৪ বছরের শীর্ষে তেল, সর্বকালীন তলানিতে টাকা
এই সময়: চার বছর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ লাগার পরে ২০২২ সালের মার্চে বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম পৌঁছেছিল ১৩০ ডলারে। তারপরে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একাধিক ঝড়ঝাপ্টা এলেও আর ততটা ছেঁকা লাগেনি জ্বালানির দরে। কিন্তু বৃহস্পতিবার তা পৌঁছে গেল এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ দাম, ব্যারেলপ্রতি ১২৬.৪১ ডলারে।
কেন?
বিশেষজ্ঞদের দাবি, লক্ষ্মীবারে একেবারে জোড়া ধাক্কা খেয়েছে বাজার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হরমুজ় প্রশ্নে কড়া অবস্থান এবং মার্কিন শীর্ষ ব্যাঙ্কের তরফে সে দেশের অর্থনীতি এবং মূল্যবৃদ্ধিতে অনিশ্চয়তা সংক্রান্ত মন্তব্যে একটা বিষয় অন্তত পরিষ্কার, বিরাট কিছু ম্যাজিক না হয়ে গেলে, আপাতত বিশ্ববাজারে পশ্চিম এশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেলের সাপ্লাই মসৃণ গতিতে নয়, চলবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই। আর তেল-গ্যাসের জোগানে টানাটানির অবধারিত পরিণাম তার দাম এবং সার্বিক ভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে টেনে উপরে তোলা। যে আশঙ্কায় এক ধাক্কায় প্রায় ৮% বেড়ে যায় তেলের দাম। উল্লেখ্য, চলতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প তেহরানে হামলা চালানোর সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার। যা ইতিমধ্যেই ৮০% বেড়ে গিয়েছে মধ্যের সময়ে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
মুখে যতই স্তোকবাক্য দেওয়া হোক না কেন, বর্তমানে বিশ্বের কোনও দেশই যে জ্বালানি ভাঁড়ার এবং তার জোগান নিয়ে স্বস্তিতে নেই, তা এখন সবথেকে বড় ওপেন সিক্রেট। ইরান থেকে জ্বালানি বাইরে যেতে দিতে রাজি নন ট্রাম্প, আর হরমুজ় দিয়ে জাহাজ যেতে না দেওয়ার মরণপণ গোঁ ধরেছে তেহরান। জোড়া ফলায় বিদ্ধ হয়ে সবাই যখন বিকল্পের সন্ধান করছে, তখন এল তৃতীয় দুঃসংবাদ—ওপেক এবং ওপেক প্লাস থেকে আমিরশাহি সরে দাঁড়ানোয় ধাক্কা খেতে চলেছে গোষ্ঠীর সার্বিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। যা তেলের দামকে ঠেলে তুলেছে উপরে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের দাবি, মধ্যে ইউএস-ইরান শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার পর জট কাটার যেটুকু সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যতদিন যাচ্ছে, তা তত কমছে। ইতিমধ্যেই ন’সপ্তাহে পা রাখা যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং তার জেরে হরমুজ়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় বিপুল ধাক্কা খেয়েছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সাপ্লাই চেন। তার উপর ইরান সৌদি আরব-কাতার-আমিরশাহির মতো একাধিক দেশের জ্বালানি কেন্দ্রগুলিতে যে ভাবে হামলা চালিয়েছে, তাতে হরমুজ় খুললেও পরিষেবা আশু শুরু করার জায়গায় নেই অনেকেই। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞদের দাবি, চলতি মে মাসের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই রফাসূত্র না মিললে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছে যাওয়া অসম্ভব নয়। যে পরিস্থিতির কথা ভাবলেও কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে দেশের নীতি নির্ধারকদের।
ভারতের চাপ কীসে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বিশ্বে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু জ্বালানিক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। শেয়ারবাজার থেকে দেশের কারেন্সি এবং সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির উপর তা ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। যে সূত্র ধরে টাকার নিরিখে ডলারের দাম এদিন পৌঁছে গেল ৯৫.৩৪ টাকায়। যে স্তরে তা আগে কখনও পৌঁছয়নি। বাজার বিশেষজ্ঞদের দাবি, তেলের যত বাড়বে, তত চড়বে ডলার/টাকা বিনিময়মূল্য। যা অবধারিত ভাবে আরও চওড়া করবে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির অঙ্ককে। একই সঙ্গে কেন্দ্রের তরফে ভর্তুকির পরিমাণও ক্রমশ বাড়তে থাকবে।
যে সমস্যার উল্টো দিকও নয়াদিল্লির কাছে সমান চাপের। টাকার নিরিখে যত বাড়বে ডলারের ‘মূল্য’, যত বাড়বে মার্কিন বন্ড ইল্ড, তত ভারত থেকে সরবে বিদেশি বিনিয়োগ। ফলে রক্তাল্পতা বাড়তে থাকবে দালাল স্ট্রিটে। যার ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই মিলেছে গিফ্ট নিফটি নামার মধ্যে। তবে ভারত একাই নয়, শেয়ারবাজার নামছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং-সহ এশিয়ার একাধিক দেশেই।
অর্থনীতিবিদদের দাবি, এতগুলো চাপ সামলাতে গিয়ে দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ কমতে বাধ্য আরবিআই কর্তৃপক্ষের। যা দেশে সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াবে। যা আবার ঘুরে প্রভাব ফেলবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতে লগ্নির গ্রহণযোগ্যতায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চাপ কতটা তার একটা অনুমান চান?
বিশেষজ্ঞ সংস্থার তরফে দাবি করা হয়েছে, ইন্ডিয়ান বাস্কেট-এর গড় দাম ১২০ ডলারের আশেপাশে ঘোরাফেরা করলে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে দেশে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার পৌঁছে যেতে পারে ৬% এবং জিডিপি বৃদ্ধির হারও নেমে আসতে পারে ৬%। বৃহস্পতিবার ইন্ডিয়ান বাস্কেট-এর দর ১১৬.৫২ ডলার, একদিনে যা বেড়েছে ৩.২৭%। ফলে সিঁদুরে মেঘ কিন্তু বাড়ছে ক্রমশ।