মানুষের পানীয় জলের ভাণ্ডারেও কি এ বার থাবা বসাতে চলেছে AI?

লেখাপড়া থেকে শুরু ঘরের কাজ সবক্ষেত্রেই বেড়ে চলেছে AI-এর ব্যবহার। তবে AI-এর জনপ্রিয়তা যত বাড়চ্ছে, ততই পরিবেশের উপর প্রভাব নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ। আমার-আপনার পানীয় জলের ভাণ্ডারে নাকি এ বার থাবা বসাতে চলেছে AI? সম্প্রতি ইউনাইটেড নেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের (UNU) প্রকাশিত তথ্য চমকে দিয়েছে বিশ্ববাসীকে।

AI-এর এই বিশাল প্রযুক্তি চালানোর জন্য ডেটা সেন্টারগুলিতে বিপুল পরিমাণে ব্যবহার করা হয় জল। শুধু জলই নয়, ব্যবহার করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও জমিও। আর এখানেই বাড়ছে বিপত্তি।

UNU-এর একটি নতুন গবেষণা বলছে, AI ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত বিদ্যুতের চাহিদা ২০৩০ সালের মধ্যে তিনগুণ বাড়তে চলেছে। পাশাপাশি, AI ডেটা সেন্টারগুলিতে এত বেশি জল ব্যবহৃত হয়, যা ১৩০ কোটি মানুষের সারা বছরে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত জলের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট।

গবেষকদের মতে, চ্যাটজিপিটি-কে ১০০ শব্দের একটি ই-মেল লিখতে বললেও ৫১৯ মিলিলিটার জল হয়, যা একটি মাঝারি সাইজ়ের জলের বোতলের সমান। এ বার অনেকেরই মনে হতে পারে, AI প্রযুক্তি ব্যবহারে জল কেন ব্যবহার হবে?

কিন্তু কেন এত জল লাগে? AI ডেটা সেন্টারগুলিতে ব্যবহৃত কম্পিউটার চিপ প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন করে। সার্ভারে এই তাপ কমাতে কুলিং সিস্টেমে বিপুল পরিমাণ জল ব্যবহার করা হয়। একটি সাধারণ ১০০ মেগাওয়াটের ডেটা সেন্টারে প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষ লিটার জলের প্রয়োজন হয়। আর এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত জলের প্রায় ৮০ শতাংশই বাষ্প যায়। ফলে তা আবার ব্যবহার করা যায় না।

বড় বড় টেক জায়ান্ট কোম্পানিগুলি AI ডেটা সেন্টারে দিন দিন বাড়িয়েই চলেছে জলের ব্যবহার। গুগলের ডেটা সেন্টারে জলের ব্যবহার গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। মাইক্রোসফ্ট বিগত বছরের তুলনায় জলের ব্যবহার ৩৪ শতাংশ বাড়িয়েছে।

গবেষণার উঠে এসেছে আরও ভয়ঙ্কর তথ্য। আশঙ্কা করা হয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে AI ডেটা সেন্টারে জলের ব্যবহার বছরে ৪২০ কোটি থেকে ৬৬০ কোটি ঘনমিটার জল। এই পরিমাণটা খুবই ভয়ঙ্কর। তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ ই-বর্জ্য পদার্থও।

ভারতে AI ডেটা সেন্টার প্রধানত মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ এবং দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে গড়ে উঠছে। তবে এসব ডেটা সেন্টারের জন্য বিপুল পরিমাণ জল প্রয়োজন, কারণ একটি ১০০-মেগাওয়াট ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষ লিটার জল লাগে।

ভারতেও AI ডেটা সেন্টারের কারণে বাড়ছে জলসঙ্কট। বেঙ্গালুরুত, গ্রেটার নয়ডায়. মুম্বই-সহ শহরগুলিতে কমছে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর। এই পরিস্থিতিতে অনেক প্রযুক্তি সংস্থা এখন টিয়ার-২ ও টিয়ার-৩ শহরেও ডেটা সেন্টার তৈরি করছে। এতে ছোট শহরগুলির উপর বাড়ছে চাপ।

আদানি এবং আম্বানির মতো কর্পোরেট সংস্থাগুলিও ভারতে AI প্রযুক্তি এবং ক্লাউড স্টোরেজের জন্য ডেটা সেন্টার তৈরি করছে। সেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার ভূগর্ভস্থ জলের প্রয়োজন হয়। এর জেরে পানীয় জলের তীব্র অভাব দেখা দিচ্ছে।

তবে সমাধান কী?
গবেষকরা বলছেন, এই সমস্যা মেটানোর জন্য AI-এর ব্যবহার বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং এই প্রযুক্তিটিকে আরও বেশি পরিবেশসম্মত ভাবে ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন-
-
কম জল ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তৈরি ডেটা সেন্টার।
-
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ও সচেতন ভাবে ডেটা সেন্টারগুলি পরিচালনা করা উচিত।

AI ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হলেও এর ফলে বিদ্যুৎ, জল, জমি-সহ পরিবেশের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই AI-এর উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।