Humayun Kabir: বাবরি মসজিদ নাকি রাম-মন্দির? ভোটের আগে মুর্শিদাবাদে অন্য হাওয়া – Bengali News | Humayun Kabir And his Babri Masjid Controvercy detail
বাবরি মসজিদ নাকি রাম-মন্দির? Image Credit: Tv9 Bangla
ক্ষমতার আস্ফালন নাকি শুধুই ধর্মীয় আবেগ? ভোটের বাদ্যি বাজার আগে রাজনীতির অলিগলিতে এখন শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে এই প্রশ্ন। কেন বলুন তো? কারণ, নবাবের জেলা অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে এখন দড়ি টানাটানি হচ্ছে মন্দির-মসজিদ নিয়ে। রোটি-কাপড়া-মোকান আর শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্ম সংস্থান ছেড়ে এই ধর্মীয় ভাবাবেগের দড়ি টানাটানি করছেন রাজনীতির কুশিলবরা। একজন যখন বাবরি মসজিদ তৈরির কথা বলছেন, তখন অপরজন মন্দির নিয়ে হাঁক দিচ্ছেন। তাও আবার একটা নয়, দু’দুখানা রাম-মন্দির! ভাবতে পারছেন অবস্থাটা? আজ এই নিয়েই কথা বলব ব্রিফিং রুমে।
কবে ঘোষণা?
ভরতপুরের তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। একাধিকবার বেফাঁস মন্তব্য করে যিনি আকছাড় সংবাদ শিরোনামে থাকেন, সেই হুমায়ুন কবীর ২০২৪ সালে ঘোষণা করেছিলেন বাংলার মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় বাবরি মসজিদ তৈরি করবেন। তিনি বলেছিলেন,”আমরা ৬ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করব। এটি সম্পূর্ণ হতে তিন বছর সময় লাগবে। বিভিন্ন মুসলিম নেতা সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।” তারপর নাকি ছ’বিঘা জমিও কিনে নিয়েছিলেন এই মসজিদ স্থাপনের জন্য। হুমায়ুন যখন বাবরি মসজিদ নিয়ে সওয়াল করছেন, সেই সময় মন্দির নিয়ে পাল্টা কথা হবে না তা তো আর হতে পারে না! তাই না? বিশ্বাস করুন, হয়ওনি। বঙ্গীয় রামসেবক পরিষদ চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অধ্যক্ষ অম্বিকানন্দ মহারাজ পাল্লা দিয়ে রাম-মন্দিরের ঘোষণা করলেন। শুধু ঘোষণা নয়, ২২ জানুয়ারি সাগরদিঘিতে তিনি রাম-মন্দিরের ভূমিপূজনও করে ফেলেছেন। এমনকী বলেছেন, “জেলায়-জেলায়, পাড়ায়-পাড়ায় রামমন্দির তৈরি হবে।” কী ভাবছেন এখানেই শেষ? অম্বিকা সেই সময় আক্রমণ করতে ছাড়েনি বিজেপিকেও। বলেছিলেন, বিজেপি ভোটের আগেই শুধু রাম রাম করে। ভোটের পর আর রামের নাম করে না। পিঠ বাঁচানোর জন্য কেউ কেউ রাম নাম করেন।”
দু’টি মন্দির একটি মসজিদ
এরপর মহানন্দা ও গঙ্গা দিয়ে দিয়ে বয়ে গিয়েছে কয়েক কিউসেক জল। শুধু জল বয়ে গিয়েছে বলা ভুল, কারণ জায়গাটা মুর্শিদাবাদ তো…তাই বলা যায়, এরপর গঙ্গাভাঙন ছাড়খাড় করে দিয়েছে সাধারণ মানুষকে। নিঃস্ব হয়ে গিয়েছেন অনেকে। ত্রাণ শিবিরে এখনও হয়ত থাকেন প্রচুর মানুষ। হয়ত ঠিক মতো খাবার জোটে না অনেকের। আর এখনও যাঁদের বাড়ি গঙ্গা গিলে খায়নি, তাঁরা সারাক্ষণই দেখেন সিঁদূরে মেঘ। এই বুঝি সব গেল। কিন্তু ওই যে ভোট বড় বালাই! তাই মন্দির-মসজিদ ইস্যু জিইয়ে থাকবে না, তা কি হয়? সম্প্রতি, আবার বিজেপির প্রাক্তন জেলা সভাপতি শাখারভ সরকার বহরমপুরে রাম-মন্দির নির্মাণের ঘোষণা করেন। এমনকী, সেই মন্দির কেমন হবে, তার একটি নকশা সামনে নিয়ে আসেন। অর্থাৎ জেলায় একটি মসজিদ ও দুটি মন্দির।
