উঠছে বড়সড় প্রশ্ন, তবে কি এতদিন এই লাখ লাখ ভুয়ো অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেই সরকারি টাকা লোপাট করা হচ্ছিল?
কোন কোন ব্লকে ‘নিখোঁজের’ বহর সবচেয়ে বেশি?
দেখে নিন জেলার প্রধান ব্লকগুলির খতিয়ান:
কুলপি: ৩৬,৭৯৪ জন
পাথরপ্রতিমা: ৩৪,০৪২ জন
বারুইপুর: ৩২,১৮০ জন
গোসাবা: ২৮,৬১৩ জন
বাসন্তী: ২৭,৬৩৪ জন
মগরাহাট-১: ২৭,১৫১ জন
কুলতলি: ২৬,৮৯২ জন
ক্যানিং ১ ও ক্যানিং ২ (মিলিয়ে): ৪২,৬৪৯ জন
সূত্রের খবর, ব্লক স্তরে বিডিও অফিসগুলির পক্ষ থেকে এই ই-কেওয়াইসি (e-KYC) ভেরিফিকেশনের সময়সীমা এবং প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই অফিশিয়ালি শেষ হয়েছে। বারবার সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও যে সমস্ত কার্ডধারী আধার ও ডিজিটাল ফিল্টারিং প্রক্রিয়ায় অংশ নেননি, তাঁদের প্রত্যেককে ভুয়ো বা ‘ভূতুড়ে’ উপভোক্তা হিসেবেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, এই পেন্ডিং ই-কেওয়াইসি তালিকাভুক্ত ৫,৮২,৯৯৮ জন কার্ডধারীর নাম পাকাপাকিভাবে ডিলিট বা বাতিল করার জন্য ইতিমধ্য়েই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
কোথায় গেল এই বিপুল জনতা?
ডিজিটাল স্ক্রুটিনি শুরু হতেই কেন এই লক্ষাধিক মানুষের দেখা মিলছে না, তার মূল কারণগুলি অনুসন্ধান করতে গিয়ে ৪টি বড় তথ্য উঠে এসেছে-
আঙুলের ছাপে ধরা পড়ার ভয়: অতীতে কাল্পনিক নামে (Ghost Accounts) বা একই ব্যক্তির নামে একাধিক জব কার্ড তৈরি করার জালিয়াতি চলত। বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল e-KYC চালু হওয়ায় এখন আর এক ব্যক্তি দুটি কার্ডে আঙুলের ছাপ দিতে পারছেন না। ফলে জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার ভয়ে এই ভুয়ো কার্ডের পেছনের মাথারা আর ভেরিফিকেশনে আসছেন না।
মৃতের নামেও উঠত টাকা: অনেক উপভোক্তা মারা গেলেও তাদের কার্ড নথিতে সচল রাখা হয়েছিল। e-KYC-র কড়াকড়িতে এখন জীবিত মানুষ সশরীরে হাজির না হলে কার্ড বাতিল হচ্ছে। ফলে এই সব কার্ডের কোনও দাবিদার মিলছে না।
আধার-জব কার্ডের নামের অমিল: কিছু ক্ষেত্রে মানুষ আসল হলেও আধার কার্ড ও জব কার্ডের নামের বানান বা জন্মতারিখ মিলছে না। এই কারিগরি ত্রুটির কারণে সার্ভার তাদের e-KYC রিজেক্ট করে দিচ্ছে।
ভিনরাজ্যে কর্মসংস্থান: ভাঙড়, ক্যানিং, বাসন্তীর মতো এলাকা থেকে বহু পরিযায়ী শ্রমিক বাইরে কাজ করেন। পঞ্চায়েত স্তরে ভেরিফিকেশনের নির্দিষ্ট দিনে তাঁরা গ্রামে উপস্থিত থাকতে না পারায় তাঁদের খাতা ‘নিখোঁজ’ দেখাচ্ছে। ডিজিটাল ফিল্টারিংয়ের এই জোড়া থাবায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার ১০০ দিনের কাজের ‘রুই-কাতলারা’ যে বেশ চাপে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ডিজিটাল ফিল্টারিংয়ের এই কড়া পদক্ষেপের জেরে জেলাজুড়ে ১০০ দিনের কাজের ভুয়ো উপভোক্তাদের বড়সড় চক্র ফাঁস হয়ে গেল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। অভিযোগের আঙুল উঠেছে রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূলের দিকে। বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য বিকাশ সর্দার বলেন, “৬ লক্ষ জব কার্ডে ই-কেওয়াইসি হল না। এই ৬ লক্ষ মানুষের জব কার্ডের মাধ্যমে লুঠ হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস ভুয়ো জব কার্ডের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুঠ করেছে। যারা এর সঙ্গে যুক্ত, তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
জব কার্ড দুর্নীতিতে যুক্তদের কড়া শাস্তির দাবি জানিয়ে প্রাক্তন সেচ ও জলসম্পদ মন্ত্রী তথা RSP নেতা সুভাষ নস্কর। তিনি বলেন, “একশো দিনের কাজে সারা রাজ্যে যে দুর্নীতি হয়েছে, দক্ষিণ ২৪ পরগনা মনে হয় সবার উপরে। প্রায় ৬ লক্ষের কাছাকাছি ২ নম্বরি কার্ড। এই জেলার নেতৃত্ব দিয়েছেন শওকত, জাহাঙ্গিরের মতো লোক। এদের সম্পত্তি দেখলেই বোঝা যায়, টাকাটা কোথা থেকে এসেছে। এদের ধরা গেলে রাজ্যের জেলখানা ৫০ গুণ বাড়াতে হবে।”