রামকিঙ্করের ‘ন্যুড স্টাডি’-তে আপত্তি করেননি রবীন্দ্রনাথ, বলতেন... - 24 Ghanta Bangla News
Home

রামকিঙ্করের ‘ন্যুড স্টাডি’-তে আপত্তি করেননি রবীন্দ্রনাথ, বলতেন…

Spread the love

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলায় নগ্নতা। যে নগ্নতার মধ্যেও রয়ে যায় সৌন্দর্যের এক অন্য ইশারা। ঋষিপ্রতিম মূর্তিতে দেখতে অভ্যস্ত রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিল্পমানসে প্রথম আধুনিক শিল্পচেতনার বিস্তার ঘটিয়েছিলেন, যা আজও ইতিহাস। উনবিংশ শতাব্দীতে ঠাকুরবাড়ির হাত ধরেই এ দেশে প্রথম আধুনিক শিল্পকলার বিস্তার ঘটিয়েছিলেন তিনি। প্রকৃত শিল্পমানসে তাঁর যে কোনও গোঁড়ামি ছিল না, তাঁর একের পর এক চিত্রকলায় নগ্নতার চিত্রশিল্প, যা সেই সমাজ ব্যবস্থাতেও নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই রবীন্দ্রনাথই শান্তিনিকেতনের বিতর্কিত শিল্পী রামকিঙ্করকে আদেশ করেছিলেন, ‘এই আশ্রম তুই তোর শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্য দিয়ে ভরিয়ে দে।’ অথচ, এই রামকিঙ্কর মহিলা মডেল দিয়ে তাঁর শিল্পে ন্যুড স্টাডি করতেন। এবং সবটাই বন্ধ ঘরে লুকিয়ে করতেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ তা জানতেন। রামকিঙ্করের সবচেয়ে বড় মদতদাতা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। কিন্তু, নন্দলাল তখনও কলাভবনে চিত্রকলার কোনও নগ্ন স্টাডিকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেননি।

এখানে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার প্রসঙ্গ তোলার আগে বিদেশি ছায়ায় দুটি ছবির কথা চলে আসে। টিনটোরেডোর একটি ছবি ‘সুসান্নাহ’-তে একজন নারী আয়নার ভিতর দিয়ে নিজের নগ্ন-মূর্তিকে পর্যবেক্ষণ করছেন। এতদিন শিল্পীরা যে নগ্ন-মূর্তি এঁকে এসেছেন, তা যেন পুরুষের দৃষ্টির জন্যই সৃষ্টি করা। নারী মহলে এই ছবি ব্যাপক আলোড়ন তুলল অন্য কারণে। তা হলো, এ দেশের আধুনিক-মনস্কা নারীরা এই প্রথম আয়নার মধ্য দিয়ে তাঁর শরীরের সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করলেন। পশ্চিমী দুনিয়ায় তখন বেশিরভাগ চিত্রকলায় নগ্ন নারী প্রদর্শন বিভিন্ন গ্যালারিতে ঠাঁই পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সেই সব চিত্রকলা নিয়ে মহিলারাও গঠনমূলক আলোচনায় সেই শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। সমর্থনও করেছেন। তবে অস্বীকার করা যায় না, পশ্চিমী চিত্রকলায় নগ্নতা সৃষ্টি করা হতো যেন পুরোপুরি পুরুষের যৌন তৃপ্তির জন্যই।

এটা ঠিক, প্রাচীন ভারতীয় চিত্রকলা, পার্সিয়ান চিত্রকলা, আফ্রিকান চিত্রশিল্পয় নগ্নতা এতটা একমুখী ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে আমরা যে নগ্নতা দেখতে পাই, তা বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী কেনেথ ক্লার্কের চিন্তাধারার স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। যেমন কেনেথ ক্লার্কের লেখা ‘ন্যুড’ বইতে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ‘নগ্ন’ আর ‘নগ্নতা’র পার্থক্য। নগ্ন মানে বিনা পোশাকে অবস্থান করা। আর নগ্নতা হচ্ছে শিল্পের একটি অবস্থান। যে অবস্থান রবীন্দ্রনাথ অনুসরণ করেছিলেন।

উপনিষদের প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ গড়ে উঠলেও প্রকৃত সৌন্দর্যের লক্ষণ চিনতে কখনও তিনি ভুল করেননি। তিনি ‘ইওরোপ যাত্রীর ডায়েরি’তে লিখেছেন, ‘….কারালুঁ ড্যুরা নামের একজন ফরাসি চিত্রকরের এক বসনহীনা মানবীর ছবি দেখলুম। মর্ত্যের এক চরম সৌন্দর্য’। তবে রবীন্দ্রনাথের নগ্ন ছবির সঙ্গে অনেক সাদৃশ্য আছে কহলিল জির্বানের আঁকা নগ্ন ছবির। জিব্রান প্রায় নিয়মিত আঁকতেন নারীর নগ্ন রূপ। কারণ, তিনি মনে করতেন, জীবনটাই তো নগ্ন।

১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ এঁকেছিলেন একজন নগ্ন পুরুষ একা পিছন ফিরে হেঁটে চলে যাচ্ছে। নগ্ন হলেও এ ছবিতে নগ্নতার কোনও পুঙ্খনাপুঙ্খ বিবরণ নেই। চিত্রশিল্পী বোদলেয়ার মতো নিশ্ছিদ্র কালোতে বিশ্বাস ছিল না রবীন্দ্রনাথের। তখনই তিনি লিখেছিলেন সেই গানটি, ‘আঁধার রাতে একলা পাগল যায় কেঁদে’। ১৯২৯ সালে নারী-পুরুষ উভয়েরই নগ্ন ছবি এঁকেছিলেন তিনি। নগ্ন, কিন্তু উভয়েরই কোনও যৌন উত্তেজনা নেই। অথচ, আছে এক তীব্র প্যাশনের বার্তা। তবে শিল্পমহলে যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছিল সেই ছবিটি যেখানে এক নগ্ন নারী, যার হাতের নীচে রয়েছে স্তনের সুস্পষ্ট আভাস। এরকম অসংখ্য ছবির দৃষ্টান্ত থেকে একটি কথাই বলা যেতে পারে, রবীন্দ্রনাথের নগ্ন ছবি পৃথিবীর নগ্ন চিত্রকলার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

(ঋণ স্বীকার: সঞ্জয় ঘোষের ‘ঠাকুরবাড়ির শিল্পযাত্রা’)

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *