দেড় বছরেও শেষ হলো না ‘ভেজাল-স্যালাইন’ তদন্ত!
সুমন ঘোষ, মেদিনীপুর
রাজ্যে পালাবদলের পরে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকরা। তাঁদের আশা, এ বার ‘ভেজাল স্যালাইন’-এর ঘটনার সঠিক তদন্ত হবে। আসল অভিযুক্তরাও সাজা পাবে। কারণ, নির্বাচনী জনসভায় এসে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও ভেজাল স্যালাইনের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও একের পর এক দুর্নীতির ঘটনায় কড়া পদক্ষেপ করতে শুরু করেছেন। তাই চিকিৎসকরাও চাইছেন, ভেজাল স্যালাইন ও প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনার নেপথ্যে কাদের হাত রয়েছে, এ বার সেই সত্যও উদঘাটিত হোক।
মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৫-এর ৮ জানুয়ারি রাতে সিজারের জন্য রিঙ্গার্স ল্যাকটেট স্যালাইন দেওয়া হয় পাঁচ জন প্রসূতিকে। তারপরেই তাঁদের শরীরে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এক জন প্রসূতি ও এক শিশুর মৃত্যু হয়। তড়িঘড়ি গ্রিন করিডোর করে তিন প্রসূতিকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। স্যালাইনে ভেজাল ছিল কি না সে প্রশ্নও ওঠে।
মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিক্যালের সেই স্যালাইন পরীক্ষার পরে রিপোর্টে ‘ঠিক আছে’ বলে জানানো হলেও তা আর ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। উল্টে মেডিক্যালে মজুত সমস্ত স্যালাইন সিল করে রাখা হয়। ১১ জনের তদন্ত কমিটি তৈরির পাশাপাশি ওই ঘটনার তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে। গাফিলতির অভিযোগে ২০২৫-এর ১৬ জানুয়ারি ১৩ জনকে সাসপেন্ড করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাত জন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি, প্রসূতি বিভাগের প্রধান মহম্মদ আলাউদ্দিন, সিনিয়র রেসিডেন্ট পল্লবী বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ তিন জন চিকিৎসক ও এমএসভিপি জয়ন্তকুমার রাউত। ২৪ ফেব্রুয়ারি সাত জন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনির সাসপেনশন প্রত্যাহার করা হলেও চিকিৎসক ও এমএসভিপি প্রায় ১৪ মাস ধরে সাসপেন্ডেড রয়েছেন। চাকরির বয়সসীমা শেষ হওয়ায় অবসর নিয়েছেন মহম্মদ আলাউদ্দিন।
চিকিৎসকদের একাংশের অভিযোগ, প্রথমত, ভেজাল স্যালাইনের কারণে এই মারাত্মক ঘটনাটি ঘটে। যা চিকিৎসকদের বোঝার কথা নয়। আর যাঁদের সাসপেন্ড করা হয়েছিল, তাঁরা আদৌ কতটা দোষী তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। চিকিৎসার সময়ে বিভাগীয় প্রধান ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। আর এমএসভিপি ছিলেন ছুটিতে। সরকারি অনুমতি নিয়ে ছুটিতে থাকা ভাইস প্রিন্সিপালকে কী ভাবে সাসপেন্ড করা হতে পারে? নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জন চিকিৎসকের অভিযোগ, ‘সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিতেই তদন্ত কমিটি ও তড়িঘড়ি সাসপেন্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।’ তাঁদের প্রশ্ন, ‘যে রিঙ্গার্স ল্যাকটেট স্যালাইনে ভেজাল থাকার কারণে অন্য রাজ্যে বাতিল করা হয়েছিল, সেই স্যালাইন কী ভাবে এ রাজ্যে অনুমতি পায়?’
হাসপাতালের এক সিনিয়র চিকিৎসক বলেন, ‘দ্রুত তদন্ত না হলেও একটি বড় সমস্যা দেখা দেবে। কারণ, ভেজাল স্যালাইন এখনও সিল করা রয়েছে। প্রয়োজনে তা পুনরায় পরীক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু দেরি হলে তো তার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাবে। তখন পরীক্ষা করতে গেলে সঠিক তথ্য না-ও মিলতে পারে।’ চিকিৎসকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নির্বাচনের আগে বেলদায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনী জনসভার কথা। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে মা ও শিশুরা হাসপাতালে সুরক্ষিত নন। এখানকার মেডিক্যাল কলেজে ভেজাল স্যালাইন দেওয়ার কারণে এক মা ও শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে।’
বিজেপির পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা স্বাস্থ্য পরিষেবা সেলের আহ্বায়ক পবিত্র সাহু বলেন, ‘সাধারণ মানুষের স্বার্থে দ্রুত এই তদন্ত শেষ করা প্রয়োজন। নতুন সরকারের কাছে আমরাও সেই দাবি জানাব। যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটে।’ মেদিনীপুরের বিধায়ক বিজেপির শঙ্কর গুছাইতের কথায়, ‘তৃণমূল আমলে তো সবকিছুতেই দুর্নীতি ছিল। ভেজাল স্যালাইন কাণ্ড ও প্রসূতি মৃত্যুর তদন্তের জন্য আমিও নতুন সরকারের কাছে দাবি জানাব।’