এ দিকে, আগামী ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে। হুমায়ুন নিজের মুখে জানিয়েছিলেন সে কথা। বিধায়ক বলেছিলেন, ওই দিন ২ লক্ষ লোক আসবেন। আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, আব্বাস সিদ্দিকিকে। মদিনা থেকেও অনেকে আসবেন বলে বলেছিলেন তিনি।
হাতে আর ন’দিন। ভিত্তিপ্রস্তর প্রস্তুতির তোড়জোড় নিশ্চয় চলছে। এমতাবস্থায় প্রকাশ্যে এল আরও একটি নাম। তিনি নিজামুদ্দিন চৌধুরী। যে ছ’বিঘা জমিতে হুমায়ুন বলেছেন বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর হবে, সেই জমিটি আদতে নাকি তাঁর, আর কেউ তাঁর থেকে এই জমি কেনেননি বলে দাবি করেছেন তিনি। এরপর রাতারাতি তিনি ওই জায়গা ঘিরেও দেন।
এখানেই শেষ নয়, নিজামুদ্দিন মানুষের আবেগ নিয়েও খেলতে নিষেধ করেছেন হুমায়ুনকে। বলেছেন, “বাবরি মসজিদ তৈরি করার থেকে আগে মুসলমানদের খোঁজ নিক, আগে পাড়ায় যেসব মসজিদ আছে সেগুলোর উন্নয়ন করুক।” কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পাত্র তো হুমায়ুন নন। সটান বলেছেন, রামমন্দির হল। আবার যখন দিঘার জগন্নাথ মন্দির হল, তখন তো কেউ উন্নয়নের কথা ভাবেননি। তাহলে বাবরি মসজিদের বেলায় এত রাজনীতি কেন? এরমধ্যেও নিজের দলেরই অন্দরের রাজনীতির গন্ধ পেয়েছেন তিনি। বলেছেন, “আমি একটা জমির কথা বলেছিলাম জাতীয় সড়কের পাশে, সেখানে জায়গা নেওয়ার কথা চলছিল, কিন্তু বেলডাঙা ও রেজিনগরের বিধায়করা বাধা দিচ্ছিল, এইজন্য আমি কোথায় করব না করব সেটা বলব না।” তবে মসজিদ যে হবেই তা নিশ্চিত করেছেন। আর তা যেন তেন প্রকারে মানে এর জন্য যদি তাঁকে শহিদও হতে হয় তাহলেও তিনি রাজি। তবে শহিদ যেমন হবেন, তেমন শহিদ করবেন বলেও হুঙ্কার ছেড়েছেন হুমায়ুন। বলেছেন, “এখানেই মসজিদ করব.. করব…করব। যে কোনও শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই হবে। আর তাতে আমি সহ একশো জন শহিদ হলে পাঁচশ জনকে শহিদ করব।”
ফলে, ভোটের আবহে গোটা বাংলায় যখন এসআইআর-এসআইআর রব, সেখানে মুর্শিদাবাদের হাওয়া আটকে রয়েছে মন্দির-মসজিদেই। প্রসঙ্গত, মুর্শিদাবাদের তিনটি লোকসভার মধ্যে একটি হল বহরমপুর। দীর্ঘ পাঁচবারের সাংসদ অধীর চৌধুরী ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে তৃণমূলের কাছে পরাজিত হয়েছিলে। কংগ্রেসের নৌকা ডোবাতে তৃণমূল দাঁড় করছিল ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানকে। রাজনীতির কারবারিরা বলেন, সংখ্যালঘু ভোট আর তারকা মুখে সেদিন ফ্যাক্টর হয়েছিল। এই মুর্শিদাবাদে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমান জনজাতির সংখ্যা বেশি। ঠিক তেমনই এই জেলায় বেশি পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা। পেটের টানের বাড়তি রোজগারের আশায় ভিন রাজ্যে রোজ পাড়ি দিচ্ছেন বেকার যুবকরা। সেখানে রোটি-কাপড়া-মোকান যখন মূল বিষয় হওয়া উচিৎ ছিল, তখনই চর্চিত বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে মন্দির মসজিদের রাজনীতি।