‘আমরা–ওরা’ কালচারে ইতি টানলেন মুখ্যমন্ত্রী, নয়া সৌজন্য বঙ্গে - 24 Ghanta Bangla News
Home

‘আমরা–ওরা’ কালচারে ইতি টানলেন মুখ্যমন্ত্রী, নয়া সৌজন্য বঙ্গে

Spread the love

এই সময়: ‘আমরা–ওরা’ নয়, শাসক–বিরোধীকে একসঙ্গে নিয়ে রাজ্য প্রশাসন চলবে ‘আমরা’ মডেলে— মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন সরকারের দিশা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী অথবা অন্য কোনও মন্ত্রীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিধায়ক বা জনপ্রতিনিধিদের ডাকা হচ্ছে— এ দৃশ্য বেনজির ছিল গত ১৫ বছরের তৃণমূল জমানায়।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরে শুভেন্দু অবশ্য জানিয়েছিলেন, প্রশাসনিক বৈঠকগুলিতে বিরোধী জনপ্রতিনিধিদেরও ডাকা হবে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে মঙ্গলবার নদিয়ার কল্যাণীতে তিন জেলার বিধায়ক ও প্রশাসনিক অফিসারদের নিয়ে বৈঠকে হাজির হলেন তৃণমূলের ছ’জন বিধায়ক, সঙ্গে বারাসতের তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার। আবার উত্তরকন্যায় উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রমাণিকের ডাকা বৈঠকে উপস্থিত হলেন ১৩ জন জোড়াফুল বিধায়ক। তাঁদের মধ্যে রাজ্যের তিন প্রাক্তন মন্ত্রীও ছিলেন।

এই বিষয়টিকে দু’ভাবে দেখতে চাইছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এক— বঙ্গে প্রশাসনিক কাজকর্ম বা উন্নয়নের কর্মসূচিতে ‘আমরা–ওরা’র চিরন্তন ট্র্যাডিশন বদল করে নতুন‍ পথে হাঁটার অধ্যায় শুরু হলো। যেখানে কোনও এলাকার উন্নয়নে বিরোধী বিধায়কদের বক্তব্যকেও সমগুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে নতুন সরকার। এবং দুই— রাজ্যের পূর্বতন শাসকদলে যে ভাবে বিভিন্ন স্তরে বেসুরোর সংখ্যা বাড়ছে, সেখানে এ দিনের দু’টি প্রশাসনিক বৈঠকে ১৯ জন তৃণমূল বিধায়কের যোগদান জোড়াফুলে আগামীতে ভাঙনের ইঙ্গিতই দিচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরেই বেসুরে বাজছিলেন বারাসতের তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার।

এমনকী, দলের নেতৃত্বের প্রতি অনুযোগ জানিয়ে বারাসত সাংগঠনিক জেলা সভাপতির দায়িত্বও তিনি ছেড়ে দিয়েছেন দিন দুয়েক আগে। তাঁকে ওয়াই প্লাস ক্যাটিগরির কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাও দেওয়া হয়েছে। ফলে এ দিন শুভেন্দুর ডাকা বৈঠকে তাঁর উপস্থিতিতে চর্চা ছিলই। তার সঙ্গে কল্যাণীর বৈঠকে হুগলি, নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার মোট ১৫ জন জয়ী তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ৬ জন এবং উত্তরবঙ্গের বৈঠকে ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জন বিধায়কের উপস্থিতিতে রাজনৈতিক জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে।

এর মধ্যে কল্যাণীর বৈঠকে ছিলেন উত্তর ২৪ পরগনারই ৬ তৃণমূল বিধায়ক। বিরোধী বিধায়করা দলবদলের জল্পনা উড়িয়ে জানিয়েছেন, এতে তিলমাত্র রাজনীতি নেই। নেহাতই উন্নয়নের প্রশ্নে বৈঠকে হাজিরা দিয়েছেন তাঁরা। তবে এই ট্র্যাডিশন যে আগের জমানায় দেখা যেত না, তেমনটাও শোনা গিয়েছে জোড়াফুলের একাধিক বিধায়কের গলায়।

এর মধ্যে তৃণমূলের অস্বস্তি বাড়িয়েছেন হাওড়ার উলুবেড়িয়া পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এ দিনের প্রশাসনিক বৈঠকগুলিতে তৃণমূল বিধায়কদের উপস্থিতি প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করলে ঋতব্রত জানান, তাঁর এলাকায় শরৎচন্দ্র গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজে একটা বৈঠক আছে আগামিকাল (বুধবার)। সেখানে তিনি যাবেন। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে দিল্লিতে শুভেন্দু অধিকারীর যখন দেখা হয়েছিল, উনি বলেছিলেন এই মিটিংগুলোতে আসার জন্য। আমি যেমন আগামিকালই একটা মিটিংয়ে যাব।’ তাঁর সংযোজন, ‘কবির সুমনের একটা বিখ্যাত গান আছে, ‘বিরোধীকে বলতে দাও, বিরোধীকে বলতে দাও, বিরোধীকে বলতে দাও… তোমার ভুলের ফর্দ দিক’। বিরোধীর কথা বলতে পারা গণতন্ত্রের জন্য খুব জরুরি। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে একটা ধারাবাহিকতা ছিল, যেখানে বিরোধীরা ডাক পেতেন না। এটা স্বাস্থ্যকর নয়।’

