রাত জেগে মোবাইল ফোনে চোখ রাখছেন! জানেন শরীরে কী কী ঘটছে? | Late night reels watching bad habit affects mental and physical health know
স্মার্টফোন ছাড়া বর্তমান যুগে একটা দিনও চলা অসম্ভব। কিন্তু প্রযুক্তির এই আশীর্বাদই এখন অনেকের জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে ‘রিলস’ বা শর্ট ভিডিও দেখার মারাত্মক নেশা গ্রাস করছে ছোট থেকে বড়— সবাইকে। বিছানায় শুয়েও স্ক্রল করার এই বদভ্যাস কেড়ে নিচ্ছে রাতের ঘুম। অনেকেই মনে করেন, গভীর রাত পর্যন্ত ফোন ঘাঁটলে কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে এনেছেন। তাঁরা জানাচ্ছেন, রাতের এই কুঅভ্যাস আপনাকে নিঃশব্দে ঠেলে দিচ্ছে স্থূলতা বা মোটা হয়ে যাওয়ার দিকে!
আপনিও কি মাঝরাত পর্যন্ত ফোনের আলোয় চোখ ডুবিয়ে রাখেন? শিশু ও যুবসমাজের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। চিকিৎসকেরা কীভাবে এই অভ্যাসকে শারীরিক ও মানসিক পঙ্গুত্বের কারণ হিসেবে দেখছেন, তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
রাতের ফোন কীভাবে ক্ষতি করছে শরীরের?
ফেলিক্স গ্রুপ অব হসপিটালস-এর চেয়ারম্যান ও ডিরেক্টর ডাঃ ডি কে গুপ্ত এই মারাত্মক সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ঘুমনোর আগে দীর্ঘক্ষণ ফোন দেখার অভ্যাস এখন ঘরে ঘরে এক বড় ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল মস্তিষ্কের ওপরই চাপ সৃষ্টি করে না, বরং আমাদের সামগ্রিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে নষ্ট করে দেয়। শিশু, কিশোর এবং তরুণ প্রজন্মের ওপর এর কুপ্রভাব সবচেয়ে মারাত্মক।
অল্প বয়সেই ঘুমের দফারফা
ডাঃ গুপ্তের মতে, আজকাল খুব কম বয়সেই ছেলেমেয়েরা নানা রকম শারীরিক সমস্যায় ভুগছে, যার মধ্যে অনিদ্রা বা স্লিপ সাইকেল (Sleep Cycle) বিগড়ে যাওয়া সবচেয়ে সাধারণ ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত ‘ব্লু লাইট’ বা নীল আলো আমাদের শরীরে ‘মেলাটোনিন’ (Melatonin) নামক হরমোনের ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। এই হরমোনটি আমাদের ঘুমাতে সাহায্য করে। ফলে এটি কমে গেলে সময়মতো ঘুম আসে না। আমরা একে সাধারণ সমস্যা ভাবলেও, দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে তা বড়সড় রোগের আকার নেয়। এমনকি রাতে ঘুমোলেও বারবার চোখ খুলে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়।
চোখের বারোটা বাজছে
বেশিরভাগ মানুষের ধারণা, ফোনের নেশা শুধু মানসিক ক্ষতি করে। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এটি চোখের স্বাস্থ্যকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। একটানা ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখে জ্বালাপোড়া, চুলকানি বা শুষ্কভাব (Dryness) দেখা দেয়। যাঁদের ইতিমধ্যেই চশমা রয়েছে, তাঁদের পাওয়ার দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেই সঙ্গে শুরু হয় ক্রনিক মাথাব্যথা, যা এড়িয়ে যাওয়া একেবারেই উচিত নয়।
স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও মনোযোগের অভাব
ঘুমনোর আগে ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার যে আমাদের স্মৃতিশক্তি এবং মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, তা কি আপনি জানেন? শিশুরা একটানা ফোন দেখার ফলে পড়াশোনা বা অন্য কোনও জরুরি কাজে মনঃসংযোগ করতে পারছে না। এর ফলে পরীক্ষার পারফরম্যান্স খারাপ হচ্ছে এবং তা থেকে জন্ম নিচ্ছে মানসিক চাপ ও খিটখিটে মেজাজ। এ ছাড়া দীর্ঘক্ষণ শুয়ে-বসে ফোন ঘাঁটার কারণে ঘাড়ে ব্যথা, পিঠে ব্যথা এবং সারভাইকাল স্পন্ডিলাইটিসের মতো সমস্যা এখন অল্প বয়সেই দেখা দিচ্ছে।
ওজন বৃদ্ধি এবং শারীরিক দুর্বলতা
চিকিৎসকেরা এক অভিনব যোগসূত্র ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, রাতে ঘুম পূরণ না হলে পরদিন শরীরে চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা দানা বাঁধে। এই ক্লান্তির কারণে মানুষের শারীরিক সক্রিয়তা বা ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি এক ধাক্কায় কমে যায়। ফলে শরীর ক্যালোরি বার্ন করতে পারে না এবং ওজন বাড়তে শুরু করে।
আজকালকার শিশুরা যেভাবে ওবেসিটি বা স্থূলতার শিকার হচ্ছে, মা-বাবারা মনে করেন তার একমাত্র কারণ বুঝি ফাস্টফুড বা খারাপ খাওয়াদাওয়ার অভ্যাস। জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস তো দায়ী বটেই, কিন্তু তার নেপথ্যের অন্যতম বড় অনুঘটক হল এই মোবাইল ফোন। রাতের ফোন দেখার ক্লান্তি সকালের স্বাভাবিক এনার্জি কেড়ে নেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ওজনে। এ ছাড়া শিশুদের গ্রোথ হরমোন তৈরিতে বাধা আসে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে তারা ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই সুস্থ থাকতে আজই বিছানায় ফোন নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।