EXPLAINED: কেন সম্মুখ সমরে কল্যাণ-বোস? কী আছে FIR-এ! – Bengali News | Clash between Governor and Kalyan Banerjee explained, cause of FIR
নাম সি ভি আনন্দ বোস। বাবার নাম পি কে বসুদেবন নায়ার। ঠিকানা রাজভবন। ঠিক এইভাবেই অভিযোগপত্রটি লিখেছেন পেশায় আইনজীবী তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্য়োপাধ্যায়। রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন শাসক দলের সাংসদ। এমন নজির দেশের আর কোথাও কখনও ঘটেছে কি না জানা নেই। কী এমন অপরাধ রাজ্যপালের? রাজ্যপালই বা কেন থানায় নালিশ ঠুকলেন? ভোটের আগে বঙ্গ রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যেন নতুন পালা।
১৭ নভেম্বর সকাল। ঐতিহ্যবাহী রাজভবনের লনে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্নিফার ডগ। সশস্ত্র কেন্দ্রীয় বাহিনী ঘুরে বেড়াচ্ছে ব্রিটিশ আমলে তৈরি সেই প্রাসাদোপম ভবনের আনাচে-কানাচে। সাংবাদিকদেরও সে দিন অবাধ প্রবেশ। এমন একটি দৃশ্যকে নাটক ছাড়া আর কীই বা বলবেন!
বিষয়টার সূত্রপাত গত ১৫ নভেম্বর। এক সাক্ষাৎকারে রাজ্যপাল বলেছেন, “রাজ্যে ভোট হোক ব্যালটে, বুলেটে নয়।” রাজ্যপাল এমন কথা বলেই থাকেন। নতুন নয়। আপনাদের মনে থাকবে, পঞ্চায়েত ভোটের সময় হিংসার অভিযোগ তুলে রাজভবনে পিস রুমও খুলে দিয়েছিলেন বোস। কন্ট্রোল রুম খুলে খবরাখবর নিয়েছিলেন তিনি। এবার রাজ্যপালের এই বক্তব্যেই গর্জে উঠল তৃণমূল। সাংসদ কল্যাণ বন্দ্য়োপাধ্যায় বলে বসলেন, ‘রাজভবনে লুকিয়ে আছে ক্রিমিনাল!’ তাঁর আরও দাবি, রাজভবনে বোমা-বন্দুক লুকিয়ে রাখা আছে।
এসব শুনে রাজ্যপাল থেমে থাকেননি। সংবাদমাধ্যমের সামনে জানিয়ে দিলেন, অভিযোগ দায়ের করবেন তিনি। কোনওভাবেই এই ধরনের মন্তব্য সহ্য় করবেন না। তিনি সরাসরি বলেন, “আমি অভিযোগ করার নির্দেশ দিয়েছি।”
এমন মৌখিক তরজা তো হয়েই থাকে। সেই জগদীপ ধনখড়ের সময় থেকে রাজ্য-রাজ্যপাল সংঘাত চলছে। কিন্তু বিষয়টাকে আর মৌখিক স্তরে রাখলেন না রাজ্যপাল। তাই বলে ১৫ নভেম্বর সকালে যে এমন দৃশ্য দেখা যাবে, তা ভাবেনি রাজ্যবাসী। রাজভবনেই হাজির পুলিশ, সেন্ট্রাল ফোর্স, বম্ব স্কোয়াড। রাজ্যপাল প্রমাণ করতে গেলেন যে রাজভবনে বোমা-বন্দুক নেই। ক্রিমিনালও নেই।
প্রমাণ তো হল? এরপর। রাজ্যপাল এবার আর ছাড়ার পাত্র নন। লোকসভার স্পিকারের কাছে অভিযোগও জানিয়েছে রাজভবন। সেই সঙ্গে ৪-৫ খানা ধারায় কল্যাণের বিরুদ্ধে এফআইআর করলেন রাজ্যপাল।
বিএনএস-এর ১৫১, ১৫২ নম্বর ধারা অর্থাৎ সশস্ত্র বিদ্রোহকে উস্কে দেওয়ার অভিযোগ।
১৯৭ নং ধারা অর্থাৎ রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনার অভিযোগ। বিএনএস-এর ১৯৬-এর ১ (এ) ধারা অর্থাৎ সামাজিক সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগ। এর সঙ্গে আছে বিএনএস-এর ১৫৩ ১ (বি), ১৫৩ ১( সি), ১৫৩ (২) ধারা অর্থাৎ আতঙ্ক সৃষ্টি করার অভিযোগ।
সাংসদ কল্য়াণ বন্দ্যোপাধ্যায় তথা আইনজীবী কল্য়াণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে। তিনি কি ছেড়ে দেবেন? কল্যাণ স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, থানায় থানায় এফআইআর করবেন তিনি।
অর্থাৎ ব্যাপারটা যে মিটবে না, তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। এরই মধ্যে হল পাল্টা এফআইআর। যেমন-তেমন নয়। একেবারে সাজিয়ে লেখা অভিযোগপত্র। কোথাও রাজ্যপাল শব্দের উল্লেখই নেই। অথচ সি ভি আনন্দ বোস যে রাজ্যপাল ছাড়া অন্য কেউ নন, তাও পরিষ্কার। অভিযোগপত্রে একগুচ্ছ ইউটিউব লিংক উল্লেখ করা আছে। সেগুলিতে রাজ্যপালের বিভিন্ন সময়ের ইন্টারভিউ-র ভিডিয়ো রয়েছে। কল্যাণের দাবি, সেখানে উস্কানিমূলক কথা বলেছেন রাজ্যপাল।
কীসের উস্কানি? এই যে রাজ্যপাল বলেছেন, বুলেটে নয় ভোট হবে ব্যালটে। কল্যাণের দাবি, এই কথা বলে আদতে নাকি ভোট প্রক্রিয়ায় নাক গলাতে চাইছেন সাংবিধানিক প্রধান।
আরও আছে। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে রাজ্যপাল আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘তৃণমূল রক্তের হোলি খেলে’। এই হোলি শব্দটাতেই আপত্তি। কল্যাণের ব্যাখ্যায় হল হোলির মতো উৎসবের কথা বলে নির্দিষ্ট ধর্মের ভাবাবেগে আঘাত করেছেন রাজ্যপাল। পুলিশের সমালোচনা করেছেন রাজ্যপাল। সেটা আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি তৃণমূল সাংসদের।
বিএনএসের ৬১, ১৫২, ১৯২, ১৯৬, ৩৫৩ ধারায় মামলা হয়েছে রাজ্যপালের বিরুদ্ধে। কল্যাণের ভাষায় এসব আসলে ‘খেলা হচ্ছে’।
বলে রাখা দরকার, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৬১ অনুসারে, রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালদের বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি পদক্ষেপ করা যায় না। সাংবিধানিক রক্ষাকবচ রয়েছে রাজ্যপালের। সংবিধানের ৩৬১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে,দায়িত্বে থাকাকালীন রাজ্যপাল বা রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। কারও কাছে উত্তর দিতে বাধ্যও নন তাঁরা। অনুচ্ছেদ ৩৬১-র ২ ও ৩ অনুযায়ী, তাঁদের গ্রেফতার করা যায় না বা জেল হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া যায় না। আইনের ছাত্র কল্যাণের নিশ্চয় এগুলো অজানা নয়!
বিষয়টা শুধু রাজ্য় রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও নাম নিয়েছেন কল্যাণ। তিনি রাজ্যপালের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, “আমি তো মানুষের নির্বাচনে ৬ বার সাংসদ হয়েছি। উনি তো অমিত শাহকে ধরে রাজ্যপাল হয়েছেন।”
বিজেপির বক্তব্য, রাজ্যপাল বিচক্ষণতার সঙ্গেই সবটা করছেন। যদিও এ ক্ষেত্রে সিপিএম কিন্তু রাজ্যপালেরই পাশে।
এই খেলায় কোন ময়দানে গিয়ে থামবে? কতদূর গড়াবে জল? কল্যাণ চ্যালেঞ্জ করেছেন, তিনি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে রাজি। রাজ্যপালও কি সেই পথে হাঁটবেন নাকি হেয়ার স্ট্রিটেই থেমে যাবে সব, সেটা সময়ই বলবে।