বিরোধী দলনেতা থাকার সময়ে শুভেন্দু–সহ একাধিক বিজেপি বিধায়ক বারবার অভিযোগ করেছেন, তাঁদের ফোন জেলাশাসক বা বিডিও-রা ধরেন না। এ দিন সেই প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আর তেমনটা চলবে না।’ প্রশাসনিক আধিকারিকদের তিনি নির্দেশ দেন, ‘সব দলের জনপ্রতিনিধির মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশাসনিক কাজে কোনও ভেদভাব চলবে না।’ তাঁর সংযোজন, ‘ভোটের সময়ে রাজনীতির কচকচানি চলুক। বাকি সময়ে গঠনমূলক আলোচনা হোক।’ এ দিনের বৈঠকে বিরোধী বিধায়কদের উপস্থিতিতে স্বাগত জানিয়েছেন মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়ালও।

কল্যাণীর বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দেগঙ্গার বিধায়ক আনিসুর রহমান বিদেশ, বাদুড়িয়ার বুরহান-উল-মুকউদ্দিন (লিটন), স্বরূপনগরের বীণা মণ্ডল, বসিরহাট দক্ষিণের সুরজিৎ মিত্র (বাদল), মিনাখাঁর উষারানি মণ্ডল এবং হাড়োয়ার আব্দুল মতিন। বিরোধী সাংসদ-বিধায়কের হাজিরা নিয়ে জল্পনা শুরু হলেও অনেকেই একে দীর্ঘ ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র বদল হিসেবেও দেখছেন। আগের আমলে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী জনপ্রতিনিধিদের দেখা যেত না। বিজেপির দাবি, তাঁদের বিধায়কদের ডাকাই হতো না। শুভেন্দু সেই ‘সংস্কৃতি’র বদল ঘটিয়েছেন। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকের পরেও মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, এ বার এই ধরনের বৈঠকে বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হবে।

প্রশাসন সূত্রে খবর, মুখ্যমন্ত্রীর কথাতেই এ দিন কাকলি-সহ তৃণমূলের প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছে। কাকলি বলেন, ‘এটা কোনও দলের বৈঠক নয়, প্রশাসন সবার। তাই এসেছি।’ হাড়োয়ার বিধায়ক মতিনের কথায়, ‘রাজ্য সরকার ডেকেছে। তাই এসেছি। আগে কী হয়েছে, বলতে পারব না। বিধায়ক হিসাবেই এসেছি।’ সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করেন, তৃণমূল নেতৃত্ব কি এই ব্যাপারে অনুমতি দিয়েছেন? যদিও এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘এটা প্রশাসনিক বৈঠক। এখানে না–আসার ব্যাপারে আমাকে কেউ কিছু বলেননি।’ প্রশাসনিক বৈঠক সেরে বাইরে বেরিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘আমরা যখন বিরোধী পক্ষে ছিলাম, তখন প্রশাসনিক বৈঠকে ডাক পাইনি। আমরা ঠিক করেছি, বিশেষ বিশেষ সাংসদকেও আমন্ত্রণ জানাব। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বারাসতের সাংসদ এসেছেন। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের তিন জন বিধায়কও এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে এক জনকে বলার সুযোগও দেওয়া হয়েছে।’

উত্তরবঙ্গের প্রশাসনিক বৈঠক ছিল যেন বিরোধী বিধায়কদের মেলা। বর্ষার প্রস্তুতি নিয়ে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জন বিধায়কই হাজির হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজ্যের তিন প্রাক্তন মন্ত্রী বিপ্লব মিত্র, গোলাম রব্বানি এবং সাবিনা ইয়াসমিন। কেবলমাত্র সিতাইয়ের তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক সঙ্গীতা রায় বৈঠকে হাজির ছিলেন না। তৃণমূল বিধায়করাও নিজের এলাকার বন্যা প্রস্তুতি নিয়ে বক্তব্য রাখেন। উত্তর দিনাজপুরের জেলা তৃণমূল সভাপতি তথা ইসলামপুরের তৃণমূল বিধায়ক কানাইয়ালাল আগরওয়াল বলেন, ‘মূলত বন্যাপ্রবণ এলাকায় কী কী পদক্ষেপ করা হবে, সেই সব নিয়েই আলোচনা করা হয়। বৈঠকে কোনও অসুবিধা বা সমস্যা হয়নি। আমরা সন্তুষ্ট।’ বিরোধী দলের বিধায়কদের উপস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক বলেন, ‘আমরা দল আর প্রশাসনকে মিলিয়ে দেখি না। এটি ছিল প্রশাসনিক বৈঠক। বিরোধী দলের বিধায়কেরাও জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাই সমস্ত বিধায়ককেই ডাকা হয়েছিল।’

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *